কুসুমের যে শরীরটা আজ অপার্থিব সুন্দর মনে হইতেছিল তার সমস্তটা শশী জড়াইয়া ধরিতে পারিল না, হঠাৎ করিল কি, খপ করিয়া কুসুমের একটা হাত ধরিয়া ফেলিল। কুসুম একটু অবাক হইয়া গেল। দুজনের মধ্যে ব্যবধান ছিল, তাতে টান পড়ার জন্যই বোধহয় কুসুম একটু সরিয়াও আসিল, কিন্তু যা কথা বলিল তা অপূর্ব, অচিন্তিত।
কতবার নিজে যেচে এসেছি, আজকে ডেকে এনে হাত ধরা-টরা কি উচিত ছোটোবাবু? রেগে-টেগে উঠতে পারি তো আমি? বড় বেয়াড়া রাগ আমার।
শুনিয়া শশীর আধো-পাংশু মুখখানা প্রথমে একেবারে শুকাইয়া গেল। কে জানিত কুসুমকে এত ভয়ও শশী করে? তবু কুসুমের হাতখানা সে ছাড়িল না। বলিল, রেগো, কথা শুনে রেগো। আমার সঙ্গে চলে যাবে বউ?
চলে যাব? কোথায়?
যেখানে হোক। যেখানে হোক চলে যাই চলো আজ রাত্রে।
কুসুম সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, না।
শশী ব্যাকুলভাবে কহিল, কেন? যাবে না কেন?
কুসুম শুধু বলিল, কেন যাব?
শশী বোকার মতো, শিশুর মতো বলিল, কেন যাবে? কেন যাবে মানে কী কুসুম?
আজ নাম ধরে কুসুম বললেন!—বলিয়া ছোট বালিকার মতো মাথা দুলাইয়া জ্বলজ্বলে চোখে শশীর অভিভূত ভাব লক্ষ করিতে করিতে কুসুম বলিল, কী করে যে শুধোলেন কেন যাব। আপনি বুঝি ভেবেছিলেন যেদিন আপনার সুবিধে হবে ডাকবেন, আমি অমনি সুড়সুড় করে আপনার সঙ্গে চলে যাব? কেউ তা যায়?
শশী অধীরভাবে বলিল, একদিন কিন্তু যেতে।
কুসুম স্বীকার করিয়া বলিল, তা যেতাম ছোটোবাবু, স্পষ্ট করে ডাকা দূরে থাক, ইশারা করে ডাকলে ছুটে যেতাম। চিরদিন কি এরকম যায়? মানুষ কি লোহার গড়া যে চিরকাল সে একরকম থাকবে, বদলাবে না? বলতে বসেছি যখন কড়া করেই বলি, আজ হাত ধরে টানলেও আমি যাব না।
তার হাত ছাড়িয়া দিয়া শশী বলিল, তোমার রাগ যে এমন ভয়ানক তা জানতাম না বউ। অনেক বড় বড় কথা তো বললে, একটা ছোট কথা কেন তুমি বুঝতে পারো না? নিজের মন কি মানুষ সবসময় বুঝতে পারে বউ? অনেকদিন অবহেলা করে কষ্ট দিয়েছি বলে আজ রাগ করে তার শোধ নিতে চলেছ, এমন তো হতে পারে আমি না-বুঝে। তোমায় কষ্ট দিয়েছি, তোমার পরে কতটা মায়া পড়েছে জানতে পারিনি? তুমি চলে যাবে শুনে এতদিনে আমার খেয়াল হয়েছে? তা ছাড়া তোমার কথাই ধরি, তুমি বললে মানুষ বদলায়-বেশ, আমি অ্যাদিন তোমার সঙ্গে খেলাই করেছি, আজ তো আমি বদলে যেতে পারি বউ?
কী ব্যাকুল, উৎসুক আবেদনের মতো শোচনীয় শশীর কথাগুলি। কে জানিত কুসুমকে তাহার এমন করিয়া একদিন বলিতে হইবে। শুনিতে বিস্ময়ের সীমা থাকে না কুসুমের শরীরটা যে ভালো নাই তার মুখ দেখিয়াই তা বোঝা যায়, হয়তো কুসুম মনে করে যে তার এই সকাতর দুর্বলতা সেইজন্যই। সে মৃদুস্বরে বলিল, এ কী বলছেন ছোটোবাবু? আমার জন্য আপনার মন কাঁদবে?
