এইসব মন খারাপের কোন দাম নেই। মাসে দুই মাসে একবার আসবে। সাথে থাকবে সস্তার কিছু খেলনা। খানিকক্ষণ কচলা-কচলি করে চলে যাবে। এইসব আদরের মানে কি?
ভাবী আপনি আমার উপর কেন রাগ করছেন বুঝতে পারছি না।
আমি রাগ করছি নাতো। তোমার উপর রাগ করব কেন?
ফিরোজ হতাশ গলায় বলল, ভাবী, আজ রাতটা আমি এই বাড়িতে থেকে যাব। ওর খুব জ্বর। ইমনের সঙ্গে ঘুমিয়ে থাকি। ওর পাশে কারোর থাকা দরকার।
সুরাইয়া স্বপ্ন তথ্যের বই খুলতে খুলতে শুকনো গলায় বললেন, বাড়তি আদর দেখানোর কোন দরকার নেই। ওদের কপালে অনাদর লেখা–আমি চাই ওরা যেন অনাদরেই মানুষ হয়।
আপনি কি ইমনকে দেখেছেন?
না।
আপনার কি উচিত না, ওর পাশে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও বসা।
শোন ফিরোজ, আমার কি উচিত বা অনুচিত এই উপদেশ তুমি আমাকে দিতে এসো না। আমি কাউকে উপদেশ দেই না। আমিও চাই না কেউ আমাকে উপদেশ দিক। এক কাজ কর আজ তুমি চলে যাও। অন্য একদিন এসো। আজ তুমি উত্তেজিত। আমি নিজে সারাক্ষণ উত্তেজনার মধ্যে থাকি— অন্যের উত্তেজনা আমার ভাল লাগে না।
চলে যেতে বলছেন?
হ্যাঁ, চলে যেতে বলছি।
জামিল ভাইয়ের সঙ্গে একটু কথা বলে যাই।
অবশ্যই তুমি তার সঙ্গে কথা বলবে না।
সুরাইয়া স্বপ্নের বই খুলে বসলেন। সাপ দেখলে, শত্রু বৃদ্ধি পায়, সাপ কামড়াতে দেখলে, অসুখ হয়। সাপ মারতে দেখা শুভ–শত্রু বিনাস হয়। সাপ ও সাপিনিকে শঙ্খ লাগা অবস্থায় দেখলে— ধন প্রাপ্তি কিংবা পুত্ৰ সন্তান প্রাপ্তি।
ইমনের জ্বর কমেছে। দুপুরে একশ দুই ছিল, এখন একশ। ঘুমের ওষুধ দেয়ার কারণে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে। সারাদিনে কিছু খায়নি। কিছুক্ষণ আগে এক বাটি সুপ খেয়েছে। তার মাথার কাছে সুপ্ৰভা বসে আছে। সুপ্ৰভা তাকে গল্পের বই পড়ে শুনাচ্ছে। ইমনের গল্প শুনতে মোটেও ভাল লাগছে না। বেচারী এত আগ্রহ নিয়ে পড়ছে বলে ইমন কিছু বলছে না। সুপ্ৰভা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে পড়ছে। ইমনের মনে হল— তার বোনটা ঐতো কিছুদিন আগেই হামাগুড়ি দিত— আজি এত বড় হয়ে গেছে। ভাইকে বই পড়ে শুনাচ্ছে— কি আশ্চর্য। সুপ্ৰভা রিনারিনে গলায় পড়ছে— লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ু চোখের সামনে থেকে বইটা সরিয়ে ফেলুদার দিকে ফিরে বললেন, রামমোহন রায়ের নাতি ছিল সেটা জানতেন? ফেলুদার মুখের উপর রুমাল চাপা, তাই সে শুধু মাথা নাড়িয়ে না জানিয়ে দিল।
সুরাইয়া আয়নার সামনে বসে আছে
সুরাইয়া আয়নার সামনে বসে আছে। তার চোখে মুখে হতভম্ব ভাব। আয়নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সিঁথির কাছের কিছু চুল তামাটে হয়ে আছে। কি ভয়ংকর কথা! চুল পেকে যাচ্ছে? না-কি হলুদ-টলুদ জাতীয় কোন রঙ লেগেছে? হলুদ রঙ লাগবে কিভাবে? কত বছর হল সে রান্না ঘরে যায় না। সুরাইয়া তীক্ষ্ণ গলায় ডাকলেন— সুপ্ৰভা!
