তারপর আমরা সবাই মিলে চিৎকার করলাম, আমাদের চিৎকার সুড়ঙ্গের মাঝে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল কিন্তু বাইরের কেউ শুনতে পেল না। তারা দুম দুম শব্দ করে ভাঙতেই থাকল।
আমি দেখলাম মিথিলার চোখে-মুখে ভয়াবহ আতঙ্ক। আমার নিজের জন্যে না–মিথিলার জন্যে হঠাৎ মায়া হতে থাকে।
টুনি ফিসফিস করে বলল, “আমরা খুব বড় বিপদে পড়ে গেছি।”
কেউ কোনো কথা বলল না।
৯-১০. সুড়ঙ্গের দেয়ালে
আমরা সুড়ঙ্গের দেয়ালে হেলান দিয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকালাম। বাতাসে ধুলা উড়ছে। আমাদের চোখে-মুখে চুলে ধুলার একটা আস্তরণ পড়ছে। টর্চ লাইটের আলোতে সবাইকে কেমন জানি অপরিচিত মানুষের মতো দেখাচ্ছে। ভয় পেলে মানুষের চেহারা মনে হয় পাল্টে যায়।
টুনি বলল, “আমাদের মাথাটা খুব ঠাণ্ডা রাখতে হবে।”
চঞ্চল বলল, “হ্যাঁ, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।”
টুনি বলল, “খুব বড় যখন বিপদ হয় তখন কী করতে হয় জানিস?”
“কী?”
“প্রথমে দেখতে সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে। তারপর সেটাকে মেনে নিতে হয়। তারপর চেষ্টা করতে হয় তার থেকে কতটুকু ভালো করা যায়।”
টিটন মুখ শক্ত করে বলল, “সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে শুনতে চাস?”
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”
“আমরা সবাই এখানে আটকা পড়ে থাকব, না খেয়ে মরে ভূত হয়ে যাব। কেউ কোনোদিন জানতেও পারবে না আমরা কোথায় গেছি।”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “না। আমাদের অবস্থা এতো খারাপ হবে না।”
টিটন কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “কেন হবে না?”
“আমাদের কাছে অনেক খাবার আছে। আমরা আরো এক-দুই দিন সেই খাবার খেয়ে থাকতে পারব। কাজেই আমাদের হাতে কয়েকদিন সময় আছে। আমাদের কাছে দুইটা মোবাইল টেলিফোন আছে। মাটির নিচে বলে সেই মোবাইল বাইরে যাচ্ছে না। আমরা যদি সিঁড়ির উপরের ইট, পাথর সরিয়ে ছোট একটা গর্তও করতে পারি তা হলেই মোবাইলের লাইন পেয়ে যাব।”
টিটন জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে গর্ত করবি? সবাই মিলে বিল্ডিংটা ভাঙছে না?”
“রাতেরবেলা নিশ্চয়ই বন্ধ করবে। তখন আমরা কাজ শুরু করব।”
অনু বলল, “আমাদের কাছে একটা কবুতরও আছে। যদি ছোট একটা গর্ত করতে পারি তা হলে সেই কবুতরের পায়ে একটা মেসেজ লিখে সেই গর্ত দিয়ে ছেড়ে দিতে পারি!”
মিথিলা সিঁড়ির উপর জমে থাকা ইট কংক্রিটের বিশাল তূপের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “ওখান দিয়ে কেমন করে গর্ত করবে? গর্ত করার জন্যে একটা হাতি লাগবে।”
আমি বললাম, “আমাদের একটা হাতিও আছে। দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে এসেছি। তার হাতে শাবলটা দিয়ে বলতে পারি, একটা গর্ত করে দাও।”
এতো বিপদের মাঝেও সবাই একটু হাসল। টুনি মাথা নেড়ে বলল, “না। ঐ মানুষটা খুবই ডেঞ্জারাস। তাকে ছাড়া ঠিক হবে না। হাতে শাবল তুলে দেওয়া আরো ডেঞ্জারাস! আগে আমাদের খুন করে ফেলবে, তারপর গর্ত করে বের হয়ে যাবে।”
চঞ্চল বলল, “আমি আরো একটা জিনিস চিন্তা করছি।”
“কী?”
