সকলেই যেন কাহার আগমন প্রতীক্ষা করিতেছেন। ক্ষণকাল পরে সকলেই একেবারে দণ্ডায়মান হইয়া ঊর্ধ্বনেত্রে বিমান দিকে বারবার লক্ষ্য করিতে লাগিলেন। আর সকলেই আরব্য ভাষায় “ইয়া নবী সালাম আলায়কা, ইয়া হাবিব সালাম আলায়কা, ইয়া রসুল সালাম আলায়কা, সালওয়াতোল্লাহ আলায়কা” সমস্বরে গাহিয়া উঠিলেন। সহস্র সহস্র লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মুখে মহাঋষি প্রভু হজরত মোহাম্মদের গুণানুবাদ হইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে মৃদুমন্দভাবে শূন্য হইতে “হায় হোসেন! হায় হোসেন!” রব করিতে করিতে হজরত মোহাম্মদ উপস্থিত হইলেন! তাঁহার পবিত্র পদ ভূপৃষ্ঠ স্পর্শ করিল। এতদিন প্রকৃতি শরীরী জীবের মুখে “হায় হোসেন, হায় হোসেন!” রব শুনিয়াছিল; আজ দেবগণ, স্বর্গের হুর-গ্লামানগণ, মহাঋষি, যোগী, তপস্বী, অমরাত্মার মুখে শুনিতে লাগিল, “হায় হোসেন! হায় হোসেন!! হায় হোসেন!!”
এই গোলযোগ না যাইতে-যাইতেই সকলে যেন মহাদুঃখে নির্বাকভাবে দণ্ডায়মান হইলেন। হায় হায়! পুত্রের কী স্নেহ! রক্ত, মাংস, ধমনী, অস্থি, শরীরবিহীন আত্মাও অপত্য-স্নেহে ফাটিয়া যাইতেছে, যেন মেঘ-গর্জনের সহিত শব্দ হইতেছে-হোসেন! হায় হোসেন! মরতজা আলী “শেরে খোদা” (ঈশ্বরের শার্দূল) স্বীয় পত্নী বিবি ফাতেমাসহ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দৈহিকের জন্য শোক অমূলক খেদ বৃথা। দৈহিক জীবের সহিত তাঁহাদের কোন সংস্রব নাই,-তথাপি পুত্রের এমনই মায়া যে, সে সকল মূলতত্ত্ব জ্ঞাত থাকিয়াও মহাত্মা আলী মহা খেদ করিতে লাগিলেন। জগতীয় বায়ু প্রকৃত আত্মায় বহমান হইয়া ভ্রমময় মহাশোকের উদ্রেক করিয়া দিল। কুহকিনী দুনিয়ার কুহকজালের ছায়া দেখিয়া হজরত আলী অনেক ভ্রমাত্মক কথা বলিতে লাগিলেন। “আন অশ্ব, আন তরবারি, এজিদের মস্তক এখনই সহস্র খণ্ডে খণ্ডিত করিব।” হায়! অপত্য স্নেহের নিকট তত্ত্বজ্ঞান, আত্মজ্ঞান, সকলই পরাস্ত।
সকল আত্মাই হজরত আলীকে প্রবোধ দিলেন। হজরত জিবরাইল আসিয়া বলিলেন, “ঈশ্বরের আদেশ প্রতিপালিত হউক। শহীদগণের দৈহিক সৎকারে প্রবৃত্ত হওয়া যাউক। অগ্রে শহীদগণের মৃতদেহ অন্বেষণ করিয়া সংগ্রহ করিতে হইবে; বিধর্মী, ধর্মী, স্বর্গীয়, নারকী, একত্র মিশ্রিত সমরাঙ্গণে অঙ্গে অঙ্গ মিশাইয়া রহিয়াছে; সেইগুলি বাছিয়া লইতে হইবে।” সকলেই শহীদগণের দেহ অন্বেষণে ছুটিলেন!
ঐ যে শিরশূন্য মহারথ-দেহ ধুলায় পড়িয়া আছে, খরতর তীরাঘাতে অঙ্গে সহস্র সহস্র ছিদ্র দৃষ্ট হইতেছে, পৃষ্ঠে একটি মাত্র আঘাত নাই,-সমুদয় আঘাতই বক্ষ পাতিয়া সহ্য করিয়াছে, এ কোন্ বীর? কবচ, কটিবন্ধ, বর্ম, চর্ম, অসি, বীর সাজের সমুদয় সাজ, সাজওয়া অঙ্গেই শোভা পাইতেছে, বয়সে কেবল নবীন যুবা। কী চমৎকার গঠন! হায়! হায়! তুমি কী আবদুল ওহাব? হে বীরবর! তোমার মস্তক কি হইল? তুমি কি সেই আবদুল ওহাব? যিনি চিরপ্রণয়িনী প্রিয়তমা ভার্যার মুখখানি একবার দেখিতে বৃদ্ধা মায়ের নিকট অনুনয়-বিনয় করিয়াছিলেন, মাতৃ আজ্ঞা প্রতিপালনে, অশ্বপৃষ্ঠে থাকিয়াই যিনি বীররমণী বীরবালার বঙ্কিম আঁখির ভাব দেখিয়া ও রণোত্তেজক কথা শুনিয়া অসংখ্য বিধর্মীর প্রাণ বিনাশ করিয়াছিলেন,-তুমি কি সেই আবদুল ওহাব?
