জীবনের অজ্ঞাত রহস্য বিন্দুকে গ্রাস করিয়াছে বইকী।
পরদিন শশী খালের ঘাটে গেল—যে ঘাটে হারুর মৃতদেহের সঙ্গে এক নৌকায় সে একটি সন্ধ্যা অতিবাহিত করিয়াছিল। সকালবেলা।
নন্দলাল আসিতেছে—বাড়িতে শশী একথা প্রকাশ করে নাই। নন্দলাল কখনও তাহাদের বাড়ি যাইবে না। কিন্তু শশী অনেকদিন বিন্দুর কোনো খবর পায় নাই। নন্দলালের কাছে বিন্দুর খবরটা জানিবার জন্যই সে খালের ঘাটে আসিয়াছে। গ্রামের মধ্যে একান্ত পর উদ্ধত ভগিনীপতিটির সঙ্গে আলাপ করা অসম্ভব।
শশীর মনে আর একটা ইচ্ছা ছিল। সে এক অসম্ভব কল্পনা। বিন্দুর বিবাহের ব্যাপারটা শশী জানে। কিন্তু সে তো আজকের কথা নয়, প্রায় ইতিহাসে দাঁড়াইয়া গিয়াছে। এতকাল নন্দলাল রাগ করিয়া ছিল, ভালো কথা, তাহার দোষ নাই। কিন্তু চিরজীবন অতীত ঘটনার জবাব কাটিয়া চলিয়া লাভ কী? নন্দলাল তো আজ অনায়াসে গোপালকে ক্ষমা করিয়া ফেলিতে পারে। মনে করিতে পারে যে জোর-জবরদস্তি নয়, সে নিজেই দেখিয়া পছন্দ করিয়া বিন্দুকে বিবাহ করিয়াছিল! গোপালের অপরাধে রাগ করিয়া আছে নন্দলাল আর মাঝে পড়িয়া শাস্তি পাইতেছে বিন্দু, এটা উচিত নয়।
বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক তুলিয়া দেওয়াটা বিন্দুর শাস্তি, শশী এইরকম মনে করে। নন্দলালকে সে আজ তাহদের বাড়ি গিয়া উঠিতে অনুরোধ করিবে। আভাসে ইঙ্গিতে বুঝাইয়া দিবে গোপাল আজ সাত বছর অনুতপ্ত হইয়া আছে, আর কেন ভাই, এবার মিটাইয়া ফেল।
তারপর নন্দলাল আসিল! সে আরও বুড়া হইয়াছে, আরও বাবু হইয়াছে। অবস্থার অনুপাতে হিসাব করিলে সঙ্গের চাকরটি কিন্তু তাহার চেয়েও বাবু। এইটুকু খাল বাহিয়া আসিতে দুজনের জন্য নন্দলাল নৌকা ভাড়া করিয়াছে দশজনের। হয়তো তাহার ডুবিয়া মরার ভয়,–কলকাতার বাবু!
খবর না-দেওয়ার জন্য শশী কোনো অনুযোগ করিল না। বলিল, কলকাতা থেকে বেরিয়েছ কবে?
বিন্দু শশীর এক বছরের ছোট। সেই হিসাবে নন্দলালের সে গুরুজন।
পরশু।
বিন্দু ভালো আছে?
ভালো থাকবে না কেন?
কী জবাব! নন্দলালকে সামনে দেখিয়া, তাহার কথা শুনিয়া, শশীর কল্পনা নিভিয়া আসিতেছে। রাগ, প্রতিহিংসা এইসব যে মানুষের অবলম্বন, সহজে ওসব সে ছাড়িতে চায় না। ছাড়িয়া বাঁচিবে কী লইয়া?
খবর পেলাম, আজ সকালে তুমি পৌছবে। বাবা বললেন, ঘাটে যা শশী, বাবুদের গাড়িটা নিয়ে যা, সঙ্গে করে নিয়ে আসবি। নিজেও আসতেন, আমি বারণ করলাম। বাতে কষ্ট পাচ্ছেন, কতক্ষণ ঘাটে অপেক্ষা করতে হবে তারও কিছু ঠিক নেই। তুমি আসছ শুনে বাড়িতে হৈচৈ পড়ে গেছে নন্দ।
নন্দলাল বলিল হুঁ, মোটরটা কার?
নন্দলাল বলিল শীতলবাবুর ভাই বিমলবাবুর। ওরাই জমিদার।
শীতলবাবু লোক কেমন?
