পেট ব্যথা করেছিল।
জিভ দেখি?
কুসুম সলজ্জভাবে জিভ দেখাইল।
জিভ তো পরিষ্কার।
জিভ পরিষ্কার হবে না কেন ছোটোবাবু?
না, জিভ অপরিস্কার থাকিবার কোনো কারণ নাই। কুসুমের স্বাস্থ্য বাহিরের ফাঁকি নয়, ভিতরেও সে খুব মজবুত। কুসুমকে শশীর এইজন্যই ভালো লাগে। দশ বছরে একবার এক রাত্রে শুধু পেটে ব্যাথায় কষ্ট পায়, আর কোনো রোগ বালাই নাই। এই তো চাই। সব বাঙালি ঘরের মেয়ের এরকম স্বাস্থ্য হইলে জাতটা আজ ডুবিতে বসিত না, শশী একথাও ভাবে।
জানালা দিয়া উৎসুক দৃষ্টিতে ঘরের ভিতর চহিয়া কুসুম বলিল, আপনার ঘরটা একটু দেখে যাব ছোটোবাবু?
চলো না, সিন্ধু ওদের কাউকে ডাকি, অ্যাঁ?
না। আমি একাই দেখে যাই।
কুসুম একাই শশীর ঘর দেখিল। শশী জানিত এটা উচিত নয়। কিন্তু বারণও সে করিল না। ভাবিল ওর যদি বদনামের ভয় না থাকে আমার বয়ে গেল। আমি তো ডাকিনি।
শশীর ঘর দেখিয়া কুসুম বলিয়াছিল, বেশ সাজানো ঘর। কিন্তু জাদুঘর মিউজিয়ামের মতো মানুষের শোবার ঘরে কী আর দেখিবার থাকে? বড়ো আলমারি দুটির পাঁচটি তাক। একটা আলমারিতে ঠাসিয়া বই ভরিয়াও কুলায় নাই, মাথার উপর উঁচু করিয়া সাজাইয়া রাখা হইয়াছে। অপরটির উপরে তাক তিনটিতেও ডাক্তারি বই সাজানো, নিচের তাকে চকচকে ডাক্তারি যন্ত্রপাতি। কোনটা কী কাজে লাগে? কুসুম জিজ্ঞাসা করিল। কুসুমের যেন তাড়াতাড়ি নেই, যতক্ষণ খুশি শশীর ঘরে থকিতে পারে। দেয়ালে কয়েকটা ছবি আর ফটো টাঙানো আছে, কুসুম অন্যমনস্কের মতো সেগুলি দেখিল। ফটোগুলি অধিকাংশই শশীর বাড়ির স্ত্রী-পুরুষের, কোনো মন্তব্য নিম্প্রয়োজন। কুমুদের ফটোটা দেখিয়া কুসুম বলিল, সেই লোকটা না? গতবৎসর শশী দেয়ালে একগোছা ধানের শিষ টাঙ্গাইয়া দিয়াছিল। দেখিয়া কুসুম ভারি খুশি। কাঠের বাক্সে কী আছে? ওষুধ? দেখি। ওই ছোট আলমারিতে ওষুধ রাখিয়াছে, আবার বাক্সে কেন?
এ ঘরে আপনি একা শোন ছোটোবাবু?
একাই শুই।
তা, বউ আসতে আর দেরি কত! শিগগির বাপের বাড়ি চলে যাব ছোটোবাবু। আর আসব না।
আসবে না? সে কী! শশী অবাক হইয়া গেল।
কুসুম একটু ভাবিল আসব, অনেক দেরি করে আসব। হয়তো ও-বছর নয়তো পরের বছর, ঠিক কিছু নেই। আচ্ছা, যাই ছোটোবাবু।
শশী বলিল, কী করে যাবে? বাবা ওদিকে দাওয়ায় এসে বসেছেন। ঘুমিয়ে উঠলেন।
তবে? কুসুম জিজ্ঞাসা করিল। সে যে বিশেষ ভয় পাইয়াছে মনে হয় না। বিপদে কুসুম শান্তই থাকে। বিচলিত হয় না, দিশেহারা হয় না।
শশী বলিল, একটু বোসো। বাবা এখুনি বাইরের ঘরে চলে যাবেন।
তবে দরজা বন্ধ করে দিন। দেখিতে পান যদি?
