আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্ এজিদের নিকট পত্র লিখিলেন, “বাদশার অনুগ্রহে দাসের প্রাণদান হউক! আমি কৌশল করিয়া মোহাম্মদের রওজা হইতে ইমাম হোসেনকে বাহির করিয়াছি। বিশ্বস্ত গুপ্ত সন্ধানী অনুচরমুখে সন্ধান পাইলাম যে, ইমাম হোসেন কুফা নগরের পথ ভুলিয়া দাস্ত কারবালা অভিমুখে যাইতেছেন। তাঁহার পূর্বপ্রেরিত সাহসী মহাবীর মোস্লেমকে কৌশলে বন্দি করিয়া রাখিয়াছি। এই অবসরে হোসেনের পশ্চাৎ পশ্চাৎ কতকগুলি ভাল ভাল সৈন্য প্রেরণ করা নিতান্ত আবশ্যক। ওত্বে অলীদকে কুফার দিকে সৈন্যসহ পাঠাইলে প্রথমে মোস্লেমকে মারিয়া পরে তাহারাও হোসেনের পশ্চাদ্বর্তী হইয়া হোসেনকে আক্রমণ করিবে। প্রথমে মোস্লেমকে মারিতে পারিলে, আর হোসেনের মস্তক দামেস্কে পাঠাইতে কিছুই বিঘ্ন হইবে না,-ক্ষণকাল বিলম্ব হইবে না।”
আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্ স্বহস্তে পত্র লিখিয়া গুপ্তসন্ধানী অনুচরকে কাসেদ্ পদে নিযুক্ত করিয়া দামেস্কে পাঠাইলেন। এদিকে মোস্লেমের নিকট দিন দিন আরো ন্যূনতা স্বীকার করিয়া, তাঁহার যথোচিত সেবা করিতে লাগিলেন এবং সময়ে সময়ে হোসেনের আগমনে বিলম্বজনিত দুঃখে নানাপ্রকার দুঃখ প্রকাশ করিয়া, মোস্লেমকে নিশ্চিন্ত রাখিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্ প্রেরিত কাসেদ্ পুরস্কার-লোভে দিবারাত্রি পরিশ্রম করিয়া দামেস্কে পৌঁছিলেন। দামেস্কাধিপতি এজিদ্ কাসেদের পরিচয় পাইয়া সমুদয় বৃত্তান্ত নির্জনে অবগত হইয়া, মহানন্দে কাসেদ্কে যথোচিত পুরস্কৃত করিয়া প্রধান সৈন্য ও সৈন্যাধ্যগণকে আহ্বানপূর্বক বলিতে লাগিলেন, “এত দিনের পর আমার পরিশ্রমের ফল ফলিয়াছে। আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্ কৌশল করিয়া হোসেনকে মদিনা হইতে বাহির করিয়াছেন, তোমরা এখনই প্রস্তুত হইয়া হোসেনের অনুসরণ কর। মরুস্থল কারবালার পথে যাইলে পলাতক হোসেনের দেখা পাইবে। যদি পথের মধ্যে আক্রমণ করিবার সুযোগ না হয়, তবে একেবারে নির্দিষ্ট স্থানে যাইয়া অগ্রে ফোরাত নদীর পূর্বকূল বন্ধ করিবে। মদিনা হইতে কুফা পর্যন্ত গমনোপযোগী আহারীয় এবং পানীয় বস্তুর সুবিধা করিয়া হোসেন মদিনা পরিত্যাগ করিয়াছেন। সঙ্গেও ষষ্টি-সহস্র লোক। ইহাদের পানোপযোগী জল সর্বদা সংগ্রহ করা সহজ কথা নহে। তোমাদের প্রথম কার্যই কারবালার ফোরাত নদীর কূল আবদ্ধ করিয়া রাখা। হোসেন-পক্ষীয় একটি প্রাণীও যেন ফোরাতকূলে আসিতে না পারে, ইহার বিশেষ উপায় করিতে হইবে। দিবারাত্রি সদাসর্বদা সতর্কভাবে থাকিবে যে, কোন সময়ে কোন সুযোগে এক পাত্র জল হোসেনের কি তৎসঙ্গী কোন লোকের আশু প্রাপ্য না হয়। বারি রোধ করিতে পারিলেই তোমাদের কার্য সিদ্ধ হইবে। হোসেনের মস্তক যে ব্যক্তি এই দামেস্কে আনিয়া আমার সম্মুখে উপস্থিত করিবে, তৎক্ষণাৎ তাহাকে লক্ষ মুদ্রা পুরস্কার দিব এবং বিজয়ী সৈন্যদিগের নিমিত্ত দামেস্কের রাজভাণ্ডার খুলিয়া রাখিব। যাহার যত ইচ্ছা, সে তাহা গ্রহণ করিতে পারিবে; কোন প্রতিবন্ধক থাকিবে না।”
