সুরাইয়া ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলবেন, জানি না কোথেকে।
মানুষটা বলবে, তুমি এরকম কেঁপে কেঁপে উঠছি কেন? জ্বর না-কি?
বলেই হাত বাড়িয়ে কপাল ছুঁয়ে আঁৎকে উঠে বলবে–তোমারতো গায়ে অনেক জ্বর। শাড়িও ভিজিয়ে ফেলেছি।
সুরাইয়া বলবে, এই শাড়িটা দেখে তুমি কি কিছু বলতে পারবে? কোন স্মৃতি কি তোমার মনে পড়ে?
কিছু মনে পড়ছে নাতো।
মনে করার চেষ্টা কর। আচ্ছা, আমি তোমাকে সাহায্য করি তারিখটা হচ্ছে ১৫ই আগস্ট। তোমার জন্যদিন।
কিছুই মনে পড়ছে না।
আরো একটু চিন্তা কর। তোমার জন্মদিনে আমি তোমাকে একটা উপহার দিলাম। তুমি প্যাকেট খুলে দেখলে এই শাড়িটা। তুমি বিস্মিত হয়ে বললে— এটা আমার উপহার? শাড়ি? আমি বললাম, হুঁ। তুমি অবাক হয়ে তাকালে। তখন আমি বললাম, শাড়িটা তোমাকে দিলেও পরব। আমি। এবং এই শাড়ি পরে সুন্দর হয়ে তোমার সামনে উপস্থিত হব। কাজেই উপহারটা তোমার জন্যই হল, তাই না? তুমি চেয়ে বললে, হ্যাঁ। অবশ্যই আমার জন্যে।
এই শাড়ি আমি বৎসরে শুধু একবারই পরিা। তোমার জন্মদিনে। পনেরোই আগস্ট। আজ পনেরোই আগস্ট। মজার ব্যাপার কি জান, আজ যে তোমার জন্মদিন–তোমার ছেলেমেয়েরা তা জানে না। আজকের মত দিনে তাদের কারণে আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছি। এসে অবশ্যি ভালই হয়েছে। তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
সুপ্ৰভা কাঁদছে। ইমন গম্ভীর মুখে বসে আছে। বোনকে সান্তুনা দিয়ে কোন কথা বলছে না। কিছুক্ষণ আগে মিতু এসেছিল। সে কিছুক্ষণ বসে উঠে চলে গেছে। সুপ্ৰভা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ভাইয়া, মা এখন কোথায়?
ইমন বলল, আমি কি করে বলব কোথায়?
তোমার দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে না?
হচ্ছে।
খুঁজতে যাবে না।
কোথায় খুজব?
সুপ্ৰভা চোখ মুছছে। ইমান বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ মুখ কঠিন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব রেগে আছে।
ভাইয়া বাইরে খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে।
বর্ষাকালে ঝড়-বৃষ্টিতো হবেই।
তোমার একটুও দুঃশ্চিন্তা লাগছে না?
সুপ্ৰভা শোন, মায়ের পাগলামী যত দিন যাচ্ছে তত বাড়ছে। কেউ মাকে কিছু বলছে না। মাকে বলা উচিত না? সেই বলাটাই বলেছি। মা আজ একটা ধাক্কার মত খাবে। এতে তার লাভ হবে।
ক্ষতিওতো হতে পারে।
হ্যাঁ, ক্ষতিও হতে পারে। এই রিস্ক আমাদের নিতেই হবে। মা বাস করছে কল্পনার জগতে। মার জগতের সঙ্গে বাস্তবের জগতের কোন মিল নেই। বাস্তব পৃথিবীটা কেমন তাঁর দেখা উচিত।
তুমি টিচারদের মত করে কথা বলবে নাতো ভাইয়া। আমার ভাল লাগছে না। তুমি এ রকম শান্ত ভঙ্গিতে কি ভাবে বসে আছ আমি সেটাই বুঝতে পারছি না। তুমি সত্যি মাকে খুঁজতে যাবে না?
