এজিদ্ মনে মনে যে সকল সঙ্কল্প রচনা করিয়াছিলেন, দুরাশা-সূত্র আকাশকুসুমে যে মালা গাঁথিয়া রাখিয়াছিলেন, দেখিতে দেখিতে তাহার কিছুই থাকিল না। অতি অল্প সময়মধ্যে আশাতে আশা, কুসুমে কুসুম মিলিয়া-মিশিয়া এক হইয়া গেল। ঐশ্বরিক ঘটনায় ধার্মিকের আনন্দ, চিত্তের বিনোদন,-পাপীর ভয়, মনে অস্থিরতা। এজিদ্ ভয়ে কাঁপিতে লাগিল; কি করিবে, কিছুই ভাবিয়া স্থির করিতে পারিল না। অস্ফুট স্বরে এইমাত্র বলিল, “বন্দিগণকে কারাগারে লইয়া যাও।”
উদ্ধার পর্ব ০৪ প্রবাহ
কথা চাপিয়া রাখা বড়ই কঠিন। কবিকল্পনার সীমা পর্যন্ত যাইতে হঠাৎ কোন কারণে বাধা পড়িলে মনে ভয়ানক ক্ষোভের কারণ হয়। সমাজের এমনই কঠিন বন্ধন, এমনই দৃঢ় শাসন যে কল্পনাকুসুমে আজ মনোমত হার গাঁথিয়া পাঠক-পাঠিকাগণের পবিত্র গলায় দোলাইতে পারিলাম না। শাস্ত্রের খাতিরে নানা দিক লক্ষ্য রাখিতে হইতেছে! হে ঈশ্বর সর্বশক্তিমান ভগবান্! সমাজের মূর্খতা দূর কর। কুসংস্কার তিমির সদ্জ্ঞান-জ্যোতিঃ প্রতিভায় বিনাশ কর। আর সহ্য হয় না। যে পথে যাই, সেই পথেই বাধা। সে পথের সীমা পর্যন্ত যাইতে মনের গতি রোধ তাহাতে জাতীয় কবিগণেরও বিভীষিকাময় বর্ণনায় বাধা জন্মায়, চক্ষে ধাঁধা লাগাইয়া দেয়; কিন্তু তাঁহারাও যে কবি, তাঁহাদের যে কল্পনাশক্তির বিশেষ শক্তি ছিল, তাহা সমাজ মনে করেন না। এই সামান্য আভাসেই যথেষ্ট, আর বেশি দূর যাইব না। বিষাদ-সিন্ধুর প্রথম ভাগেই স্বজাতীয় মূর্খদল হাড়ে চটিয়া রহিয়াছেন। অপরাধ আর কিছুই নহে, পয়গম্বর এবং ইমামদিগের নামের পূর্বে, বাঙলা ভাষায় ব্যবহার্য শব্দে সম্বোধন করা হইযাছে; মহাপাপের কার্যই করিয়াছি! আজ আমার অদৃষ্টে কী আছে, ঈশ্বরই জানেন। কারণ মর্ত্যলোকে থাকিয়া স্বর্গের সংবাদ প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণকে দিতে হইতেছে।
স্বর্গীয় প্রধান দূত জিবরাইল অতি ব্যস্ততাসহকারে ঘোষণা করিতেছেন,-‘দ্বার খুলিয়া দাও। প্রহরিগণ! আজ স্বর্গের দ্বার, সপ্ততল আকাশের দ্বার খুলিয়া দাও। পুণ্যাত্মা, তপস্বী, সিদ্ধপুরুষ, ঈশ্বরভক্ত, ঈশ্বরপ্রণয়ী প্রাণিগণের অমরাত্মার বন্দিগৃহের দ্বার খুলিয়া দাও। স্বর্গীয় দূতগণ! অমরপুরবাসী নরনারীগণ! প্রস্তুত হও। হোসেনের এবং অন্য অন্য মহারথিগণের দৈনিক সৎক্রিয়া সম্পাদন জন্য মর্ত্যলোকে যাইবার আদেশ হইয়াছে। দ্বার খুলিয়া দাও, প্রস্তুত হও।”
মহাহুলস্থূল পড়িয়া গেল। “অল্পক্ষণের জন্য আবার মর্ত্যলোকে?” অমরাত্মা এই বলিয়া স্ব স্ব রূপ ধারণ করিলেন। এদিকে হজরত জিবরাইল আপন দলবল সহ সকলের পূর্বেই কার্বালা প্রান্তরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ক্রমে সকলের আবির্ভাব হইতে আরম্ভ হইল। দেখিতে দেখিতে জনমানবশূন্য প্রান্তরে, পুণ্যাত্মাদিগের আগমনে পরিপূর্ণ হইয়া গেল। বালুকাময় প্রান্তরে সুস্নিগ্ধ বায়ু বহিয়া স্বর্গীয় সৌরভে চতুর্দিক মোহিত ও আমোদিত করিয়া তুলিল।
