অলীদ বলিল, “ভ্রাতঃ! হানিফার বলবিক্রম দেখিয়া স্বদেশের আশা, জীবনের আশা, ধন-জন পরিজন আশা হইতে একেবারে নিরাশ হই নাই বটে, কিন্তু সন্দেহ অনেক ঘটিয়াছে?”
“আরে ভাই! আমিই তো সীমার-উদ্ধার ও তোমার সাহায্য, এই দুই কার্যের ভার গ্রহণ করিয়া আসিয়াছি। সীমারের উদ্ধার তো এ জীবনে এক প্রকার শেষ হইল। এখন তোমার সাহায্য বাকী। যাহা হউক, এই সকল অবস্থা লিখিয়া মহারাজ সমীপে কাসেদ্ প্রেরণ করি। উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমরা এই স্থানেই অবস্থিতি করিব। এ স্থানটি অতি মনোহর ও মনোরম।”
উদ্ধার পর্ব ১৯ প্রবাহ
রাত্রির পর দিন, দিনের পর রাত্রি আসিয়া, দেখিতে দেখিতে সপ্তাহ কাল অতীত হইয়া গেল। মদিনাবাসীরা মোহাম্মদ হানিফাকে সসৈন্যে আর এক সপ্তাহ মদিনায় থাকিতে বিশেষ অনুরোধ করিলেন। হানিফা অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া হাঁ-না, কিছুই কহিলেন না।
গাজী রহমান বলিলেন, “আপনাদের অনুরোধ অবশ্যই প্রতিপাল্য; কিন্তু জয়নাল উদ্ধারে যতই বিলম্ব, ততই আশঙ্কা, ততই বিপদ মনে করিতে হইবে। এ সময় বিশ্রামের সময় নহে। এক এক মুহূর্ত এক এক যুগ বলিয়া মনে হইতেছে! বিশেষ মারওয়ানের মন্ত্রণার অন্ত নাই-কোন্ সময় এজিদ্কে কোন্ পথে চালাইয়া কি অনর্থ ঘটাইবে, তাহা কে বলিতে পারে? হয় তো সে সময় এজিদের প্রাণান্ত সহিত দামেস্ক, নগর সমভূমি করিলেও সে দুঃখের উপশম হইবে না,-সে অনন্ত দুঃখের ইতি হইবে না। আপনারা প্রবীণ এবং প্রাচীন, যাহা ভাল হয় করুন।”
নাগরিকদল হইতে একজন বলিলেন, “মন্ত্রিবর! আপনার সারগর্ভ বচন অবশ্যই আদরণীয়, সন্দেহ নাই। কিন্তু আমরা যে কারণে প্রভুকে আর এক সপ্তাহ কাল থাকিতে অনুরোধ করিতেছি, সে কথা এখন বলিব না। তবে সময়ে তাহা অপ্রকাশ থাকিবে না। জয়নাল আবেদীন, এজিদ্ পাপাত্মার বন্দিগৃহে বন্দি; প্রভু হাসান হোসেনের স্ত্রী পরিবার নূরনবী মোহাম্মদের সহধর্মিণী বিবি সালেমাও ইঁহারাও বন্দি; দিবারাত্র, প্রহরে দণ্ডে, পলে অনুপলে আমাদের অন্তরে এ সকল কথা জাগিতেছে-প্রাণ কাঁদিতেছে,-তাঁহাদের দুঃখের কথা শুনিয়া হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে! মনে হইতেছে যদি পাখা থাকিত, যদি মুহূর্ত মধ্যে যাইবার কোন উপায় থাকিত, তবে এখনি যাইয়া দামেস্ক নগর আক্রমণ এবং নরাধম এজিদের প্রাণবধ করিয়া জয়নাল উদ্ধারের উপায় করিতাম। আমরা ভুক্তভোগী, আমাদের পদে পদে আশঙ্কা, পদে পদে নৈরাশ্য। অধিক আর কি বলিব, এজিদের আজ্ঞায়, মারওয়ানের মন্ত্রণায়, অলীদের চক্রে, জায়েদার সাহায্যে, মায়মুনার কৌশলে, মহর্ষি হাসানকে হারাইয়াছি। জেয়াদের ছলনায়, সেই মহাপাপী চির-নারকী জেয়াদের প্রবঞ্চনায় প্রভু হোসেন, মহাবীর কাসেম এবং আলি আকবর প্রভৃতিকে মদিনা হইতে চিরবিদায় দিয়াছি। মন্ত্রিবর! কি বলিব! মদিনার শত শত সমুজ্জ্বল