“এই সুড়ঙ্গটা মাটির খুব বেশি নিচে না। আমরা যদি উপরের দিকে গর্ত করতে থাকি, তা হলে এক সময় নিশ্চয়ই বের হয়ে যাব। কপাল ভালো আমাদের কাছে একটা শাবল আছে।”
অনু উপরের দিকে তাকিয়ে বলল, “উপরে নিশ্চয়ই শক্ত মেঝে, ভেঙে বের হতে পারবি না।”
চঞ্চল বলল, “এখানে হয়তো তাই। কিন্তু যদি সুড়ঙ্গটা দিয়ে আরো দূরে যাই তা হলে হতে পারে আমরা বিল্ডিংয়ের বাইরে চলে যাব। তখন উপরে গর্ত করলে সেখানে থাকবে মাটি।”
আমি বললাম, “সুড়ঙ্গগুলো দেখেছিস? এটা সোজা যায় না, সবসময়ই আঁকাবাঁকা। একটু দূর গেলে আবার ঘুরে আগের জায়গা চলে আসে।”
চঞ্চল বলল, “প্রথমে সুড়ঙ্গের একটা ম্যাপ করতে হবে। আমরা এখনো জানি না সুড়ঙ্গগুলো কোনটা কোনদিকে গেছে।”
মিথিলা হাত তুলল, “আমি একটা কথা বলি?”
টুনি বলল, “বল।”
“আমার খিদে পেয়েছে।”
হঠাৎ করে আমাদের সবারই খিদে পেয়ে গেল। আমরা সবাই মাথা নাড়লাম, বললাম, “হ্যাঁ। অনেক খিদে পেয়েছে। আয় খাই।”
টুনি তার ব্যাগ খুলল, সৈখানে স্যান্ডউইচ, চিপস, আপেল আর কোল্ড ড্রিংকস। আমরা সবাই কাড়াকাড়ি করে খেতে থাকি।
চঞ্চল দুর্বলভাবে বলল, “এখনই সব খেয়ে শেষ করে ফেলব? পরের জন্যে রাখব না?”
অনু বলল, “পরের জন্যে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা খাবারগুলো রাখব ঠিকই, ব্যাগের ভিতরে না রেখে পেটের ভিতরে।”
এতো বিপদের মাঝে থেকেও অনুর কথা শুনে সবাই একটু হাসল। তার যুক্তিটা খারাপ না, খাবারগুলো ব্যাগের মাঝে না রেখে পেটের মাঝে রাখা!
আমরা সবাই খুব সখ করে খেলাম এবং খাওয়ার পর মনে হল আমাদের মনের বল একটু বাড়ল। চঞ্চল বলল, “এখন আমাদের সবকিছু একটু সাবধানে খরচ করতে হবে। একসাথে সবগুলো টর্চ লাইট জ্বালিয়ে কাজ নেই। একটা করে জ্বালাবি আর যদি দরকার না থাকে নিভিয়ে রাখবি।”
টুনি বলল, “হ্যাঁ। মোবাইল টেলিফোন দুইটাও এখন বন্ধ করে রাখি। মোবাইল ফোনের চার্জ একটু বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”
আমরা মাথা নাড়লাম, বললাম, “ঠিক বলেছিস।”
“আর আমাদের সব ব্যাগ পিঠে করে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। এখানে থাকুক। পিঠে বোঝা নিয়ে হাঁটলে পরিশ্রম বেশি হবে। আমাদের শক্তি বাঁচাতে হবে।”
আমরা আবার মাথা নাড়লাম, বললাম, “গুড আইডিয়া।”
চঞ্চল বলল, “ঠিক আছে, প্রথমে তা হলে আমরা এই সুড়ঙ্গের একটা ম্যাপ তৈরি করার চেষ্টা করি।”
