মালতী এ কথা কানেও তুলল না, বলে চলল, ‘স্বপন দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেছে বাপু, যাই বল। আচ্ছা চল না। আমরা দুজনে একটু বেড়িয়ে আসি ক’দিন? ওদের কষ্ঠিবদলটা চুকিয়ে দিয়ে যাই, ওরা এখানে থাক। তুমি আমি বিন্দাবনে গিয়ে ঘর বাঁধি চল!’
মালতীর গাম্ভীৰ্যকে বিশ্বাস করে উপদেশ দেবার ভঙ্গিতে অনাথ বলল, ‘এখনো তোমার ঘর বাঁধবার শখ আছে, মালতী? বনে যদি যাও তো চল!’
মালতী তার আকস্মিক বিপুল হাসিতে অনাথের ক্ষণিকের অন্তরঙ্গতা চূৰ্ণ করে দিল। বলল, ‘কেন, বনে যাবার এমন কি বয়েসটা আমার হয়েছে শুনি? রাধাবিনোদ গোসাই কণ্ঠিবদলের জন্য সেদিনও আমায়। সেধে গেল না? মেয়ে টের পাবে বলে অপমান করে তাড়িয়ে দিলাম, ডাকলেই আবার আসে। তোমার চোখ নেই তাই আমাকে বুড়ি দ্যাখ! না কি বল, হেরম্ব? আমি বুড়ি?’
হেরম্বকে সে আবার চোখ ঠারল, ‘রাধাবিনোদ গোসাইকে জান হেরম্ব? মাঝে মাঝে আমায় দেখতে আর সাধতে আসে–লক্ষ্মীছাড়া ব্যাটা। চেহারা যেমন হোক, পয়সা আছে। সেবাদাসীর খাতিরও জানে বেশ–শৌখিন বৈরিগি কিনা। তোমাদের এই মাস্টারমশায়ের মতো কাটখোট্টা নয়।‘
অনাথ বলল, ‘কি সব বলছ মালতী?’
মালতী হঠাৎ ঢোক গিলে এদিক-ওদিক তাকায়। দৃষ্টি দিয়ে অনাথকে গ্ৰাস করতে তার এই দ্বিধা দেখে হেরম্ব অবাক হয়ে যায়। কিন্তু মালতী নিজেকে চোখের পলকে বদলে ফেলে। ঔদ্ধত্যের সীমা তার কোনোদিনই নেই। সে হেসে বলে, ‘বৈরিগি মানুষের মতো লজ্জা কেন? বলি না। হেরম্বকে কাণ্ডটা।–শোন হেরম্ব, বলি। এই যে গোবেচারি ভালো মানুষটিকে দেখছ, সাত চড়ে মুখে রা নেই, আমার জন্যে একদিন এ রাধাবিনোদ গোঁসাই-এর সঙ্গে মারামারি করেছে। হাতাহাতি চুলেচুলি সে কি কাণ্ড হেরম্ব, দেখলে তোমার গায়ে কঁটা দিত। আমি না। সামলালে সেদিন গোঁসাই খুন হয়ে যেত, হেরম্বা। আর আজকে আমি মরি-বাঁচি গ্রাহ্যি নেই!’
হেরম্ব বুঝতে পারে, কথার আড়ালে মালতী পুষ্পাঞ্জলির মতো অনাথের পায়ে নিবেদন বর্ষণ করছে–যেদিন ছিল সেদিন আবার ফিরে আসুক।
‘হ্যাঁ গো, চল না, আমরা যাই? মেয়ের মুখ চেয়ে আর কতকাল আমায় কষ্ট দেবে?’
‘তোমার সঙ্গে কথা কইলেই তুমি বড় বাজে বক, মালতী।’ বলে অনাথ উঠে গেল। মালতী ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলল, ‘আমার সঙ্গে এমন করলে ভালো হবে না। বলছি। বস এসে, আমার আরো কথা আছে, ঢের কথা আছে।’
অনাথ চলে গেলে মালতী ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তাঁর ঠোঁটের বাঁকা হাসিতে নিরুৎসাহ ও নিরুৎসব ভােব চাপা পড়ে গেল। এইমাত্র যে ছিল ভিখারিনী, সে হঠাৎ ক্ষমাদাত্রী হয়ে বলল, ‘লোকটা পাগল হেরম্ব, ক্ষ্যাপা। আর ছেলেমানুষ।’
‘আমি কিছু বলব, মালতী-বৌদি?’
