তবু সেই দুঃখই তার চাই, তাকে পরিহার করা যাবে না।
‘চল ফিরি।’
‘চলুন আর একটু। নির্জনতা গম্ভীর হয়ে আসছে।’
‘জলে ভিজে অশোকের কিছু হয় নি তো?’
হঠাৎ অশোকের কথা ওঠায় সুপ্রিয়া একটু বিস্মিত হয়ে হেরম্বের মুখের দিকে তাকাল।
’হু হু করে জ্বর এসেছে।’
‘তুই যে চলে এলি?’
‘ছোটলোক ভাবছেন, না? সেবা করার লোক না থাকলে আসতাম না। দাদা, বৌদি, ভাইঝি সবাই ঘিরে আছে, তারা আপনার জন্য। আমি তো পর!’
‘তোর কি হয়েছে বল তো?’
‘বুঝতে পারেন নি? আমার মন আগাগোড়া বদলে গেছে। আজকাল সর্বদা অন্যমনস্ক থাকি।’
হেরম্বের কাছে এটা সুপ্রিয়ার অনাবশ্যক আত্মনিন্দার মতো শোনাল। মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হতে পারলেও সর্বদা অন্যমনস্ক থাকা সুপ্রিয়ার পক্ষে অসম্ভব। তার এ কথা হেরম্ব বিশ্বাস করল না।
‘তুই ইচ্ছা করলেই অশোককে সুখী করতে পারতিস, সুপ্রিয়া।’
সুপ্রিয়া থমকে দাঁড়াল।
’যদি কথা তুললেন, তাহলে বলি। আমি তা পারতাম না। কেউ পারে না। ছেলেখেলা হলে পারতাম, চব্বিশ ঘণ্টা একসঙ্গে থাকা ছেলেখেলা নয়। ও বিনাদোষে মারা গেল, কিন্তু উপায় কি, সংসারে অমন অনেক যায়। ওর সত্যি কোনো উপায় নেই।’
দূরদিগন্তে চোখ রেখে হেরম্ব বলল, ‘তবু অশোককে নিয়ে তুই যদি জীবনে সুখী হতে পারতিস, তাহলে তোর প্রশংসা করতাম, সুপ্রিয়া।’
‘কথাটা ভেবে বললেন?’
‘ভেবে বললাম। মনকে তুই একেবারে উন্মুক্ত করে দিলি, কিছু ঢাকবার চেষ্টা করলি না। সত্যকে সহ্য করবার স্পর্ধা দেখিয়েছিস বলেই কথাটা বললাম। বিচলিত হলে চলবে কেন? ওর ভালোমন্দের দায়িত্ব তোরও অনেকখানি আছে বৈকি।’
সুপ্রিয়া রুক্ষস্বরে বলল, ‘আপনার কথার মানে হয় না। ওর ভালোমন্দর সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি? রূপাইকুড়াতেও আপনি আমাকে এসব বলে অপমান করতেন। আপনার ভুল হয়েছে, স্বামী আমার সমস্যা নয়, আপনিই তাকে শিখণ্ডীর মতো সামনে খাড়া করে রেখে আমার সঙ্গে লড়াই করেছেন।’
এবার হেরম্বের চুপ করে যাওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তর্কে হার মানা। হেরম্বের স্বভাব নয়।
‘লড়াই বাধাচ্ছিস তুই; আমি লড়াই করতে চাই নি, সুপ্রিয়া।’
এই কঠোর কথায় সুপ্রিয়া ক্ৰন্দনবিমুখ আহত শিশুর মতো মুখ করে বলল, ‘ইচ্ছে করে আমাকে অপমান করার জন্য এ কথা যদি বলতেন। ফিরে গিয়ে আমি বিষ খেতাম।’
হেরম্ব সংগ্রহে সায় দিয়ে বলল, ‘ফিরে গিয়ে আমরা দুজনেই তাই খাই চল, সুপ্রিয়া।’
সুপ্রিয়া অতি কষ্টে বলল, ‘তার চেয়ে এখানে একটু বাসা ভালো।’
