দুঃস্বপ্নের এই জায়গায় জয়নালের ঘুম ভাঙল। ঘুম ভাঙার পরপরই দাড়িওয়ালা ইমিগ্রেশন অফিসারকে সে চিনতে পারল। ভদ্রলোেক তার ছোটচাচা। দুঃস্বপ্নে তিনি ইমিগ্রেশন অফিসার হয়ে ধরা দিয়েছেন। ইতির উপদেশমতো কাজ করায় কিছুটা লাভ হয়েছে। ছোটচাচা আট হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। এবং লিখে পাঠিয়েছেন তাঁর হাত একেবারেই খালি। এই টাকাটা তিনি হাওলাত করে পাঠিয়েছেন।
জয়নালের এখন সম্বল হলে সর্বমোট সাড়ে তেরো হাজার টাকা। এই টাকার অনেকটাই এনগেজমেন্টের জিনিসপত্র কেনায় খরচ হয়েছে।
শাড়ি (হালকা সবুজ) – ২,১০০ টাকা (জামদানি)
শাড়ি (সুতি) – ৪০০ টাকা
আংটি – ২,০০০ টাকা
মিষ্টি (এখনো কেনা হয় নি) – ৫০০ টাকা (৪ কেজি)
মোট ৫,০০০ টাকা
বকেয়া তিন মাসের বাড়িভাড়া বাবদ দিতে হবে চার হাজার পাচশ টাকা। নয় হাজার পাঁচশ চলে গেল। হাতে থাকল চার হাজার। এনগেজমেন্টের দিনে যদি সত্যি সত্যিই বিয়ে হয়ে যায় তাহলে বাড়তি টাকা কিছু তো লাগবেই।
টিকিটের টাকা পুরোটাই বাকি। শুধু একটা টিকিট হাতে নিয়ে তো আমেরিকায় যাওয়া যায় না। অন্তত এক মাস নিজে নিজে চলার মতো ব্যবস্থা থাকা দরকার। জয়নালের কিছু বন্ধুবান্ধব বিদেশে চলে গেছে। তাদের কারোর ঠিকানা-ই জয়নালের কাছে নেই। ঠিকানা থাকলে তাদেরকে লেখা যেত। তার ছোটবেলার বন্ধু বরকতু ছিল মালয়েশিয়াতে। সেখানে কাগজপত্র না থাকায় কিছুদিন জেলও খেটেছে। জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে এই খবর জয়নালের কাছে আছে। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর সে কোথায়, কেউ জানে না। উড়া খবর সে এখন জাপানে। ইমরান আছে জার্মানিতে। ইমরানকে জয়নাল চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠি ইমরানের কাছে নিশ্চয়ই পৌছায় নি। পুলিশের ভয়ে ইমরান দুদিন পরপর ঠিকানা বদলায়। ভালো ভালো ছেলে বিদেশে গিয়ে চোরের জীবন যাপন করছে। কী আফসোস!
ব্যাংক কি এই ব্যাপারে লোন দেবে? ব্যাংকের তো উচিত লোন দেয়া। নানান দুঃখ ধান্দা করে ছেলেরা বিদেশে যাচ্ছে- এদেরকে কি একটু সাহায্য করা উচিত না? এই ছেলেরাই তো বিদেশ থেকে এক সময় অতি মূল্যবান ফরেন কারেন্সি পাঠাতে শুরু করবে। দেশেরই তাতে লাভ।
দেশে অনেক পয়সাওয়ালা লোক আছে। এরা স্কুল-কলেজ বানায়, মাদ্রাসা বানায়, এতিমখানা খোলে। তাদের কাছে কি সাহায্য চাওয়া যায় না?
