এজিদ্ মন্ত্রীবর হামানের কথা মনঃসংযোগে শুনিল, কিন্তু তাহার চিরহিংসাপূর্ণ হৃদয়কে স্ববশে আনিতে পারিল না। দুর্নিবার ক্রোধ দ্বাদশ প্রকার হিংসার জীবনমূর্তি ধারণ করিয়া তাহার হৃদয় অধিকার করিয়া বসিল। লোহিত লোচনে ক্রোধযুক্ত স্বরে বলিল, “তুমি মাবিয়ার মন্ত্রী-আমার সহিত তোমার কোন মতেরই ঐক্য নাই-হইবেও না,-হইতে পারেও না। তুমি অনেক সময় আমাকে মনঃকষ্ট দিয়াছ। আমি তোমার মুখ দেখিতে ইচ্ছা করি না। তুমি দূর হও-আমার সম্মুখ হইতে দূর হও। কে আছ, এই বৃদ্ধ পাগলটাকে রাজপুরী হইতে বাহির করিয়া কারাগারে আবদ্ধ কর। যাহার কোন জ্ঞান নাই, তাহার উপযুক্ত স্থান মশান বা শ্মশান। যাও বুদ্ধিমান, যাও তোমার পরিপক্ক মস্তক লইয়া জীবনের অবশিষ্ট অংশ কারাগারে বাস কর। রাজ-প্রাসাদে তোমার আর স্থান নাই।”
আজ্ঞামাত্র প্রহরিগণ বৃদ্ধ সচিবকে লইয়া চলিল। মন্ত্রীবর যাইবার সময়ও বলিলেন, “মহারাজ! রাজ আজ্ঞা শিরোধার্য। আমি এখনও বলিতেছি, আপনি স্বয়ং যুদ্ধে যাইবেন না, মারওয়ানের সংবাদ না লইয়া কখনো নগর পরিত্যাগ করিবেন না।”
এজিদ্ মহাক্রোধে বলিল, “আমি এখনই যুদ্ধে যাইব। কোথায়?-ওমর কোথায়? হাসেম কোথায়?”
শশব্যস্তে সৈন্যাধ্যক্ষগণ উপস্থিত হইল। পুনরায় এজিদ্ বলিল, “মদিনা আক্রমণে, হানিফার বধ-সাধনে, আমার সহিত এখনই সসৈন্যে যাত্রা করিতে হইবে। প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ পদে আজ ওমর বরিত হইলেন; যাও-প্রস্তুত হও, যত সৈন্য নগরে আছে, তাহাদিগকে লইয়া প্রস্তুত হও।”
উদ্ধার পর্ব ২১ প্রবাহ
হুতাশনের দাহন আশা, ধরণীর জলশোষণ আশা, ভিখারীর অর্থলোভে আশা, চক্ষুর দর্শন আশা, গাভীর তৃণভক্ষণ আশা, ধনীর ধনবৃদ্ধির আশা, প্রেমিকের প্রেমের আশা, সম্রাটের রাজ্যবিস্তার আশার যেমন নিবৃত্তি নাই, হিংসাপূর্ণ পাপহৃদয়ে দুরাশারও তেমনি নিবৃত্তি নাই-ইতি নাই। যতই কার্যসিদ্ধি, ততই দুরাশার শ্রীবৃদ্ধি। জয়নাবের রূপমাধুরী হঠাৎ এজিদ্-চক্ষে পড়িল, অন্তরে দুরাশার সঞ্চার হইল। স্বামী জীবিত,-জয়নাবের স্বামী আবদুল জাব্বার জীবিত; অত্যাচার, বলপ্রকাশ মাবিয়ার নিতান্ত অমত, অথচ জয়নাব-রত্ন লাভের আশা। কি দুরাশা! সে কার্যও সিদ্ধ হইল, কিন্তু আশার ইতি হইল না। সে রত্নখচিত সজীব পুষ্পহার দৈবনির্বন্ধে যে কণ্ঠে শোভা করিল-হৃদয় শীতল করিল-সেই কণ্টক। এজিদ্-চক্ষে হাসান বিষম কণ্টক; তাঁহার জীবন অন্ত করিতে পারিলেই আশা পূর্ণ হয়। তাহাও ঘটিল; কিন্তু আশার ইতি হইল না। যাহার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে, তাহার জীবন-প্রদীপ নির্বাণ না করিলে মনের আশা কখনোই পূর্ণ হইবে না। ঘটনাক্রমে কার্বালা-প্রান্তরে প্রভাত হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত রক্তের স্রোত বহিয়া তাহাও ঘটিয়া গেল। সৈন্যসামন্ত প্রহরী পরিবেষ্টিত হইয়া সে মহামূল্য জয়নাবরত্ন দামেস্ক নগরে আসিল, কিন্তু আশার ইতি হইল না।