জলের ধার থেকে খানিক সরে শুকনো বালিতে তারা নীরবে বসে থাকে। হেরম্ব বুঝতে পারে রূপাইকুড়ায় তাদের যে ছ’মাসের চুক্তি হয়েছিল সুপ্রিয়া এখনো তা অখণ্ডনীয় ধরে রেখেছে। এখন যে তাদের অন্তরঙ্গতা বেড়েছে তাতে সন্দেহ নেই। অশোকের সম্বন্ধে যে আলোচনা তাদের হয়ে গেল, পরস্পরের কাছে দাম কমে যাবার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা থাকলে এ আলোচনা তাদের এত স্পষ্ট হয়ে উঠত না। উঠলেও এত সহজে সমাপ্তি লাভ না করে তাদের এমন কলহ হয়ে যেত যে, আগামীকাল পর্যন্ত পরস্পরকে তারা ঘৃণা করত। যাদের মধ্যে মনের চেনা নেই, শুদ্ধ শান্ত অপাপবিদ্ধ আত্মাকে পর্যন্ত এ অবস্থায় তারা ক্লেশ দেয়; বলে–এই দ্যাখা পাপ। তোমার পাপ তোমার মহৎ চিত্তের মহাব্যাধি! অশোকের মধ্যস্থতাতেই কি সে আর সুপ্রিয়া পরিচয়ের এই নিম্নতম স্তর অতিক্রম করে এল? মুহূর্তের তেজী, হিংসার বশে সুপ্রিয়াকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিতে চেয়ে, অশোক কি তার আর সুপ্রিয়ার মধ্যে পরম সহিষ্ণুতা এনে দিয়েছে?
তাই যদি না হয় – সুপ্রিয়ার প্রশান্ত মুখের দিকে চেয়ে হেরম্ব মনে মনে তার এই চিন্তাকে ভাষায় উচ্চারণ করে —সুপ্রিয়ার মুখের আলো নিবে যাবার কথা। তার শেষ কথায় সুপ্রিয়া তো কাঁদত।
হেরম্বের সবচেয়ে বিস্ময় বোধ হয় সুপ্রিয়ার দীর্ঘ নীরবতায়। নিরিবিলিতে কথা বলতে এসে তার কথা যেন ইতিমধ্যেই ফুরিয়ে গিয়েছে। বেলা, শেষ হয়ে আসে, তবু সুপ্রিয়া কিছু বলে না। এই নীরবতা যে রাগ অথবা অভিমানের লক্ষণ নয় তাও সহজেই বোঝা যায় – সুপ্রিয়ার মুখে কোনো অভিব্যঞ্জনা নেই বলে শুধু নয়, সরে সরে অতি নিকটে এসে তার আধ-অন্যমনস্ক বসবার ভঙ্গিতে। খোলা চুল সে আর বাঁধে নি, আঁচল জড়িয়ে গলার সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে, অনাবৃত মাথায় শুধু কয়েকটি আলগা চুল বাতাসে উড়ছে। হেরম্বের জামার যেটুকু বালিতে বিছানো হয়ে আছে তাতে সে পেতেছে হাত, সে হাতে দেহের উর্ধ্বাংশের ভর রেখে হাঁটু মুড়ে কত হয়ে বসেছে। সে যেন হেরম্বকে উঠতে দেবে না, জামা ধরে বসিয়ে রাখবে। অথবা বৃন্তচু্যত ফুলের মতো হেরম্বের কোলে ঝরে পড়ার জন্য সে শুধু হাতটির অবশ হওয়ার প্রতীক্ষা করছে।
এখন একটু চেষ্টা করলেই হেরম্ব আনন্দকে ভুলে যেতে পারে। ফেননন্দিতা সাগরকুলে জনহীন দিব্যাবসানের বৈরাগ্যকে একটু প্রশ্ৰয় দেওয়া, সরল মনে একবার স্মরণ করা পার্শ্ববর্তিনীর জীবনেতিহাস। সে তো কঠিন নয়। কত দিনের কত ক্ষুধা ও পিপাসা, কত স্বপ্ন ও সঙ্কল্প সঞ্চয় করে সুপ্রিয়া আজ এমন শিথিল ভঙ্গিতে এত কাছে বসেছে সে ছাড়া আর কার তা স্মরণীয়? নিজেকে হেরম্বের দুর্বল ও অসহায় মনে হয়।
সুপ্রিয়া হঠাৎ মৃদু হেসে বলল, ‘বাড়িতে এখন আমার খোঁজ পড়েছে।’
হেরম্ব বলল, ‘এবার ওঠা যাক।’
‘এখনি? আগে সন্ধ্যা হোক, রাজি হোক, তখন যদি উঠি তো উঠব।‘
