এজিদ্ ক্রোধে অধীর হইয়া মারওয়ানের পত্র দূরে নিক্ষেপ করিলেন। কাসেদ্ পত্র লইয়া ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে চলিয়া গেল।
এজিদ্ বিশ্রাম-গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া আদেশ করিল, “যত সৈন্য এক্ষণে নগরে উপস্থিত আছে, সমুদয় প্রস্তুত হও-সামান্য প্রহরী মাত্র রাজপুরী রক্ষা করিবে, সৈন্য নামে নগর মধ্যে কেহ থাকিতে পারিবে না, সকলকে আমার সহিত মদিনা আক্রমণে যাইতে হইবে।-হানিফার বধসাধনে যাইতে হইবে,-মস্হাব কাক্কার মস্তক চূর্ণ করিতে যাইতে হইবে,-সীমারের দাদ উদ্ধার করিতে যাইতে হইবে। বাজাও ডঙ্কা, বাজাও ভেরী, আন অশ্ব, আন উষ্ট্র, এখনি যাত্রা করিব।”
অমাত্যগণ যাঁহারা তথায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁহারা যুদ্ধে বিরত হইতে অনেক কথা বলিলেন। কিন্তু কাহারো কথাই এজিদের নিকট স্থান পাইল না,-কর্ণে ভাল লাগিল না। পরিশেষে বৃদ্ধ হামান বলিতে লাগিলেন,-এতদিন পরে বৃদ্ধ সচিব নিতান্ত বাধ্য হইয়া স্থিরভাবে বলিতে লাগিলেন-
“মহারাজ! আমি বৃদ্ধ হইয়াছি, বয়স-দোষে আমার বুদ্ধিভ্রম জন্মিয়াছে, বিবেচনার দোষ ঘটিয়াছে, দূর চিন্তাতেও অপরাগ হইয়াছি। ইহা আমি স্বীকার করি। কিন্তু মহারাজ! এই বৃদ্ধ আপনার পিতার চিরহিতৈষী, আপনার হিতৈষী, দামেস্ক রাজ্যের হিতৈষী। এই দামেস্ক রাজ্য পূর্বে যাঁহার করতলগত ছিল, ন্যায়ের অনুরোধে উচিত বলিতে এই বৃদ্ধ কখনই তাঁহার নিকট সঙ্কুচিত হয় না। তাহার পর আপনার পিতার রাজত্বকালেও এই বৃদ্ধ সর্বপ্রধান মন্ত্রীর আসন প্রাপ্ত হইয়া ন্যায্য কথা বলিতে কখনোই ত্রুটি করে নাই-ভীত হয় নাই। মহারাজের রাজত্ব সময়েও কর্তব্য কার্যে পশ্চাদ্পদ হয় নাই। কিন্তু মহারাজ! সেকাল আর একাল অনেক ভিন্ন। পূর্বে মন্ত্রণার বিচার হইত, তর্কে মীমাংসা হইত,-ভ্রম কাহার না আছে? ভূপতির ভ্রম হইলে তিনি ভ্রম স্বীকার করিতেন। অমাত্যগণের ভ্রম হইলে তাঁহারাও ভ্রম স্বীকার করিতেন। এখন সে কাল নাই, সে মন্ত্রণাও নাই, সে মীমাংসাও নাই। ন্যায্য হউক, অন্যায্য হউক, ন্যায় হউক, অন্যায় হউক স্ব স্ব মত প্রবল করিতে সকলেই ব্যস্ত, সকলেই চেষ্টিত। বিশেষ অপরিপক্ক মস্তিষ্কের নিকট আমরা এক প্রকার বাতুল বলিয়াই সাব্যস্ত হইয়াছি। মহারাজ! মনে হয়, হাসানের বিষপানের পর এই নির্বোধ বৃদ্ধ কি বলিয়াছিল? সেই প্রকাশ্য দরবারে কি বলিয়াছিল? নবীন বয়সে, নূতন সিংহাসনে বসিয়া কৃষ্ণকেশ বিকৃত অপরিপক্ক মস্তিষ্কের মন্ত্রণাতেই মত দিলেন। সেই অদূরদর্শী, ভাবি-জ্ঞান-শূন্য মজ্জারই বেশি আদর করিলেন। মনের বিরাগে সারগর্ভ উপদেশ বিবেচনা না করিয়া সে সম্পূর্ণ ভ্রমময় অসার বাক্যেরই পোষকতা করিলেন। এ পাগল তুচ্ছ হইল। বালকেই বালকের বুদ্ধির প্রশংসা করে, যুবাই যুবার নিকট আদর পায়। আমি বয়সে মহা প্রাচীন হইলেও আপনি রাজা, মাথার মণি। এই যুদ্ধ সম্বন্ধে সেই এক দিন আমার মত প্রকাশ করিয়াছি, আর আজ রাজ্যের দুরবস্থা, ভবিষ্যতে বিপদের আশঙ্কা দেখিয়া বলিতে বাধ্য হইয়াছি। মহারাজ! বৃদ্ধ মন্ত্রীর অপরাধ মার্জনা হউক। একবার ভাবিয়া দেখুন দেখি, যে কারণে যুদ্ধ, যে কারণে দামেস্ক রাজ্যের এই শোচনীয় দশা, সে কারণের পরীক্ষা তো অগ্রেই হইয়াছিল? যে আমার নয়, আমি তাহার কেন হইব,-এ কথা সকলের বুঝা উচিত। এক জিনিসের দুইটি গ্রাহক হইলে, পরস্পর শত্রুভাব হিংসা ভাব স্বভাবতঃই যে উপস্থিত হয়, ইহা আমি অস্বীকার করি না। তবে যাহার হৃদয় আছে, মনুষ্যত্ব আছে, সে সেদিকে ভ্রমেও লক্ষ্য করে না, তাহাও জানি। যাহার অসহ্য হয়, যে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়া যাহা ইচ্ছা তাহাই করিয়া বসে-করিতেও পারে। কারণ, যৌবনকাল বড়ই ভীষণ কাল। সে কালের অনেক দোষ মার্জনীয়। তবে যে হৃদয়ে শক্তি আছে, যে হৃদয়ে শক্তি আছে, যে মনে বল আছে, তাহার কথা স্বতন্ত্র। শত্রুপরিবারে শত্রুতা কি? তাহার সন্তান সন্ততি পরিজনে হিংসা কি! মহারাজ! হোসেনের শির দামেস্কে কেন আসিল? হোসেন পরিবার দামেস্ক-কারাগারে বন্দি কেন? ইহার কি কোন উত্তর আছে? বিধির ঘটনা, অদৃষ্টের লেখা খণ্ডাইতে কাহারো সাধ্য নাই। মহারাজ! এখনও উপায় আছে, রক্ষার পন্থা আছে। আপনি ক্ষান্ত হউন। রাজ্যবিস্তারে আমার অমত নাই, কিন্তু তাহার জন্য সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করুন। এখন চতুর্দিকে যে আগুন জ্বলিয়াছে, আপনি তাহা সহজে নির্বাণ করিতে পারিবেন না। প্রকৃতি ন্যায়ের সহায়, অন্যায়ের বৈরী। মন্ত্রীবর মারওয়ান এখন নিজ ভ্রম স্বীকার করিয়া দামেস্ক রাজ্য রক্ষাহেতু জয়নাল আবেদীনকে কারামুক্ত করিতে মন্ত্রণা দিতেছেন। সে সম্বন্ধে মহারাজ যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করিবেন আমি তাহার সদুত্তর করিব। তবে সামান্য একটু বলিয়া রাখি যে, হানিফার যে জ্বলন্ত রোষাগ্মি সহজে নির্বাণ হইবার নহে। আপনি যে আজ স্বয়ং যুদ্ধে অগ্রসর হইতেছেন, সেই সম্বন্ধে আমার কয়েকটি কথা আছে। -প্রথম আপনি কোথায় যুদ্ধে যাইতেছেন? যদি বলেন মদিনা-আমি বলিতেছি, মদিনায় যাইবার আর ক্ষমতা নাই। সীমার হত, অলীদ পরাস্ত, মারওয়ান ভয়ে কম্পিত; এ অবস্থায় মদিনা আক্রমণ করা দূরে থাকুক-মদিনার প্রান্তরসীমাতেও প্রবেশ করিতে পারিবেন না। ধন-বল আর বাহুবলই রাজার বল, ক্রমাগত যুদ্ধে ধনভাণ্ডার প্রায় শূন্য হইল; আর বাহুবল এখন নাই বলিলেই হয়। সীমারের সহিত সীমারের সৈন্যও গিয়াছে,-ওত্বে অলীদ সৈন্য সামন্ত হারাইয়া প্রাণে বাঁচিয়া আছে মাত্র। এখন একমাত্র সম্পূর্ণরূপে জীবিত মারওয়ান। রাজ্যরক্ষার জন্যও সৈন্যের প্রয়োজন। আজ যে আদেশ প্রচার হইয়াছে, তাহাতে রাজ্যরক্ষার আর কোন উপায় দেখিতেছি না। কারণ শত্রুর নানা পথ, শত্রুর সন্ধান অব্যর্থ। মহারাজ এদিকে যুদ্ধযাত্রা করিবেন, অন্য পথে যদি শত্রু আসিয়া নগর আক্রমণ করে, তখন কে রক্ষা করিবে? সে অস্ত্র-সম্মুখে বক্ষ পাতিয়া কে দণ্ডায়মান হইবে? আমি মহারাজের গমনে বাধা দিতেছি না। আপনারই রাজ্য, আপনারাই সিংহাসন, আপনিই রক্ষা করিবেন। আমার যাহা বলিবার বলিলাম-গ্রাহ্য করা না করা মহারাজের ইচ্ছা।”