বৃদ্ধ মন্ত্রী হামান কথার ছলে বলিয়াছিলেন, “যে আমার নয়; আমি তাহার কেন হইব।” এ নিদারুণ বচন কি আঘাতিত হৃদয়মাত্রেরই মহৌষধ? না-রূপজ মোহ যে হৃদয়কে সম্পূর্ণরূপে অধিকার করিয়া বসিয়াছে, সে হৃদয় যথার্থ মানব হৃদয় হইলেও সময়ে সময়ে পশুস্বভাবে পরিণত হয়। প্রথম কথাতেই জয়নাবের মনের ভাব এজিদ্ অনেক জানিতে পারিয়াছেন, সুতীক্ষ্ণ ছুরিকাও দেখিয়াছেন। সে অস্ত্র তাঁহার বক্ষে বসিবে না, যাহার অস্ত্র, তাঁহারই বক্ষ, তাঁহারই শোণিত,-কিন্তু বিনা আঘাতে, বিনা রক্তপাতে, তাঁহার হৃদয়ের রক্ত আজীবন শরীরের প্রতি লোমকূপ হইতে যে অদৃশ্যভাবে ঝরিতে থাকিবে, তাহাও তিনি বুঝিয়াছিলেন। তবে আশা?-আছে। দুরাশা কুহকিনী, এজিদের কানে কয়েকটি কথার আভাস দিয়াছে,-তাহাতেই এজিদের অন্তরে এই কথা-এ কি কথা? কমলে গঠিত কোমলাঙ্গীর হৃদয় কি পাষাণ? কোমল হস্তে লৌহ অস্ত্র! কমল-অক্ষিতে বজ্র দৃষ্টি? কোমল-বদনে কর্কশ ভাষা? কোমল-প্রাণে কঠিন ভাব? অসম্ভব! অসম্ভব! সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং বিপরীত! অবশ্যই কারণ আছে। জয়নাল, হানিফা প্রভৃতি জীবিত। সেই কি মূল কারণ? নিশ্চয় তাহারা ভব-ধাম হইতে চিরকালের জন্য সরিলে নিশ্চয় এ বিপরীত ভাব কখনোই থাকিবে না। নিশ্চয়! নিশ্চয়!! নিশ্চয়!!! চিরকালের জন্য সে সময় সে পদ্ম-চক্ষুতে এজিদের ছায়া ভিন্ন আর কোন ছায়া আসিবে না। সে হৃদয়ে সদা সর্বদা এজিদ্-রূপ ব্যতীত আর কোনরূপ জাগিবে না। নিশ্চয়ই কমলে কমল মিশিয়া-কোমল ভাব ধারণ করিবে। আপাদ মস্তকে অন্তরে, হৃদয়ে, প্রাণে, শরীরে উত্তাপবিহীন সুকোমল বিজলীছটা সবেগে খেলিতে থাকিবে।”
দুরাশা! দুরাশা!!
কুহকিনী আশার এই ছলনায় এজিদ্ কাহারো কথায় কর্ণপাত করিলেন না। দুন্দুভি বাজাইয়া লোহিত নিশান উড়াইয়া, যাত্রা করিলেন। ওমর হাসেম, আবদুল্লাহ্ জেয়াদ প্রভৃতি পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যসহ মহারাজের পশ্চাদ্বর্ত্তী হইলেন। গুপ্তচর সন্ধানীরা কেহ প্রকাশ্যে, কেহ অপ্রকাশ্যে, কেহ ছদ্মবেশে, সকলের অগ্রে নানা সন্ধানে নানা পথে ছুটিল। যেখানে যাহা শুনিতেছে দেখিতেছে, মুহূর্তে মুহূর্তে আসিয়া জানাইয়া যাইতেছে।
একজন আসিয়া বলিল, “বাদশা নামদারের জয় হউক। কতকগুলি সৈন্য নগরাভিমুখে আসিতেছে।” এজিদের মুখভাব কিঞ্চিৎ মলিন হইল।
কিছুক্ষণ পরে আর একজন আসিয়া বলিল, “আমি বিশেষ লক্ষ্য করিয়া আসিয়াছি, যাহারা আসিতেছে তাহারা দামেস্কের সৈন্য।”
এজিদ্ মহা সন্তুষ্ট হইয়া সংবাদ-বাহককে বিশেষ পুরস্কৃত করিতে আদেশ দিয়া বিজয় বাজনা বাজাইতে আজ্ঞা করিলেন।
