সুরাইয়া রেজাল্ট কি জানতে চাইলেন না। খবরের কাগজটা মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আগ্রহের সঙ্গে বললেন, বাসা ভাড়ার এই বিজ্ঞাপনটা পড়ে দেখ। সস্তার মধ্যে খুব ভাল।
সুপ্ৰভা বিজ্ঞাপন পড়ল। দুই রুম, ড্রয়িং ডাইনিং, প্রশস্ত বারান্দা। সাউথ ফেসিং প্রচুর আলো বাতাস। ভাড়া—লাইট, গ্যাসসহ তিন হাজার টাকা।
কিরে ভাল না?
হুঁ।
আমি আর তুই আমরা একটা ঘরে থাকলাম। ইমনের জন্যে একটা ঘর ছেড়ে দিলাম।
বাসাটা কোন তলায়?
সেটাতো লেখেনি। টেলিফোন নাম্বার আছে। টেলিফোন করে দেখতো বাড়িওয়ালাকে পাওয়া যায় কি-না।
আচ্ছা।
সব ডিটেল জেনে নিবি। ফ্ল্যাট বাড়ি কি-না, কয়জন ভাড়াটে থাকেন—এইসব। কথাবার্তা ভাল মনে হলে, কাল তোকে নিয়ে যাব।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সুপ্ৰভা চলে যাচ্ছিল, সুরাইয়া হঠাৎ ডাকলেন—
সুপ্ৰভা শোন।
সুপ্ৰভা থমকে দাঁড়াল। সুরাইয়া বললেন, তোর রেজাল্ট কি?
সুপ্ৰভা নীচু গলায় বলল, মা আমি ফেল করেছি।
ফেল করেছিস!
হ্যাঁ। তিন সাবজেক্টে ফেল করেছি। প্রমোশন দেয় নি।
ফেল করেছি। কথাটা এত সহজভাবে বলতে পারলি? মুখে একবারও আটকাল না?
সুপ্ৰভা দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না। তার পা এখন আর কাঁপছে না। কেমন যেন শান্তি শান্তি লাগছে। বুকের উপর পাষাণ চেপে ছিল। সেই পাষাণ নেই। সুরাইয়া সহজ গলায় বললেন, তোর মত মেয়ের আমার দরকার নেই। তুই একটা কাজ কর—ছাদে উঠে যা। তারপর ছাদ থেকে নিচে লাফ দিয়ে পড়ে যা।
সুপ্ৰভা আগের মতই দাঁড়িয়ে রইল। একবার শুধু মার দিকে তাকাল। মায়ের মুখ কি শান্ত। কত সহজ ভাবেই না। তিনি কথাগুলি বলছেন। সুপ্ৰভা মনে মনে বলল, মা সামনের বছর থেকে আমি খুব মন দিয়ে পড়ব। ফাস্ট সেকেন্ড হয়ত হব না, কিন্তু প্রতিটি সাবজেক্ট পাশ করব। তাছাড়া আমাদের অংক মিস রোজ আমাকে অংক শেখাবেন।
সুরাইয়া তীব্র এবং তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, এখনো দাঁড়িয়ে আছিস? এক কথা আমি বার বার বলতে পারব না। যা ছাদে যা! ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে আমাকে উদ্ধার করা।
সত্যি ছাদ থেকে লাফ দিতে বলছে!