প্রধান প্রধান সৈন্যগণ, ওমর, সীমার প্রভৃতি বলিয়া উঠিলেন, “মহারাজ! এবার হোসেনের মস্তক না লইয়া আর দামেস্কে ফিরিব না।” সীমার অতিদর্পে বলিতে লাগিল, “আর কেহই পারিবে না, আমিই হোসেনের মাথা কাটিব, কাটিব-নিশ্চয়ই কাটিব; পুরস্কারও আমিই লইব। আর কেহই পারিবে না। হোসেনের মাথা না লইয়া সীমার এ নগরে আর আসিবে না। -এ-ই সীমারের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।”
এজিদ্ বলিলেন, “পুরস্কারও ধরা রহিল।” এই বলিয়া এজিদ্ সীমারকে প্রধান সৈন্যধ্যক্ষ পদে নিয়োজিত করিয়া বিদায় করিলেন।
পাঠকগণ! এতদিন আপনাদের সঙ্গে আসিতেছি, কোন দিন মনের কথা বলি নাই। বিষাদ-সিন্ধুতে হাসি রহস্যের কোন কথা নাই, তন্নিমিত্ত এ পর্যন্ত হাসি নাই। কাঁদিবার অনেক কথা আছে, অথচ নিজে কাঁদিয়া আপনাদিগকে কাঁদাই নাই। আজ মন কাঁপিয়া উঠিল। সীমার হোসেনের মস্তক না লইয়া আর দামেস্কে ফিরিবে না-প্রতিজ্ঞা করিল। সীমার কে? পরিচয় এখনো প্রকাশ পায় নাই; কিন্তু ভবিষ্যতে ইহার পরিচয় অপ্রকাশ থাকিবে না। সীমারের নামে কেন যে হৃদয়ে আঘাত লাগিতেছে, জানি না। সীমারের রূপ কোন লেখকই বর্ণনা করেন নাই, আমিও করিব না। কল্পনাতুলি হস্তে তুলিয়া আজ আমি এখন সেই সীমারের রূপ বর্ণনে অক্ষম হইলাম। কারণ বিষাদ-সিন্ধুর সমুদয় অঙ্গই ধর্মকাহিনীর সহিত সংশ্লিষ্ট। বর্ণনার কোন প্রকার ন্যূনাধিক্য হইলে প্রথমতঃ পাপের ভয়, দ্বিতীয়তঃ মহাকবিদিগের মূল গ্রন্থের অবমাননাভয়ে তাঁহাদের বর্ণনায় যোগ দিলাম। সীমারের ধবল বিশাল বক্ষে লোমের চিহ্নমাত্র নাই, মুখাকৃতি দেখিলেই নির্দয় পাষাণহৃদয় বলিয়া বোধ হইত-দন্তরাজি দীর্ঘ ও বক্রভাবে জড়িত-প্রাচীন কবির এইমাত্র আভাস এবং আমারও এইমাত্র বলিবার অধিকার, নাম সীমার।
এজিদ্ সৈন্যদিগকে নগরের বাহির করিয়া দিয়া ফিরিয়া আসিলেন। আবদুল্লাহ্ জেয়াদের লিখনানুসারে মারওয়ানকে সৈন্যসহ মদিনা পরিত্যাগ করিয়া কুফা নগরে মোস্লেমকে আক্রমণ করিবার জন্য আদেশ প্রদান করিলেন। সংবাদবাহক সংবাদ লইয়া যাইবার পূর্বেই ওত্বে অলীদ ও মারওয়ান সৈন্যসহ হোসেনের অনুসরণ করিতে কুফার পথে যাত্রা করিয়াছিলেন। পথিমধ্যে দামেস্কের কাসেদ্মুখে সমুদয় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া অলীদ এবং মারওয়ান অবিশ্রামে কুফাভিমুখে সৈন্যসমভিব্যাহারে যাইতে লাগিলেন। দিবারাত্র পরিশ্রম করিয়া বুদ্ধির অগম্য; চিন্তার বহির্ভূত-অল্প সময় মধ্যে কুফার নিকটবর্তী হইলে জেয়াদের অনুচরেরা জেয়াদের নিকট সংবাদ দিল যে, “মহারাজ এজিদের সৈন্যাধ্যক্ষ মারওয়ান এবং ওত্বে অলীদ সৈন্যসহ নগরপ্রান্তে উপস্থিত হইয়াছেন, কী কর্তব্য?”
