হেরম্ব জানত সুপ্রিয়া তার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকবে। দেরি দেখে হয়তো মাঝে মাঝে পথের দিকেও তাকাবে। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছানো মাত্র সুপ্রিয়া বেরিয়ে এসে তার সঙ্গে যোগ দেবে হেরম্ব তা ভাবতে পারে নি। সুপ্রিয়ার পক্ষে এতখানি অধীরতা কল্পনা করা কঠিন।
সুপ্রিয়া নিজে থেকে কৈফিয়ত দিল।’
ওঁর দাদা-বেঁদি এসে পড়েছে। চলুন আমরা পালাই।’
‘পালাই? পালাই কিরে?’
সুপ্রিয়া ব্যাকুল হয়ে বলল, ‘সরে চলুন। এখান থেকে, কেউ দেখতে পাবে! হেঁয়ালি বুঝবার সময় পাবেন ঢ়ের।’
সে দ্রুতপদে এগিয়ে গেল। মূঢ়ের মতো তাকে অনুসরণ করা ছাড়া হেরম্বের আর উপায় রইল না। সমুদ্রের ধারে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত সুপ্রিয়া মুহূর্তের জন্য তার গতিবেগ শ্রুথ করল না। সে যেন চুরি করে পালাচ্ছে। বঙ্গনারীর এই অস্বাভাবিক জোর চলনে পথের লোক অবাক হয়ে চেয়ে আছে লক্ষ করে হেরম্বের লজ্জা করতে লাগল। সুপ্রিয়ার পায়ে জুতো নেই, পরনের সাধারণ শাড়িখানা ময়লা, তার আলগা খোঁপা খুলে গেছে। বয়সও তার কম হয় নি, চার বছর আগে একবার সে মা হয়েছিল।
তবু সমুদ্রতীর অবধি হেরম্ব চুপ করে রইল। সেখানে সুপ্রিয়া দাঁড়াতে সে মৃদু ও কড়া সুরে বলল, ‘রাস্তার লোক হাসালি, সুপ্রিয়া।‘
‘হাসুক। মাগো, এইটুকু জোরে হেঁটে হাঁপ ধরে গেছে!’
বুক ফুলিয়ে ফুলিয়ে দুর্বিনীত ভঙ্গিতে সে নিশ্বাস নেয়। সমুদ্রের বাতাসে তার আলগা চুল, অনাবদ্ধ অঞ্চলপ্রান্ত উড়তে থাকে। হেরম্ব সভয়ে স্মরণ করে সুপ্রিয়ার এ রূপ প্রায় পাঁচ বছরের পুরোনো, যখন ছেলেমানুষ পেয়ে আনন্দের সমবয়সী সুপ্রিয়াকে সে ভুলিয়ে বিয়ে দিয়েছিল বলে রূপাইকুড়ায় সুপ্রিয়া অভিযোগ করেছে।
‘দাঁড়াবেন না, চলুন।’–বলে সমুদ্রের ঢেউ যেখানে পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিয়ে যায়, সেখান দিয়ে সুপ্রিয়া হাঁটতে আরম্ভ করল। রোদের তেজ এখনো কমে নি, কিন্তু জোরালো বাতাস রোদের তাপ গা থেকে মুছে নিয়ে যাচ্ছে। হেরম্ব বলল, ‘ব্যাপার কি বলা তো, সুপ্রিয়া?’
‘ব্যাপার কঠিন কিছু নয়। বাড়িতে ভিড় জমেছে, নিরিবিলি কথা বলার জন্য সমুদ্রের ধারে বেড়াতে এলাম–শুধু এই।’
‘ফিরে গিয়ে কি কৈফিয়ত দিবি?’
‘তার দরকার হবে না।’
নীরবে দুজনে এগিয়ে চলল। সমুদ্রতীর পথ নয়। কিন্তু হেঁটে বড় আরাম। পাশে অনন্ত সমুদ্রের গা ঘেঁষে সমুদ্রতীরও কোথায় কতদূর চলে গেছে, শেষ নেই। সঙ্গী নিয়ে নিঃশব্দে হাঁটবার সুবিধাও এইখানে, সমুদ্রের কলরব নীরবতাকে প্রচ্ছন্ন করে রাখে, পীড়ন করতে দেয় না।
অনেক দূর গিয়ে সুপ্রিয়া জিজ্ঞাসা করল, ‘চিঠিতে ওই মেয়েটার কথা লেখেন নি কেন?’