কে জনিত নিয়তি আজ গোপাল ঘুম ভাঙিয়া ওদিকের দাওয়ায় বসিবে, আজ সাত বছর পরে।
পূজার পর গাওদিয়ার স্বাস্থ্য ক্রমে ক্রমে ভালো হয়। ম্যালেরিয়া কমিয়া আসে, কলেরা বন্ধ হয়, লোকের ক্ষুধা বাড়ে, মাছ দুধ সস্তা হয়। নিমুনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জায় কেবল দুই-দশজন যা মারা যায়—সে কিছু নয়। অগ্রহায়ণ-পোষ মাসে খালের জল অনেক কমিয়া আসে। মাঘের শেষাশেষি ডোবা শুকাইয়া যায়। চৈত্র মাসে অনেক পুকুরে দু-এক হাত জল থাকে মাত্র। বৈশাখে বৃষ্টি না হইলে অধিকাংশ পুকুর শুকাইয়া ওঠে। তখন গ্রামে বড় জলের কষ্ট। শীতলবাবুর বাড়ির সামনের বড় দিঘিটার জল খাইয়া গাওদিয়া, সাতগাঁ আর উখারার লোক প্রাণধারণ করে। বাবুর দিঘিতে বাবুদের বাড়ির লোক ছাড়া কাহারো দেহ ভুবানো নিষেধ। দারোয়ান লাঠি ঘাড়ে পুকুর পাহারা দেয়, শীতলবাবুর ছেলেরা ভাগনেরা আর কম বয়সি মেয়েরা দিঘি তোলপাড় করিয়া স্নান আরম্ভ করিলে লাঠিতে ভর দিয়া সে একগাল হাসে। ঘাট ছাড়া গ্রামের লোকের অন্য কোথাও কলসি ডুবানো বারণ। শীতলবাবুর বাড়ির ছেলেমেয়েরা স্নান করিয়া গেলে দু-তিন ঘণ্টা ঘাটের কাছে জল কাদা হইয়া থাকে।
জল হইতে আসিয়া কেহ বলে ; খোকাবাবুদের একটু সাবধানে স্নান করতে বলতে পারো না দারোয়ানজি?
দারোয়ান বলে ; দিঘি কিসকো? তুমারা?
তা বটে, দিঘিটা বাবুদের বটে।
কিন্তু বৈশাখ মাস আসিতে এখনো দেরি আছে, বৈশাখ মাসে এ বছর খুব ঝড়বৃষ্টি হইতে কিনা এখন হইতে তাই বা কে বলিতে পারে। শীতকালটা গ্রামের লোক সুখে কাটায়। কই, মাগুর, শোলমাছ প্রচুর পাওয়া যায়। যাদের ডোবা আছে, ডোবা শুকাইয়া আসিলে জল ছেঁচিয়া ঝুড়িখানেক মাছ পায়। তার মধ্যে খলসে আর ল্যাঠা মাছই বেশি।
এই খাল আর খালের চিকরি-কাটা দেশে ভালো রাস্তা নাই কিন্তু শীতকালটা দেশে কাটাইবেন সংকল্প করিয়া বিমলবাবু সপরিবারে একটা মোটরগাড়ি সঙ্গে করিয়া গ্রামে আসিলেন।
বাজিতপুরে মোটরগাড়ি আছে। কিন্তু গাওদিয়ায় মোটরগাড়ি!
কুসুম শশীকে বলে, সেবার কলকাতায় মোটরগাড়ি চড়েছি। বিয়ের আগে যেবার কলকাতায় গিয়েছিলাম বাবার সঙ্গে।
শশী বলে, তোমার সে কথা মনে আছে?
কুসুম অবাক হইয়া বলে, বাহু, মনে থাকবে না? কতদিন আর হল? আট বছর কি ন বছর। আমার বয়স কত ভাবেন? পচিশ?
দূর! বাইশ বছর।
সুদেবের সঙ্গে মতির বিবাহের প্রস্তাব ভাঙিয়া গিয়াছে। কুসুম ইদানীং আর ও-কথা উত্থাপনও করিত না। মতির বিবাহ হোক বা না হোক তাহার যেন কিছুই আসিয়া যায় না। পরাণ যদি বা রাত্রে কোনোদিন কথাটা তুলিত, কুসুম হাই তুলিয়া বলিত, তাহার কোনো মতামত নাই। কোনোদিন কিছু না বলিয়াই সে ঘুমাইয়া পড়িত। এদিকে নিতাই তাগাদা দিতেছিল। এত বেশি তাগাদা দিতেছিল যেন বিবাহটা সুদেবের নয়, তাহার নিজের। শশীর সঙ্গে আর একবার পরামর্শ করিয়া শেষে পরাণকে বলিতে হইয়াছে— না, সুদেবের সঙ্গে মতির সে বিবাহ দিবে না। নিতাই শান্তভাবে কথাটা গ্রহণ করিতে পারে নাই। লোভ দেখাইয়াছে, সদুপদেশ দিয়াছে, মেজাজ গরম করিয়াছে, কিন্তু না, পরাণ রাজি নয়।