প্রশ্ন শুনিয়া শশী একটু বিস্মিত হইল।
বেশ লোক। খুব ধর্মচর্চা করেন। এখানে দাঁড়িয়ে কী হবে? তোমার চাকরকে বলো, জিনিস গাড়িতে তুলুক। নৌকা ছেড়ে দাও, আমাদের নৌকায় ফিরে যাবে।
নন্দলাল মাথা নাড়িল,–আমি এ বেলাই ফিরব শশী। আর কাজ শেষ করে তোমাদের বাড়ি যাওয়ার সুবিধে হবে কি না-মানে, হয়তো সময় পাব না। না, হয়তো কেন, সময় পাব না।
শশী এ অপমানও হজম করিল।
আজ তোমাকে ফিরতে দিচ্ছে কে? সবাই আশা করে আছে নন্দ।
আমাকে ফিরতেই হবে। বাজিতপুরে কাজ ফেলে এসেছি। শীতলবাবুর সঙ্গে দেখা করেই আবার নৌকা খুলব।
শীতলবাবুর কাছে তাহার কী প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করিতে নন্দলাল একটা ভাসাভাসা জবাব দিল যে বাজিতপুরে শীতলবাবুর কিছু জমি কিনিবে। কথা কহিতেও নন্দলালের যেন কষ্ট হইতেছিল। কেন, কী বৃত্তান্ত শশী তাহ কিছুই জিজ্ঞাসা করিল না। নিজেকে তাহার গোমস্তা মনে হইতেছিল নন্দলালের।
বেশ, কাজ থাকলে তোমায় আটকাব না। এ বেলাটা থেকে খাওয়াদাওয়া করে বিকেলে রওনা দিও। বলিয়া শশী যোগ দিল, বাবা নিজে আসতেন নন্দ। আমি বারণ করলাম।
কিন্তু নন্দর সুবিধা হইবে না। সময় নাই।
তখন শশী বলিল, ও আচ্ছা।
তাহার রাগ হইতেছিল, মনে জ্বালা ধরিয়া গিয়াছিল। টিনের চালাটার একধারে চন্ডী ছোকরা কেরোসিন কাঠের উপর রেকাবি-ভরা পান সাজাইয়া রাখিয়াছে, আর কয়েক প্যাকেট লাল-নীল-কাগজে-মোড়া বিড়ি। চণ্ডী নিজে কাছে গিয়া হা করিয়া বাবুদের গাড়িটি দেখিতেছে। গাওদিয়ায় মোটরগাড়ি নন্দ থাকিয়া থাকিয়া গাড়িটার দিকে চাহিতেছিল। কিন্তু শশীর সঙ্গে এইমাত্র সে সম্পর্ক চুকাইয়া দিয়াছে, গাড়িটা আনিয়াছে শশী। নন্দলাল তাই বলিল, শীতলবাবুর বাড়িটা কতদূর?
গাঁয়ের শেষে।
তবে তো কম দূর নয়! ঘোড়ার গাড়ি-ট্যাক্সি পাওয়া যায়? চাকরটাকে পাঠিয়ে দিই, ডেকে আনুক।
ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যায়। এই গাড়ি বাবুদের বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, তুমি ইচ্ছে করলে যেতে পারো। রসিকবাবুর বাগানের একটা গাছের দিকে শশী দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়াছিল, এবার সে আবার চণ্ডীর দোকানের দিকে চাহিল।
নন্দ কী ভাবিল বলা যায় না, বলিল, সময় থাকলে তোমাদের বাড়ি যেতাম শশী।
সময় না থাকলে আর কথা কি?
সেইখানেই ইতি। নৌকায় গিয়া সুটকেস হইতে আয়না-চিরুনি বাহির করিয়া নন্দ চুলটা ঠিক করিয়া লইল। পানের কৌটা হইতে খানিকটা জর্দা মুখে দিল। গায়ের দামি আলোয়ানটা খুলিয়া রাখিয়া একটা তার চেয়ে দামি শাল গায়ে দিয়া মোটরে উঠিল।
এসো শশী। আমার একটু তাড়াতাড়ি আছে।
সেই যেন এতক্ষণে মোটরের মালিকানা-স্বত্ব পাইয়াছে। তা, সেটা আশ্চর্য নয়। মোটরে চড়ার অভ্যাস নন্দলালের আছে, শশী তো চাপে গোরুর গাড়ি।