বীরবরের পদপ্রান্তে এ আবার কে? এ বিশাল অক্ষি দুটি ঊর্ধ্বে উঠিয়াও বীরশ্রেষ্ঠ আবদুল ওহাবের সজ্জিত শরীর-শোভা দেখিতেছে। এক বিন্দু জল!!-ওহে এক বিন্দু জলের জন্য আবদুল ওহাব-পত্নী হত-পতির পদপ্রান্তে শুষ্ককণ্ঠা হইয়া আত্মবিসর্জন করিয়াছেন!
এ রমণীহৃদয়ে কে আঘাত করিল? এ কোমল শরীরে কোন পাষাণহস্ত অস্ত্রাঘাত করিয়া বৃদ্ধ বয়সে জীবলীলা শেষ করিল? রে কাফেরগণ! হোসেনের সহিত শত্রুতা করিয়া রমণী-বধেও পাপ মনে কর নাই? বীরধর্ম, বীর-নীতি, বীর-শাস্ত্রে কি বলে? যে হস্ত রমণী দেহে আঘাত করিতে উত্তোলিত হয়, সে হস্ত বীর অঙ্গের শোভনীয় নহে, সে বাহু বীর-বাহু বলিয়া গণনীয় নহে। নরাকার পিশাচের বাহু!
সে বীর-কেশরী, সে বীরকুল-গৌরব, সে মদিনার ভাবি রাজা কোথায়? মহা মহা রথী যাঁহার অশ্ব-চালনায়, তীরের লক্ষ্যে, তরবারির তেজে, বর্শার ভাজে মুগ্ধ সে বীরবর কই? সে অমিত-তেজা রণকৌশলী কই? সে নব-পরিণয়ের নূতন পাত্র কই? এই তো শাহানা বেশ। এই তো বিবাহ সময়ের জাতিগত পরিচ্ছদ। এই কী সেই সখিনার প্রণয়ানুরাগ নব পুষ্পহার পরিণয়সূত্রে গলায় পরিয়াছিল! এই কী সেই কাসেম! হায়! হায়!! রুধিরের কী অন্ত নাই!
সখিনা সমুদয় অঙ্গে, পরিধেয় বসনে রুধির মাখিয়া বীর-জায়ার পরিচয়-বিবাহের পরিচয় দিয়াছেন, তবু রুধিরের ধারা বহিতেছে-মণিময় বসনভূষণ, তরবারি, অঙ্গে শোভা পাইতেছে। তূণীর, তীর, বর্শা দেহপার্শ্বে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। বাম পার্শ্বে এ মহাদেবী কে? এ নবকমলদলগঠনা নবযুবতী সতী কে? চক্ষু দু’টি কাসেমের মুখ দেখিতে দেখিতে যেন বন্ধ হইয়াছে, জানিত কি অজানিতভাবে বাম হস্তখানি কাসেমের বক্ষের উপর রহিয়াছে। সত্যি! তুমি কে? তোমার দক্ষিণ হস্তে এ কী? এ কী ব্যাপার-কমলকরে লৌহ অস্ত্র! সে অস্ত্রের অগ্রভাগ কই? উহু! কি মর্মঘাতী দৃশ্য! বদ্ধমুষ্টিতে অস্ত্র ধরিয়া হৃদয়-কন্দরে প্রবেশ করাইয়াছ! তুমি কী সখিনা? তাহা না হইলে এত দুঃখ কার? স্বামীর বিরহ-বেদনায় কাতর হইয়া আত্মবিসর্জন করিয়াছ? না-না-বীর-জায়া, বীর-দুহিতা কী কখনো স্বামী-বিরহে কী বিয়োগে আত্মবিসর্জন করে? কী ভ্রম! কী ভ্রম! তাহা হইলে এ বদনে হাসির আভা কেন থাকিবে? জ্যোতির্ময় কমলাননে জ্বলন্ত প্রদীপ প্রভা কেন রহিবে? বুঝিলাম-বিরহ কি বিয়োগ দুঃখে এ তীক্ষ্ণ খঞ্জরে হৃদয়-শোণিত, স্বামী দেহ বিনির্গত শোণিতে মিশ্রিত হয় নাই। স্বামী বিয়োগে অধীরা হইয়া দুঃখভার হ্রাস করিতেও খ রের আশ্রয় গ্রহণ করা হয় নাই। ধন্য সতী! ধন্য সতী সখিনা! তুমি জগতে ধন্য, তোমার সুকীর্তি জগতে অদ্বিতীয় কীর্তি! কী মধুময় কথা বলিয়া খঞ্জরহস্তে কহিয়াছিলে? জগৎ দেখুক। জগতের নরনারীকুল তোমায় দেখুক। এত প্রণয়, এত ভালবাসা, এত মমতা, এত স্নেহ, এক শোণিতে গঠিত যে কাসেম সেই আমার পরিণয়ে আবদ্ধ, নব প্রেমে দীক্ষিত-যে ঘটনায় নিতান্ত অপরিচিত হইলেও মুহূর্তমধ্যে প্রণয়ের ও প্রেমের সঞ্চার হয়,-সতীত্ব ধন রক্ষা করিতে সেই কাসেমকে মুক্তকণ্ঠে বলিলে, “ভুলিলাম কাসেম, এখন তোমায় ভুলিলাম।” এই চিরস্মরণীয় মহামূল্য কথা বলিয়া যাহা করিলে, তাহাতে অপরের কথা দূরে থাকুক,-নির্দয়হৃদয় মারওয়ানের অন্তরেও দয়ার সঞ্চার হইয়াছিল। ধন্য, ধন্য সখিনা! সহস্র ধন্যবাদ তোমারে!