বৃষ্টি থেমে গেছে। জয়নাল বিছানা থেকে নেমে কেরোসিনের চুলা ধরাল। চায়ের পিপাসা পেয়েছে। সিগারেট দিয়ে গরম এক কাপ চা খাবে। মন থেকে সব দুশ্চিন্তা আপাতত ঝেড়ে ফেলতে হবে। আগামীকাল সকাল থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত সে কোনো দুশ্চিন্তা করবে না। আগামীকাল রাতে তার এনগেজমেন্ট। ইতি যেভাবে বলেছে তাতে মনে হয় এনগেজমেন্টের সঙ্গে সঙ্গে কাজি ডাকিয়ে বিয়েও পড়ানো হয়ে যাবে। সেরকম কিছু হলে আগামীকাল তার বিয়ে। জীবনের তিনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিনের একটি। একটা মোবাইল টেলিফোন যদি তার কাছে থাকত ভালো হতো। টেলিফোনে ইতির সঙ্গে কথা বলা যেত।
ইতি ঘুম-ঘুম চোখে টেলিফোন ধরে বলত–কে? জয়নাল বলত, আমি এক টেকো-মাথা অধম। তুমি কেমন আছ গো জানপাখি পুটুস-পুটুস?
উফ্, কী যে আপনার কথা! নাইন টেনে পড়া ছেলেরাও এরকম করে কথা বলে না। পুটুস-পুটুস আবার কী?
তোমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আনন্দে হৃৎপিণ্ডে পুটুস-পুটুস শব্দ হচ্ছে, এই জন্যে বলছি পুটুস-পুটুস। কেমন আছ গো পিন-পিন?
আপনার পায়ে পড়ি, এরকম করে কথা বলবেন না।
তোমার পায়ে পড়ি, তুমি আমাকে আপনি করে বলো না। আমাকে যখন আপনি করে বললা তখন নিজেকে অনেক দূরের মানুষ মনে হয়।
আপনি তো দূরেরই মানুষ। যখন কাছের হবেন তখন তুমি বলব। ভালো কথা, কাল যে আমাদের পানচিনি, মনে আছে?
মনে আছে গো ইটি-মিটি।
অনুষ্ঠানটা হবে পানচিনির। সেই অনুষ্ঠানকে বিয়ের অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হবে। এটা মনে আছে?
মনে আছে গো টুন-টুনাং।
উফরে আল্লাহ! আপনি কি দয়া করে অং-বং বলা বন্ধ করে স্বাভাবিকভাবে কথা বলবেন? স্বাভাবিকভাবে কথা না বললে আমি কিন্তু এখন টেলিফোন রেখে দেব।
আচ্ছা যাও, স্বাভাবিকভাবে কথা বলব।
বিয়ের পর আমি যে আপনার গুহায় থাকতে যাব সেটা কি মনে আছে? খাইছে রে আমারে!
খাইছে রে আমারে আবার কী ধরনের ভাষা! দয়া করে এই ভাষায় আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। আপনি রিকশাওয়ালা না, আর আমিও মাতারী না।
আচ্ছা যাও, আর বলব না। তবে শোন, বিয়ের পর আমার সঙ্গে গুহায় থাকতে আসা ঠিক হবে না। বাথরুম সমস্যা। রাতে বাথরুম পেলে তুমি নিশ্চয়ই দারোয়ানদের বাথরুমে যাবে না?
সেটা আপনি দেখবেন। আমি আমার ইচ্ছার কথা জানালাম। আমি দেখে এসেছি আপনার বিছানার চাদর নোংরা। চাদর ধুইয়ে ইস্ত্রি করিয়ে আনবেন।
ইয়েস ম্যাডাম।
ঘর ফিনাইল দিয়ে মুছবেন।
ওকি-ডকি!
ওকি-ভকি আবার কী?
আমেরিকান স্ল্যাং। আমরা যেমন বলি Ok, আমেরিকানরা বলে ওকি-ডকি।
আমার সঙ্গে আমেরিকান স্ল্যাং বলবেন না।
ইয়েস ম্যাডাম।
আমাকে ম্যাডামও ডাকবেন না।
ইয়েস ইতি।
আমার সঙ্গে আহ্লাদীও করবেন না। বিয়ের আগে আহ্লাদী করা যায়। বিয়ের পর না।
ই ই।
ই ই টা আবার কী?
ই ই হলো ইয়েস ইতি।
বানিয়ে বানিয়ে ইতির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে খুব মজা লাগছে। চা-টা খেতে ভালো হয়েছে। আজ একটা বিশেষ রাত – হয়তো বা শেষ ব্যাচেলর রাত। আমেরিকায় এই রতি বিশেষভাবে পালন করা হয়। সারারাত গান বাজনা হৈচৈ ফুর্তি চলে। ওরা ফুর্তিবাজ জাতি। ওদের কাণ্ডকারখানাই অন্যরকম।