‘চুপ! একটি কথা নয়।’—মালতী টেনে টেনে হাসল, ‘তুমি বোঝা ছাই, বলবেও ছাই। দেড় যুগ আঙুল দিয়ে ছোয় না, তাই বলে আমি কি মরে আছি? বুড়ো হয়ে গেলাম, শখ-টখ আমার আর নেই বাপু, এখন ধম্মেকম্মো সার। ঠাট্টা-তামাশা করি একটু, মিনসে তাও বোঝে না।’
স্নান করে এসে চাবি নিয়ে আনন্দ মন্দিরে গেল। মালতী ঘরে ঢুকে এই ভোরে বাসিমুখে গিলে এল খানিকটা কারণ। মালতী প্রকৃতপক্ষে বৈষ্ণবী, কিন্তু সবদিক দিয়ে অনাথের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য মালতী তান্ত্রিক গুরুর কাছে মন্ত্র নিয়েছে। মন্ত্র নিয়ে ধ্যানধারণা সমস্ত পর্যবসিত করেছে। কারণ-পানে। হেরম্বের প্রায় সহ্য হয়ে এসেছিল, তবু ঘুম থেকে উঠেই মালতীর মদ খাওয়া তার বরদাশত হল না। সে বাইরে চলে গেল।
মন্দিরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘তোমাকে হয়তো আজ ভক্তদের ব্যবস্থাও করতে হবে, না
আনন্দ?’
আনন্দ চন্দন ঘষছিল। কাজে আজ তার উৎসাহ নেই।
’না, মা আসবে।’
‘তিনি এইমাত্র খালি পেটে কারণ খেলেন! চোখ লাল হতে আরম্ভ করেছে।’
‘কারণ খেলে মার কিছু হয় না।’
হেরম্ব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ আনন্দের অন্যমনস্ক কাজ করা চেয়ে দেখল। হাত-পা নাড়তে আনন্দের যেন বড় কষ্ট হচ্ছে। যেমন তেমন করে পূজার আয়োজন শেষ করে দিতে পারলে সে যেন আজ বাঁচে। তিন দিন আগে বর্ষা নেমেছিল। সেদিন থেকে আনন্দের কি যে হয়েছে। কেউ জানে না, হয়তো আনন্দ নিজেও নয়। অল্পে অল্পে সে গম্ভীর ও বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে যে আবেগময় উদ্গ্ৰীব উল্লাস আপনা হতে উৎসারিত হতে পথ পেত না, হেরম্বের ডাকেও আজ তা সাড়া দিতে চায় না। সে ঝিমিয়ে পড়েছে, হেরম্বের কাছ থেকে গিয়েছে সরে। দূরে নয়, অন্তরালে। সেদিনের মেঘ-মেদুর আকাশের মতো কোথা থেকে সে একটি সজল বিষণ্ণ আবরণ সংগ্রহ করেছে, ভালবাসার পাখায় ভর করে হেরম্বের মন উর্ধের্ব, বহু ঊর্ধে উঠেও অবারিত নীল আকাশকে খুঁজে পাচ্ছে না।
এতদিন হেরম্ব কিছু জিজ্ঞাসা করে নি। আজ সে প্রশ্ন করল, ‘তোমার কি হয়েছে, আনন্দ?’
‘আমার অসুখ করেছে।’
হেরম্ব হতবাক হয়ে গেল। তার প্রশ্নের জবাবে এই যদি আনন্দের বক্তব্য হয়, তার ভালবাসাকে শুধু এই কৈফিয়ত যদি আনন্দ দিতে চায়, তবে আর কিছু তার জিজ্ঞাস্য নেই। সে কি জানে না আনন্দের অসুখ করে নি!
গুরুতর পরিশ্রমের কাজে মানুষ যেভাবে ক্ষণিকের বিরাম নেয়, চন্দন ঘষা বন্ধ করে আনন্দ তেমনি শিথিল অবসন্নভাবে মন্দিরের মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসল। বলল, ‘মাথাটা ঘুরছে, বুক ধড়ফড় করছে—’
নিষ্ক্রিয় অবসাদে হেরম্ব মাথা নেড়েও সায় দিল না।