স্বর্গীয় দূতগণ স্বর্গসংস্রবী দেবগণ, সকলেই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হজরত আদম,-যিনি আমি পুরুষ যাঁহাকে অবজ্ঞা করিয়া প্রধান ফেরেশতা আজাজীল শয়তানে পরিণত হইয়াছিল, সেই স্বর্গীয় দূতগণ পূজিত হজরত আদম,-হোসেন-শোকে কাতর-ও স্নেহপরবশে প্রথমেই তাঁহার সমাগম হইল। পরে মহাপুরুষ মুসা-স্বয়ং ঈশ্বর তূর পর্বতে যাঁহার সহিত কথা কহিয়াছিলেন, মুসা সেই সচ্চিদানন্দের তেজোময় কান্তি দেখিবার জন্য নিতান্ত উৎসুক হইলে, কিঞ্চিৎ আভা মাত্র যাহা মুসার নয়নগোচর হইয়াছিল, তাহাতেই মুসা স্বীয় শিষ্যসহ সে তেজ ধারণে অক্ষম হইয়া অমনই অজ্ঞান অবস্থায় ধরাশায়ী হইয়াছিলেন, শিষ্যগণ পঞ্চত্ব পাইয়াছিল, আবার করুণাময় জগদীশ্বর, মুসার প্রার্থনায় শিষ্যগণকে পুনর্জীবিত করিয়া মুসার অন্তরে অটল ভক্তির নব-ভাব আবির্ভাব করিয়াছিলেন-সে মহামতি সত্য তার্কিক মুসাও আজি হোসেন-শোকে কাতর,-কারবালায় সমাসীন। প্রভু সোলেমান-যাঁর হিতোপদেশ আজ পর্যন্ত সর্বধর্মাবলম্বীর নিকট সমভাবে আদৃত,-সেই নরকিন্নরী দানবদলী ভূপতি মহামতিও আজ কারবালা প্রান্তরে উপস্থিত। যে দাউদের গীতে জগৎ মোহিত, পশু পক্ষী উন্মত্ত, স্রোতস্বতীর স্রোত স্থির-ভাবাপন্ন, সে দাউদও আজ কারবালায়।
ঈশ্বর-প্রণয়ী ইব্রাহিম,-যাঁহাকে ঈশ্বরদ্রোহী রাজা নমরূদ প্রচণ্ড অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিয়া সত্য প্রেমিকের প্রাণসংহার করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন, যে অগ্নিশিখা গগনম্পর্শী হইয়া জগজ্জনের চক্ষে ধাঁধা দিয়াছিল,-দয়াময়ের কৃপায় সে প্রজ্বলিত গগনস্পর্শী অগ্নি ইব্রাহিম চক্ষে বিকশিত কমলদলে সজ্জিত উপবন, অগ্নিশিখা সুগন্ধযুক্ত স্নিগ্ধকর গোলাপমালা বলিয়া বোধ হইয়াছিল,-সে সত্যবিশ্বাসী মহাঋষি আজ কারবালা ক্ষেত্রে সমাগত। ইসমাইল-যিনি নিজ প্রাণ ঈশ্বরোদ্দেশ্যে উৎসর্গ করিয়া ‘দোম্বার’ পরিবর্তে নিজে বলি হইয়াছেন-সে ঈশ্বরভক্ত ইসমাইলও আজ কারবালা প্রান্তরে। ঈশা-যিনি প্রকৃত সন্ন্যাসী জগৎপরিত্রাতা মহাঋষি তাপস, ঈশ্বরের মহিমা দেখাইতে যে মহাত্মা চিরকুমারী মাতৃগর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন,-তিনিও আজ মর্ত্যধাম কারবালার মহাক্ষেত্রে। ইউনুস-যিনি মৎস্যগর্ভে থাকিয়া ভগবানের অপরিসীম ক্ষমতা দেখাইয়াছিলেন-তিনিও কারবালায়। মহামতি হজরত ইউসুফ বৈমায়েত্র ভ্রাতাকর্তৃক অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হইয়া ঈশ্বরের কৃপায় জীবিত ছিলেন এবং দাস পরিচয়ে বিক্রীত হইয়া মিসর রাজ্যে রাজসিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন, সে মহা সুশ্রীর অগ্রগণ্য পূর্ণজ্যোতির আকর হজরত ইউসুফও আজ কারবালার মহাপ্রান্তরে। হজরত জার্জিসকে বিধর্মিগণ শতবার শতপ্রকারে বধ করিয়াছে, তিনিও পুনঃ পুনঃ জীবন প্রাপ্ত হইয়া দয়াময়ের মহিমার জ্বলন্ত প্রমাণ দেখাইয়াছেন। সে ভুক্তভোগী হজরত জার্জিসও আজ কারবালাক্ষেত্রে।-এই প্রকার হজরত ইয়াকুব, আসহাব, ইসহাক, ইদ্রীস, আয়ুব, ইলিয়াস, হরকেল, শামাউন, লূত, এহিয়া, জাকারিয়া প্রভৃতি মহা মহা মহাত্মাগণের আত্মা অদৃশ্য শরীরে কারবালায় হোসেনের দৈহিক শেষ ক্রিয়ার জন্য উপস্থিত হইলেন।