না।
আমি বড় মামাকে নিয়ে মার খোজে যাব।
বড় মামা সকালবেলা চিটাগাং গিয়েছে। আজ রাতে ফিরবেন না।
সুপ্ৰভা শোন, তুই আমার সামনে বসে কাঁদবি না দেখতে খারাপ লাগছে।
সুপ্ৰভা উঠে চলে গেল। যে ভঙ্গিতে গেল তাতে মনে হল এক্ষুণি সে একাই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবে। সে গেল দোতলার বারান্দায়। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। তার চোখে মুখে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির পানিতে এবং চোখের জলে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
অনেকক্ষণ ধরে টেলিফোন বাজছে। মিতু উঠে গিয়ে রিসিভার হাতে নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে টেলিফোন রেখে দিল। কিছুক্ষণ পর আবার টেলিফোন। মিতু রিসিভার হাতে নিয়েই বলল, কে নবনী?
ওপাশে কিছুক্ষণের জন্যে নীরবতা। তারপরই নবনীর বিস্মিত গলা—আপনি মিতু আপা তাই না? কি করে বুঝলেন আমি টেলিফোন করেছি?
আমার ই এস পি পাওয়ার আছে। আমি আগে ভাগে অনেক কিছু বুঝতে পারি।
যান। আপনি ঠাট্টা করছেন।
মোটেই ঠাট্টা করছি না। মাঝে মাঝে আমি পারি—প্রমাণ দেব?
দিনতো।
এই মুহুর্তে তুমি একটা সাদা ড্রেস পরে আছ—শাড়ি পরেছ, না সালোয়ার কামিজ পরেছ তা বলতে পারছি না—তবে পোশাকের রঙ শাদা।
হয়েছে?
হয়নি।
ও আচ্ছা। আমি সব সময় বলতে পারি না। মাঝে মাঝে পারি।
বলুনতো আমি কানে কি রঙের পাথরের দুল পরেছি।
বলতে পারছি না।
সবুজ পাথরের দুল। পান্নার ইমিটেশন। আমার বড় চাচা অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। ইমিগ্রন্ট। উনি দেশে বেড়াতে এসেছেন। কারো জন্যে কিছু আনেন নি। শুধু আমার জন্যে সবুজ পাথরের দুল। এনেছেন। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম রিয়েল, পরে জানলাম ইমিটেশন।
তোমার একটু মন খারাপ হল?
জ্বি। তবে মন খারাপ ভাব বেশীক্ষণ থাকে নি। দুল জোড়া যে কি সুন্দর। দেখলেই আপনার মাথা ঘুরে যাবে।
আচ্ছা একদিন দেখব।
আপা শুনুন— আপনি কি করে বললেন যে আমি শাদা কাপড় পরে আছি।
আমিতো বলতে পারিনি।
না, পেরেছেন। আমি আসলে মিথ্যা করে বলেছি পারেন নি। আমি শাদা সালোয়ার কামিজ পরেছি। এই সেটটা আমার মা আমাকে কিনে দিয়েছেন। গতবার আমরা দিল্লী গেলাম।— দিল্লী থেকে কেনা। দিল্লীতে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট আছে। পালিকা বাজার। মা পছন্দ করে কিনেছেন— আমার দুচক্ষের বিষ। শাদা রঙ হচ্ছে বিধবার রঙ, তাই না। আপা। আমার ফেভারিট কালার কি জানেন— আমার ফেভারিট কালার হচ্ছে রেড। আমি একটা বই এ পড়েছি লাল রঙ যাদের প্রিয় তারা মানুষ হিসেবে খুব ভাল হয়। আপা শুনুন, আমার এখন টেলিফোন রেখে দিতে হবে। আপনি কি আমার জন্যে ছোট্ট একটা কাজ করে দিতে পারবেন?
হ্যাঁ পারব। ইমনকে কিছু বলতে হবে?
জ্বি। আগামী পরশু উনার আমাকে পড়াতে আসার কথা—ঐদিন আমার ছোট খালার ছেলের বার্থডে। আমাকে বার্থডেতে যেতে হবে।