শশী সরলভাবে বলিল, ভয়ানক মন কাঁদবে বউ, জীবনে আমি কখনও তা হলে সুখী হতে পারব না।
কুসুম ব্যাকুলভাবে বলিল, তা কি কখনও হয়? আপনার কাছে আমি কত তুচ্ছ, আমার জন্য জীবনে কখনও সুখী হতে পারবেন না। দুদিন পরে মনেও পড়বে না আমাকে।
শশী বলিল, এতকাল ধরে জড়িয়ে বেঁধেছ আর দুদিনে তোমাকে ভুলে যাব, তাই ভেবে নিলে তুমি?
শেষপর্যন্ত কুসুম বলিল, আমার সাধ্যি কী ছোটোবাবু আপনাকে জড়িয়ে জড়িয়ে বাঁধব?
শশী ক্ষুব্ধ হইয়া বলিল, আজ ওসব বিনয় রাখো বে। আজেবাজে বকার ধৈর্য আমার নেই। আমার কী হবে না হবে সেকথাও না। স্পষ্ট করে আমায় শুধু তুমি বুঝিয়ে দাও চিরকাল আমার জন্যে ঘর ছাড়তে তুমি পাগল ছিলে, আজকে হঠাৎ বিরূপ হলে কেন?
এসব কথায় কলহ হয় ছোটোবাবু। যাবার আগে কলহ কি ভালো?
কলহ হবে না, বলো।
কুসুম স্নানমুখে বলিল, আপনাকে কী বলব ছোটোবাবু, আপনি এত বোঝেন! লাল টকটকে করে তাতানো লোহা ফেলে রাখলে তাও আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে যায়, যায় না? সাধ-আহ্লাদ আমার কিছু নেই, নিজের জন্যে কোনো সুখ চাই না। বাকি জীবনটা ভাত রেঁধে ঘরের লোকের সেবা করে কাটিয়ে দেব ভেবেছি—আর কোনো আশা নেই, ইচ্ছে নেই। সব ভোঁতা হয়ে গেছে ছোটোবাবু। লোকের মুখে মন ভেঙে যাবার কথা শুনতাম, অ্যাদ্দিনে বুঝতে পেরেছে সেটা কী। কাকে ডাকছেন ছোটোবাবু, কে যাবে আপনার সঙ্গে? কুসুম কি বেঁচে আছে? সে মরে গেছে।
কুসুম মরিয়া গিয়াছে। সেই চপল রহস্যময়ী, আধো-বালিকা আধো-রমণী, জীবনীশক্তিতে ভরপুর, অদম্য অধ্যবসায়ী কুসুম। শশী যে কেন আর কোনো কথা বলিল না তার কারণটা দুর্বোধ্য। বোধ হয় ভাবিবার অবসর পাইবার জন্য। কুসুম তো আজ ও কাল এখানে আছে। বলিবার কিছু আছে কি না সেটাই আগে ভাবিয়া দেখা দরকার।
মিনিটখানেক চুপচাপ দাঁড়াইয়া থাকিবার পর বাড়ির দিকে চলিতে আরম্ভ করিবার সময় কুসুম শুধু বলিল, আপনি দেবতার মতো ছোটোবাবু।
বাড়ি ফিরিয়া শশী বুঝিতে পারে কল্পনার এমন কতকগুলি স্তর আছে, বিশেষ কোনো উপলক্ষ ছাড়া যেখানে উঠিবার ক্ষমতা মানুষের নাই। এক-একটা ঘটনা যেন চাবির মতো মনের এক-একটা দুয়ার খুলিয়া দেয়, যে দুয়ার ছিল বলিয়াও মানুষ জানিত না। এত বড় বড় কল্পনা শশীর, এত বিরাট ও ব্যাপক সব মনোবাসনা, একদিনে সব যেন পৃথক অনাবশ্যক হইয়া গেল, শিশুর মনের বড় বড় ইচ্ছাগুলি যৌবনে যেমন পায়। রবার-বসানো চাকা-যুক্ত গদি-আটা ঠেলাগাড়িতে চাপার জন্য ছেলেবেলা কত কাঁদিয়াছিল শশী, কলিকাতায় মোটর হাঁকাইবার সাধ আজ তারি পর্যায়ে গিয়া পড়িয়াছে। গ্রাম ছাড়িয়া কোথায় যাইবে শশী? কী আছে গ্রামের বাইরে শশীর যা মনোহরণ করিতে পারবে? একটা প্রকাণ্ড বড় পৃথিবী, অসংখ্য অচেনা মানুষ। কী পাইবে শশী সেখানে?