‘লিখি নি? ভুল হয়ে গিয়েছিল।’
‘আমি খবর পেয়েছিলাম। ও সাক্ষী দিতে একবার পুরী এসেছিল। গিয়ে বলল, আপনি এক তান্ত্রিকের আড্ডায় ড়ুবতে বসেছেন।’
‘তান্ত্রিক নয়, বৈষ্ণব।’
‘মেয়েটাকে দেখেই আমার ভালো লাগে নি। ওর মা-টা আরো খারাপ।’
হেরম্ব গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তুই বুঝি ভুলে গেছিস, সুপ্রিয়া, কতকগুলি কথা আছে মুখ ফুটে যা বলতে নেই?’
সুপ্রিয়া কলহের সুরে বলল, ‘চুপ করে থাকব, না? আমি তা পারব না। আমি মেয়েমানুষ, অত উদার আমি হতে চাই না। পারলে ওই রাক্ষসীকে আমি বিষ খাইয়ে গলা টিপে মেরে ফেলব, এই আপনাকে আমি স্পষ্ট বলে রাখলাম।’
হেরম্ব অনাথের মতো অনুত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘তুই যে ক্রমেই মালতী—বৌদি হয়ে উঠছিস, সুপ্রিয়া!’
‘মালতী-বৌদি কে? ওই মা-টা বুঝি? হুঁ, ডাকের দেখি বাহার আছে!’
‘চেহারার বাহার আছে, সুপ্রিয়া।’
‘তা আছে। দুজনারই।’
খোঁচা খেয়ে হেরম্ব একটু বিরক্ত হল। সুপ্রিয়ার এবারকার পদ্ধতিটি ভালো নয়। রূপাইকুড়ায় সে তাদের বাহ্য-সম্পর্ককে প্রাণপণে ঠেলে তুলতে চেয়েছিল। সেই স্তরে যেখানে বাস্তবধর্ম মানুষের আবেগ ও স্বপ্ন বিছানো থাকে, যেখানে রস ও মাধুর্যের সমাবেশ। সাধারণ যুক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে তুচ্ছ করে দেবার প্রবৃত্তি হেরম্ব যাতে দমন করতে না চায়, রূপাইকুড়ায় তাই ছিল সুপ্রিয়ার প্রাণপণ চেষ্টা। এবার সুপ্রিয়া তার সমস্ত নেশা টুটিয়ে দিতে চায়, সে যে প্রায় ভুলে যেতে বসেছে। সে রক্তমাংসের মানুষ, তার এই ভ্রান্তিকে সে টিকতে দেবে না। আত্মবিস্মৃত পাখির মতো নিঃসীম আকাশে পাখা মেলে অনন্ত-যাত্রায় তাকে প্রস্তুত হতে দেখে এই নীড়লুব্ধা বিহঙ্গমী তার কাছে পৃথিবীর আকর্ষণ টেনে এনেছে, তাকে মনে পড়িয়ে দিচ্ছে আকাশে আশ্রয় নেই, খাদ্য নেই, পানীয় নেই। হেরম্ব ধীরে ধীরে হীটে। সুপ্রিয়ার ইঙ্গিত মিথ্যা নয়, রূপের বাহার ছাড়া আনন্দের আর কিছুই নেই। আনন্দের ভিতর ও বাহির সুন্দর, অপার্থিব, অব্যবহার্য সৌন্দর্যে তার দেহ-মন মণ্ডিত হয়ে আছে; সে রঙিন কালিতে ছাপানো অনবদ্য কবিতার মতো। অথবা সে আকাশের মতো, তার মধ্যে ড়ুবে গিয়েও পাখিকে নিজের পাখায় ভর করে থাকতে হয়, পাখা অবশ হলে পৃথিবীতে পতন অনিবাৰ্য। আনন্দকে প্রেম ছাড়া আর কোনো পূজায় পাওয়া যায় না, প্রেমের শেষ অবশ্য নিশ্বাসের সঙ্গে সে হারিয়ে যাবে। সুপ্রিয়ার কাছে অভ্যস্ত বিরক্তি ও মমতার অবাধ খেলায় বিস্ময়কর স্বস্তিবোধ করে হেরম্ব কি এখন বুঝতে পারছে না। আনন্দের সান্নিধ্য তাকে অনির্বচনীয় সুতীব্র সুখের সঙ্গে কি অসহ্য যন্ত্রণা দেয়? তার অর্ধেক হৃদয় ভালবাসার যে পুলক সংগ্রহ করে, অপরার্ধ মরণাধিক কষ্ট সয়ে তার মূল্য দেয়? সুপ্রিয়ার কাছে সে উন্মাদনা পাবার সম্ভাবনা যেমন নেই, সেরকম অসহ্য দুঃখও সে দেয় না।