সুপ্ৰভা দরজা ধরে দাঁড়াল। সে আজ শখ করে তার মার শাড়ি পরেছে। নীল শাড়িতে সাদা সাদা বুটি। শাড়িটা যে এত সুন্দর আগে বোঝা যায় নি। পরার পর বোঝা যাচ্ছে। শাড়ি পরার জন্যে তাকে এত বড় লাগছে যে মনেই হচ্ছে না তার বয়স মাত্র তের। মনে হচ্ছে তরুনী এক মেয়ে যে সুযোগ পেলেই সবার চোখ এড়িয়ে তার ছেলে বন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে গল্প করে। সুপ্ৰভা এমিতেই দেখতে সুন্দর-শাড়ি পরায় আজ তাকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে। একটু আগে মিতু তাকে দেখে বলেছে—সুপ্ৰভা, খবৰ্দার শাড়ি পরবি না। হিংসায় আমার শরীর জুলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখবি সারা গায়ে ফোসিকা উঠে যাবে।
সুরাইয়া মেয়েকে দেখে বলল, সুপ্ৰভা দেখতো আমার মাথার চুল পেকে যাচ্ছে নাকি?
সুপ্ৰভা বলল, হুঁ।
ই আবার কি ধরণের কথা। হয় বল হ্যাঁ, নয় বল না। চুল পেকেছে?
সুপ্ৰভা ক্ষীণ গলায় বলল, হ্যাঁ।
সুরাইয়া তীব্র গলায় বলল, চুল পাকবে কেন? এখনই কেন চুল পাকবে?
সুপ্ৰভা এই প্রশ্নের কি জবাব দেবে বুঝতে পারছে না। চুল পেকে গেলে সে কি করবে? সেতো আর একশ বছরের পুরানো ঘি মায়ের মাথায় মাখিয়ে তাঁর চুল পাকায় নি। এমিতেই সে মায়ের ভয়ে অস্থির হয়ে থাকে–আজ সকাল থেকে ভয় বেশী লাগছে। কারণ বান্ধবীর জন্মদিনে যাবার কথা যখন বলা হয়েছে মা বিশ্ৰী করে তাকিয়েছেন, কিছু বলেন নি। অথচ আগে ভাগে কথা ঠিক হয়ে আছে সবাই দল বেধে শাড়ি পরে যাবে। রাতে ঐ বাড়িতে থাকবে। সারা রাত গল্প করবে। তাদের বাড়িতে লেজার ডিস্ক প্লেয়ার আছে। সেই লেজার ডিস্কে ছবি দেখা হবে। যে ছবি দেখা হবে সেই ছবিও এনে রাখা হয়েছে, Sound of Music.
শাড়ি পরেছিস কেন?
সুপ্ৰভা খুবই অবাক হল। সে মাকে জানিয়েই শাড়ি পরেছে। আলমিরা থেকে মা নিজেই শাড়ি বের করে দিয়েছেন। এখন হঠাৎ এই কথা কেন?
শাড়ি পরার এইসব ঢং কোথেকে শিখলি? তুই কোথায় আছিস তুই জানিস না। পরের বাড়িতে দাসীর মত পড়ে আছিস-রঙ করতে লজ্জা লাগে না–বেহায়া মেয়ে?
সুরাইয়া দম নেবার জন্যে থামলেন। সুপ্ৰভা ভাবল এই ফাঁকে সে সরে যাবে। তবে এই কাজটা করাও ঠিক হবে না। সবচে ভাল হয় সে যদি মাকে রাগ ঝাড়ার পুরো সুযোগটা দেয়।
ঢং এর মেয়ে। ঢংতো ষোল আনার উপর দুআনা আঠারো আনা শিখেছিস ; যা শেখার তাতো শিখছিস না। অংকে পেয়েছিস এগারো। এমন কোন মেয়ে আছে যে অংকে এগারো পায়? বল, আছে কোন মেয়ে? দে, কথার জবাব দে। চুপ করে থাকলে টেনে জিভ ছিড়ে ফেলব?
সুপ্ৰভা মনে মনে মায়ের কথার জবাব দিল। এই কাজটা সে ভাল পারে। মা যখন প্রশ্ন করতে থাকেন তখন সে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে ঠিকই। তবে মনে মনে প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দেয়। যে কোন প্রশ্নই মা তিনবার চারবার করে করেন। মার একই প্রশ্নের জবাব সুপ্ৰভা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেয়। তার বেশ মজা লাগে।