হ্যাঁ বলছি। যদি সাহস থাকে, যা করতে বলছি করা। সঙের মত দাঁড়িয়ে থাকিবি না। সং দেখতে আর ভাল লাগে না।
মিতু ছাদে শিল কুড়াচ্ছিল। হঠাৎ দেখল। সুপ্রভা ছাদে ঢুকল। মিতু হাসিমুখে বলল, শেষ পর্যন্ত তাহলে এলি। শিলগুলি রাখার জন্যে একটা পাত্র নিয়ে আয়তো।
সুপ্ৰভা দাঁড়িয়ে আছে, নড়ছে না। হঠাৎ মিতুর মনে হল সুপ্রভার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। সুপ্ৰভাকে খুবই অস্বাভাবিক লাগছে। মনে হচ্ছে কিছুক্ষনের মধ্যেই ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে।
মিতু চট করে উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে সুপ্ৰভাকে ধরতে গেল। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রেলিং বিহীন ছাদের শেষ মাথা পর্যন্ত সুপ্রভা ছুটে গেল। মিতু দেখল। সে ছাদে একা দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্ৰভা নেই।
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে জমিলুর রহমান সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পকেটে সুপ্রভার স্কুলের হেড মিসট্রেসের দেয়া কাগজ। সেখানে লেখা বিশেষ বিবেচনায় সুপ্ৰভাকে অষ্টম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করা হল। হেড মিসট্রেসের চিঠি তিনি পেয়েছেন দুপুরেই। একবার ভাবলেন তখনই বাসায় ফেরেন-তারপর মনে হল খালি হাতে বাসায় ফেরা ঠিক হবে না। পাশের মিষ্টি কিনে ফেরা দরকার। রসমালাই সুপ্রভার পছন্দ। এক কেজি রসমালাই কেনা দরকার। বিকেলে নিজেই রসমালাই কিনতে গিয়ে বৃষ্টিতে আটকা পড়লেন। সেই রসমালাই খাবার ঘরের টেবিলে সাজানো আছে। জামিলুর রহমান সাহেব বা রান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছেন। বৃষ্টি দেখতে তাঁর ভাল লাগছে, অথচ কিছুক্ষণ আগে একজন ডাক্তার এসে বলে গেছেন, মেয়ের অবস্থা ভাল না। ব্রেইন হেমারেজ হচ্ছে। আমাদের কিছু করার নেই।
জামিলুর রহমান যন্ত্রের মত বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে।
আপনি যান। ভেতরে গিয়ে মেয়ের বিছানার পাশে বসুন।
জামিলুর রহমান সহজ গলায় বললেন, কোন দরকার নেই।
তিনি হাসপাতাল থেকে বের হলেন। তাঁর কেন জানি বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হচ্ছে। ছোটবেলায় সুযোগ পেলেই বৃষ্টিতে ভিজতেন। সুযোগ পাওয়া যেত না। এখন প্রচুর সুযোগ কিন্তু বৃষ্টিতে নামতে ইচ্ছা করে না। আজ নামতে ইচ্ছা করছে। তিনি পথে নামতেই বৃষ্টি থেমে গেল। মেঘ কেটে আকাশে তারা দেখা গেল। জমিলুর রহমান সাহেব হাঁটছেন। চারপাশের পরিচিত ঢাকা নগরী তার কাছে আজ বড়ই অপরিচিত লাগছে। যেন তিনি এই নগরীকে চেনেন না। নগরীও তাঁকে চেনে না।
মৃত্যুর ঠিক আগে আগে সুপ্রভার পূর্ণ জ্ঞান ফিরে এল। সে তার মার দিকে তাকিয়ে বলল, মা আমি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে বিরাট একটা ভুল করেছি। তুমি কিছু মনে করো না। আমাকে ক্ষমা করে দিও।
সুরাইয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। মনে হচ্ছে কি ঘটছে তিনি বুঝতে পারছেন না।
সুপ্ৰভা বলল, মা আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তুমি আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দাও।
সুরাইয়া মেয়ের গায়ে হাত রাখলেন। সুপ্ৰভা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বড় মামা যদি আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় তাহলে আমার ব্যথাটা কমবে। বলার পর পরই সে মারা গেল।
মিতু ছুটে গেল করিডোরের দিকে, করিডোর শূন্য। সেখানে কেউ নেই। করিডোরের এক প্রান্তে রাখা টুলে ইমন বসেছিল। মিতু ইমনের কাছে গেল। শান্ত স্বরে বলল, এইভাবে চুপচাপ বসে থাকবি না। চিৎকার করে কাদ। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদ। কে কি মনে করবে। এইসব ভাবার কোন দরকার নেই।
