আজ্ঞামাত্র ঘোর রবে ভেরী বাজিতে লাগিল। সৈন্যগণ নিদ্রাসুখ পরিহার করিয়া আতঙ্কে জাগিয়া উঠিল। সাজ সাজ রবে চতুর্দিকে মহা কোলাহল পড়িয়া গেল। সজ্জিত হইলে প্রভাতীয় উপাসনা সময়ের আহ্বান-স্বরে সকলের কর্ণকে আনন্দিত করিল। মদিনাবাসীরা প্রথমে ভেরীর শব্দ এবং পরে উপাসনার সুমধুর আহ্বান-স্বরে জাগরিত হইয়া নিয়মিত উপাসনায় যোগ দিলেন। মোহাম্মদ হানিফা, গাজী রহমান প্রভৃতি সৈন্যাধ্যক্ষগণ এবং সৈন্যগণ, সজ্জিত-বেশে উপাসনায় দণ্ডায়মান হইয়া একাগ্রচিত্তে উপাসনা সমাধান করিয়া, জয়নালের উদ্ধারের জন্য পরমেশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিলেন।
নগরবাসীরা মহাব্যস্ত হইয়া হানিফার চতুর্দিক বেষ্টন করতঃ যোড়করে বলিতে লাগিলেন, “হজরত! গতকল্য আমরা যে প্রার্থনা করিয়াছিলাম, তাহা বোধ হয় গ্রাহ্য হইল না।”
মোহাম্মদ হানিফা বিনয়বচনে বলিলেন, “ভ্রাতৃগণ! বিগত নিশায় স্বপ্নযোগে প্রভু মোহাম্মদ আমাকে দামেস্ক গমনে আদেশ করিয়াছেন। আর আমার সাধ্য নাই যে, এখানে ক্ষণকাল বিলম্ব করি!”
“হজরত! আমরা অজ্ঞ, অপরাধ মার্জনা হউক। ঐ আদেশের জন্যই সপ্তাহকাল মদিনায় অবস্থিতির নিমিত্ত পূর্বেও প্রার্থনা করিয়াছিলাম। গতকল্যের প্রার্থনাও ঐ কারণে। আমরা চির-আজ্ঞাবহ দাস, মার্জনা করিবেন। এখন আমাদের আর কোন কথা নাই-আপনিও প্রস্তুত হইয়াছেন, আমরাও প্রস্তুত আছি। আপনি অশ্বে কশাঘাত করিলেই দেখিবেন, কত লোক জয়নাল উদ্ধারে আপনার অনুগামী হয়।”
মোহাম্মদ হানিফা, মস্হাব কাক্কা, গাজী রহমান ও হানিফার আর আত্মীয়-স্বজন এবং ভিন্ন ভিন্ন দেশীয় রাজগণ, বীরদর্পে অশ্বপৃষ্ঠে ঈশ্বরের নাম করিয়া চাপিয়া বসিলেন। রণবাদ্য বাজিতে লাগিল। সৈন্যগণ শ্রেণীবদ্ধ হইয়া হানিফার বিজয় ঘোষণা করিতে করিতে যাত্রা করিল। ধানুকী, পদাতিক ও পতাকিগণ আনন্দ-রবে অগ্রে চলিল।
সপ্তবার হজরতের পবিত্র রওজা পরিক্রম করিয়া সমস্বরে ঈশ্বরের নাম ডাকিয়া সকলে জয়নাল-উদ্ধারে যাত্রা করিলেন। মদিনাবাসীরাও অস্ত্র শস্ত্রে সুসজ্জিত হইয়া মহানন্দে হানিফার জয়ঘোষণা করিতে করিতে সৈন্যদলে মিশিলেন। মারণ ভিন্ন মরণ কথা কাহারো মনে নাই। সিংহদ্বার পার হইয়া সকলে পুনরায় একস্বরে ঈশ্বরের নাম সপ্তবার উচ্চারণ করিয়া যাইতে লাগিলেন। পথপ্রদর্শক উষ্ট্রারোহী মধুরস্বরে বংশীবাদন করিতে করিতে সকলের অগ্রে অগ্রে চলিল।
দিবাভাগে গমন-রাত্রে বিশ্রাম। এই ভাবে কয়েক দিন যাইতে যাইতে একদিন পথপ্রদর্শকদল সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার জন্য ভেরী বাজাইতে লাগিলেন। সকলেই সমুৎসুক হইয়া সম্মুখে স্থিরনেত্রে দৃষ্টি করিতেই দেখিলেন যে, বহুদূরে শিবিরের উচ্চ চূড়ায় লোহিত নিশান উড়িতেছে। গাজী রহমান সাঙ্কেতিক নিশান উড়াইয়া সকলকে গমনে ক্ষান্ত করিলেন। সকলেই মহাব্যস্ত। তত্ত্বানুসন্ধানে জানিলেন যে, সম্মুখে সমরনিশান উড়িতেছে, সবিশেষ না জানিয়া আর অগ্রসর হওয়া উচিত নহে।
মারওয়ান-শিবিরেও মারওয়ান ভেরীবাদনধ্বনি শুনিয়াছে।
শিবিরের বাহিরে আসিয়া যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার মুখে অন্য কোন কথা সরিল না। অস্থির ও আতঙ্কিত ভাবে অলীদকে জিজ্ঞাসা করিল, “ভ্রাতঃ! আবার যে পূর্বগগনে কি দেখা যায়। ঐ কি আগমন?”
