সুমি সাধারণত কথা বলে না, হঠাৎ করে সে বলল, “তোমার চোখগুলো দেখতে খুব সুন্দর। আঁখি নামটা মনে হয় ঠিকই আছে।”
সুজন বলল, “তোমার চোখ তো এক্কেবারে ঠিক আছে। তুমি সত্যি দেখতে পাও না?”
“না।”
“একটুও না? হালকা হালকা?”
“না।”
“খুব দামি চশমা কিনে দিলে-”
আঁখি হেসে ফেলল, বলল, “আমার চোখের সবকিছু ঠিক আছে। যেটা নষ্ট হয়েছে সেটা হচ্ছে অপটিক নার্ভ। রেটিনা থেকে কোনো সিগন্যাল ব্রেন পর্যন্ত যায় না। সেই জন্যে আমি কিছু দেখি না।”
“কোনো চিকিৎসা নাই?”
“যেটুকু ছিল করা হয়েছে। লাভ হয়নি।”
ক্লাসের সবাই জিব দিয়ে চুকচুক শব্দ করল, কেউ নিশ্বাস ফেলল, যাদের মায়া বেশি, তারা বলল, “আহারে।” আঁখি হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে ওঠে, সে মুখ তুলে বলল, “তোমরা আমার জন্যে কিছু একটা করতে চাইছ?”
আমরা মাথা নাড়লাম, বললাম, “হ্যাঁ।”
“আমি কী চাই, তোমাদেরকে বলব?”
“বল।”
“আমি চাই তোমরা সবাই ভুলে যাও যে আমি চোখে দেখতে পাই না। আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিংবা অন্ধ অথবা রাইড। আমি চাই তোমরা আমাকে অন্য আরেকজনের মতো নাও! আমি চাই তোমরা কেউ আমার জন্যে আলাদা করে কিছু না কর–”
শান্তা জিজ্ঞেস করল, “তা হলে তোমার ঝামেলা হবে না?”
“হবে। অনেক ঝামেলা হবে। অনেক কষ্ট হবে। কিন্তু যখন কেউ আমাকে মায়া করে, আমাকে দেখে দুঃখ পায়, আহা উঁহু করে তখন আমার আরো অনেক বেশি কষ্ট হয়।”
আমরা সবাই চুপ করে বসে রইলাম, এরকম একটা ব্যাপার থাকতে পারে আমরা কখনোই চিন্তা করিনি। কেন জানি ধরেই নিয়েছিলাম সবসময়ই বুঝি সবাইকে গায়ে পড়ে সাহায্য করতে হয়। কখনো কখনো কাউকে সাহায্য না করাটাই হচ্ছে তাকে সাহায্য করা। কী আশ্চর্য!
রিতু বলল, “ঠিক আছে আঁখি, আমরা সবাই ভুলে যাব যে তুমি চোখে দেখতে পাও না! আমরা সবাই সবসময় তোমার সাথে এমন ব্যবহার করব যেন তুমি আমাদের মতো একজন!”
“ভেরি গুড। থ্যাংকু।”
“ঠিক আছে।” রিতু সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরা সবাই ভুলে যা। ওয়ান টু থ্রি!”
আমরা সবাই বললাম, “ওয়ান টু থ্রি।” তারপর ভান করলাম আমরা ভুলে গেছি। রিতু তখন আঁখির দিকে তাকিয়ে বলল, “আঁখি, তুমি আমাদের ক্লাসে ভর্তি হয়েছ এখন তোমার এই ক্লাসের ছেলেমেয়ের সাথে পরিচয় হওয়া দরকার। সবার আগে আমার সাথে পরিচয় হোক। আমাকে দেখছ?”
আঁখি বলল, “দেখছি।”
“বল দেখি আমি দেখতে কী রকম?”
“তুমি কালো এবং মোটা এবং তোমার নাকের নিচে ছোট ছোট গোঁফ।”
আমরা সবাই হি হি করে হাসতে লাগলাম, রিতু হাসল সবচেয়ে বেশি এবং হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে গেল। সুজন দাঁড়িয়ে বলল, “আমি কী রকম?”
“তোমার মাথা ন্যাড়া। তোমার গলায় সোনার চেন।”
সুজনের সাথে সাথে আমরা সবাই হি হি করে হাসতে লাগলাম।
শান্তা বলল, “আমি?”
“তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার নাকের উপর দিয়ে একটা ট্রাক চলে গিয়েছে–তাই নাকটা চ্যাপ্টা।”
আমরা সবাই হি হি করে হাসতে লাগলাম তখন রিতু আবার আমাদের থামাল, বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। আঁখি যে খুবই ভালো দেখতে পায় সেটা নিয়ে এখন আমাদের কারো কোনো সন্দেহ নেই। এখন তোমার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিই। এই যে আমি, কালো মোটা এবং নাকের নিচে গোঁফ আমার নাম হচ্ছে রিতু। মনে থাকবে? রি-তু।”
“মনে থাকবে।”
শান্তা বলল, “আমার নাম শান্তা।”
সুমি বলল, “আমার নাম সুমি।”
সুজন বলল, “আমার নাম সুজন।”
এভাবে সবাই তার নাম বলল আঁখি খুব মনোযোগ দিয়ে নামগুলো শুনল। আমি যখন বললাম, “আমার নাম তিতু।” তখন সবাই চিৎকার করে বলতে লাগল, “তিতা তিতা।”
আঁখি তাদের চিৎকারে কান দিল না, বলল, “তিতু।”
.
টিফিনের ছুটিতে আমরা ক্লাস থেকে বের হয়েছি তখন উঁচু ক্লাসের একটা ছেলে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “এই, তোদের ক্লাসে না কি একটা অন্ধ মেয়ে ভর্তি হয়েছে?”
আমি অবাক হওয়ার ভান করলাম, “তাই না কি?”
“তুই জানিস না?”
“একটা মেয়ে ভর্তি হয়েছে, কিন্তু অন্ধ কী না সেটা খেয়াল করি নাই।”
ছেলেটা মামুনকে জিজ্ঞেস করল, “তুই জানিস না?”
মামুন ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, “নাহ্। জানি না তো।”
.
রাতে খাবার টেবিলে আমি বললাম, “আজকে আমাদের ক্লাসে নতুন একটা মেয়ে ভর্তি হয়েছে।”
সবাই আমার দিকে তাকাল, এরপরে কী বলব সেটা শোনার জন্যে। আমি বললাম, “মেয়েটা খুবই ফানি। রিতুকে দেখে বলে সে না কী কালো আর মোটা আর নাকের নিচে গোঁফ।” আমি কথা শেষ করে হি হি করে হাসলাম।
ভাইয়া জিজ্ঞেস করল, “রিতু মেয়ে না? মেয়েদের গোঁফ থাকে না কি?”
“নাই। রিতু চিকন-চাকন ফর্সা।”
“তা হলে?”
“বললাম না মেয়েটা খুব ফানি।”
ভাইয়া কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তুই খুবই আজব।”
আব্বু আর আম্মু কিছু বললেন না, কিন্তু তাদের মুখ দেখে বোঝা গেল তারাও সেটাই ভাবছেন। আমি খুবই আজব!
.
০৪.
যখন আমরা অভ্যস্ত হলাম আঁখির সাথে আর আঁখি অভ্যস্ত হল আমাদের সাথে
আমরা কয়েকদিনের মাঝেই আঁখিকে নিয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। প্রথমদিন বাংলা স্যার তার সাথে যেরকম খারাপ ব্যবহার করেছিলেন অন্য কোনো স্যার আর ম্যাডাম তার সাথে এরকম ব্যবহার করার চেষ্টা করেননি। অন্য স্যার-ম্যাডামেরা খুব ভালো তা নয়–কেউ কেউ আরো অনেক বেশি ভয়ংকর ছিলেন কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের নতুন ম্যাডাম ব্যাপারটা টের পেয়ে আগে থেকে সবাইকে ভালো মতোন টিপে দিয়েছিলেন। ক্লাসে এসে সবাই ভান করতে লাগলেন চোখে দেখতে পায় না এরকম একটা মেয়ে ক্লাসে থাকা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