রত্ন, কারবালা-প্রান্তরে রক্তস্রোতে ভাসিয়া গিয়াছে-সে সকল কথা কি আমরা ভুলিয়াছি? তবে যে কেন বিলম্ব করিতেছি-বলিব। যদি ঈশ্বর সে সময়ের মুখ দেখান, তবে বলিব। আমাদের শত অনুরোধ,-মদিনাবাসী আবালবৃদ্ধ নরনারী সকলেরই অনুরোধ, আর এক সপ্তাহ আপনারা সসৈন্যে মদিনায় অবস্থিতি করুন। সময় হইলে আমরা কখনোই দামেস্কগমনে বাধা দিব না, বরং মনের আনন্দে জয় জয় রবে, জয়নাল উদ্ধারে আপনাদের সঙ্গে যাত্রা করিব।”
মদিনাবাসীদিগের মত না লইয়া দামেস্ক আক্রমণ করা হইবে না একথা পূর্ব হইতেই সুস্থির আছে। সুতরাং গাজী রহমান আর দ্বিরুক্তি করিলেন না, অন্য অন্য আলাপে নগরবাসীদিগকে সন্তুষ্ট করিলেন। সে দিন কাটিয়া গেল। নিশানগমনে ঈশ্বরাধনা করিয়া সকলেই স্ব স্ব স্থানে নিদ্রাদেবীর নিয়মিত অর্চনায় শয্যার আশ্রয় গ্রহণ করিলেন।
মোহাম্মদ হানিফা শয়ন করিয়া আছেন-ঘোর নিদ্রায় অভিভূত! স্বপ্ন দেখিতেছেন-যেন হজরত নূরনবী মোহাম্মদ তাঁহার শিয়রে দণ্ডায়মান হইয়া বলিতেছেন, “মোহাম্মদ হানিফ! জাগ্রত হও, আলস্য পরিহার কর, এ সময় তোমার বিশ্রামের সময় নহে। তোমার পরিজন দামেস্কে বন্দি, তুমি মদিনায় বিশ্রামসুখে বিহ্বল! যাও দামেস্কে ঈশ্বরের নাম করিয়া এখনই যাত্রা কর, জয়নাল উদ্ধার হইবে, কোন চিন্তা নাই। ঈশ্বর তোমার সহায়!” মোহাম্মদ হানিফা যেন স্বপ্নযোগেই প্রভুর পদধূলি মস্তকে গ্রহণ করিলেন। নিদ্রা ভাঙ্গিয়া গেল-অঙ্গ শিহরিয়া উঠিল। ভয়ে ভীত হইয়া গাজী রহমানকে ডাকিয়া, মস্হাব কাক্কা, ওমর আলী এবং আর আর আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুগণকে জাগাইয়া, স্বপ্ন-বিবরণ বলিলেন।
গাজী রহমান বলিলেন, “প্রভুর আদেশ হইয়াছে, আর বিলম্ব নাই, এখনই যাত্রা,-এই শুভ সময়। হাঁ, এখন বুঝিলাম-সময়ের অর্থ এখন বুঝিলাম। আমরা কেবল রাজনীতি, সমরনীতি, বিধি ব্যবস্থা যুক্তি ও কারণের উপর নির্ভর করিয়াই কার্য করি। ভ্রম হইলে ঈশ্বরের দোহাই দিয়া রক্ষা পাই। কিন্তু মদিনাবাসীরা আমাদের অপেক্ষা সহস্রাংশে শ্রেষ্ঠ। আমি সে সময়ের অর্থই বুঝিতে পারি নাই। ধন্য মদিনা! ধন্য তোমার পবিত্রতা! ধন্য তোমার একাগ্রতা!”
মোহাম্মদ হানিফা বলিলেন, “গাজী রহমান! আমরা বাহ্যিক ব্যবহার, বাহ্যিক কারণ দেখিয়াই কার্যানুষ্ঠান করি; কিন্তু মদিনাবাসীদিগের প্রতি কার্য ঈশ্বরে নির্ভর করে এবং নূরনবী মোহাম্মদের প্রতি তাঁহাদের অটল ভক্তি,-তাহার প্রমাণ প্রাচীন কাহিনী। প্রভুর জন্মস্থান মক্কা নগরের অধিবাসীরা প্রভুর কথায় বিশ্বাস ও আস্থা প্রকাশ করা দূরে থাকুক বরং তাঁহার জীবনের বৈরী হইয়াছিল। এই মদিনাবাসীরাই তাঁহাকে সম্মানের সহিত গ্রহণ করে এবং ঈশ্বরের সত্যধর্ম এই মদিনাবাসীরাই প্রকাশ্যভাবে অকপটে গ্রহণ করে। আর অধিক কি বলিব, মদিনাবাসীর অন্তর সরল ও প্রেমপূর্ণ। আমি এখনই যাত্রা করিব, প্রভাতের প্রতীক্ষায় আর থাকিব না।”