“কার আগমন?”
“আর কার? যার ভয়ে অলীদ কম্পমান-মারওয়ান অস্থির।”
অলীদ বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখিয়া বলিল, “আর সন্দেহ নাই-এক্ষণে কি করা যায়?”
“আর কি করা! কিছু দিন বিশ্রাম করিব আশা ছিল-ঘটিল না।-আর ক্ষণকাল তিষ্ঠিলেই তোমার আমার দশা মিলিয়া মিশিয়া বোধ হয়, একই হইবে। হয়ত কিছু বেশিও হইতে পারে। পূর্ব সঙ্কল্প ঠিক রাখিয়া, যত শীঘ্র হইতে পারে, যাইয়া নগর-রক্ষার উপায় করা কর্তব্য। নিতান্ত পক্ষে চাপিয়া পড়ে, দামেস্ক নগর-নিকটস্থ প্রান্তরে আবার ডঙ্কা বাজাইয়া নিশান উড়াইয়া ফিরিয়া দাঁড়াইব। এখানে আর কিছুই নহে; প্রস্থান-ত্রস্তে প্রস্থান।”
“উহারা যে বিক্রমে আসিতেছে, আমরা যে উহাদের অগ্রে দামেস্কে যাইতে পারিব, তাহাতেও অনেক সন্দেহ! আপন রাজ্যে দ্বিগুণ বল; যেখানেই ধর ধর, সেই খানেই মার মার। ঐ দেখ, উহারাও গমনে ক্ষান্ত হইয়াছে। না জানিয়া, বিশেষ তত্ত্ব না লইয়া কেন অগ্রসর হইবে? আমাদের সন্ধান না লইতে লইতে আমরা এ স্থান হইতে চলিয়া যাই। আর কথা নাই ভাই। প্রস্থান,-শীঘ্র প্রস্থান।”
তখনই শিবির-ভঙ্গের আদেশ হইল, লোহিত পতাকা নীচে নামিল। মুহূর্তমধ্যে শিবির ভঙ্গ করিয়া, মারওয়ান ও অলীদ সৈন্যগণসহ দামেস্কাভিমুখে বেগে চলিল।
ওদিকে গাজী রহমান মহা চিন্তায় পড়িয়াছেন! এই নিশান উড়িতে উড়িতে কোথায় উড়িয়া গেল? দেখিতে দেখিতে শিবিরও ভগ্ন হইল। লোকজনও সরিতে লাগিল। ক্রমেই ঈষৎ দৃষ্টি,-ক্রমেই দৃষ্টির অগোচর।
মোহাম্মদ হানিফা গাজী রহমানকে বলিলেন, “আর চিন্তা কেন? পৃষ্ঠ দেখাইয়া যখন পলাইয়া গেল, তখন আর সন্দেহ কি? পলায়িত ব্যক্তির পরিচয় নিষ্প্রয়োজন,-আজ এই স্থানেই বিশ্রাম।”
“তাহাতে ক্ষতি নাই, কিন্তু বিশেষ সতর্কভাবে থাকিতে হইবে। উহারা পলাইয়া বলিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারি না। গুপ্তচরদিগকে কয়েক জন চতুর সৈন্যসহ সন্ধানে পাঠাইতেছি। সন্ধান করিয়া জানিয়া আসুক-উহারা কে? কেন শিবির স্থাপন করিয়াছিল? কেনই বা চলিয়া গেল?”
“ও’ত ওত্বে অলীদের শিবির নহে!”
