কোনোদিন বাইরে প্রবল বর্ষা নামে। মন্দির ও সমুদ্র জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে মিলিয়ে যায়। ঘরের মধ্যে বিছানো লোমশ কম্বলে বসে আনন্দ ঝিনুকের রাশি গোনে এবং বাছে, ডান হাত আর বাঁ হাতকে প্রতিপক্ষ করে খেলে জোড়-বিজোড়। দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে হেরম্ব চুরুট খায় আর নিরানন্দ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আনন্দের খেলা চেয়ে দেখে। এই বিরহ-বিপন্ন বিষণ্ণ মুহূর্তগুলিতে তার যে দৃষ্টির প্রখরতা কমে যায় তা নয়। আনন্দের স্বচ্ছাপ্রায় নখের তলে রক্তের আনাগোনা তার চোখে পড়ে, অধরোষ্ঠের নিগুঢ় অভিপ্ৰায়ের সে মর্মোদঘাটন করে, কপালে ছেলেখেলার হারজিতের হিসাবগুলিকে গোনে। ঘরের আলো বর্ষার মেঘে স্তিমিত হয়ে থাকে।
আনন্দ শ্ৰান্তস্বরে বলে, ‘কি বৃষ্টিই নেমেছে! সমুদ্রটা পর্যন্ত বোধহয় ভিজে গেল।’
হেরম্ব কথা বলে না। আনন্দের বর্ষা-বিরাগে তার দিন আরো কাটতে চায় না।
চুরুটের গন্ধে আনন্দ মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকাল।. হেরম্ব ভাবল, আনন্দ হয়তো হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকবে। এখন বাগানে যেতে অস্বীকার করার জন্য হেরম্ব নিজেকে প্রস্তুত করছে, আনন্দ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, যার সুস্পষ্ট অর্থ, এখন হেরম্বের বাগানে যাবার দরকার নেই : দূরত্বই ভালো, এই ব্যবধান। হেরম্ব চুরুটটা ফেলে দিয়ে সরে গেল। কাছাকাছি না গেলে চাওয়া-চাওয়িও এখন না হলে চলবে।
গামছা কাপড় নিয়ে হেরম্ব খিড়কির দরজা দিয়ে বার হয়ে বাড়ির পূর্বদিকের পুকুরে স্নান করে এল। বাড়িতে ঢুকে দেখল, বাগান থেকে ঘরে এসে আনন্দ অনাথের কাছে গল্প শুনতে বসেছে। হেরম্বও একপাশে বসে পড়ল। গল্প শোনার প্রত্যাশায় নয় ; অনাথের বলা ও আনন্দের শোনা দেখবার জন্য।
অনাথ আজ মেয়েকে নচিকেতার কাহিনী শোনাচ্ছে।
‘–তস্য হি নচিকেতা নাম পুত্ৰ আস। বাজশ্রবসের নচিকেতা নামে এক পুত্র ছিল! একবার এক যজ্ঞ করে বাজশ্রবস নিজের সর্বস্ব দান করলেন। দক্ষিণা দেবার সময় হলে নচিকেতা–স হোবাচ পিতরাং তত কৰ্ম্মৈ মান্দাস্যতীতি, আমায় কাকে দেবেন? নচিকেতা তিনবার এ প্রশ্ন করলে বাজশ্ৰবাস রাগ করে বললেন, তোমায় যমকে দেব।’
হেরম্ব মৃদুস্বরে বলল, ‘যম নয়, মৃত্যুকে।’
আনন্দ বলল, ‘তফাত কি হল?’
হেরম্ব বলল, ‘উপনিষদে মৃত্যু শব্দটা আছে।’
আনন্দ তার এই বিদ্যার পরিচয়ে মুগ্ধ হল না। বলল, ‘তারপর কি হল বাবা?’
হেরম্বের মনে হয়, আনন্দ তাকে অবহেলা করছে। তার অস্তিত্বকে আনন্দের এ পরিপূর্ণ বিস্মরণ। বাগানে আনন্দের ঘাড় নাড়া ধরলে এই নিয়ে দুবার হল। সকালের শুরু দেখে আজকের দিনটি হেরম্ব একটি মোটামুটি নিরানন্দের মধ্যে কাটিয়ে দেবারও আশা করতে পারে না।
এদিকে মালতী এসে নচিকেতার কাহিনীতে বাধা জন্মায়।
‘তারপর কি হল বাবা? কচি খুকির মতো সকালে উঠে গপ্পো গিলছিস? স্নান-টান করে মন্দিরটা খোল না গিয়ে! কাজের সময় গপ্পো কি?’
অনাথ বলে, ‘এমনি করে বুঝি বলতে হয়, মালতী?’
‘কি করে বলব। তবে? একটা কাজ করতে বলার জন্যে পেটের মেয়ের কাছে গলবস্ত্র হতে হবে?’
অনাথ চুপ করে যায়। আনন্দ স্নানের উদ্দেশ্যে চলে যায় পুকুরে। তাঁর পরিত্যক্ত স্থানটি দখল কুসুম মালতী। হেরণের মনে হয়, সেও খুব অনাথের কাছে গাই শুনতে চায়। যে কোনো কাহিনী।
হেরম্বের আবির্ভাবে এদের দুজনের সম্পর্কে বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটে নি। অনাথের অসঙ্গত অবহেলার জবাবে মালতীর স্বেচ্ছাচারিতা যেমন উগ্র ছিল তেমনি উগ্র হয়েই আছে। কিন্তু তার সমস্ত রুক্ষ আচরণের মধ্যে একটি পিপাসু দীনতা, ক্ষীণতম আশ্বাসের প্রতিদানে নিজেকে আমূল পরিবর্তন করে ফেলবার একটা অনুচ্চারিত প্রতিজ্ঞা হেরম্ব আজকাল সর্বদা আবিষ্কার করতে পারে। বোঝা যায়, অনাথের প্রতি মালতীর সমস্ত ঔদ্ধত্য অনাথকে আশ্রয় করেই যেন দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের জীবনে সে যে স্থূল অপরিচ্ছন্নতা আমদানি করেছে, অনাথের গায়ে তার নমুনাগুলি লেপন করে দেবার চেষ্টার মধ্যে যেন তার একটি প্রার্থনার আর্তনাদ গোপন হয়ে থাকে, আমাকে। শুদ্ধ করা, পবিত্র করা। অনাথের নিরুপদ্রব নির্বিকার ভাব মাঝে মাঝে হেরম্বকেও বিচলিত করে দেয়। সময় সময় তার মনে হয়, এও বুঝি এক ধরনের অসুখ। জ্বর। যেমন উত্তাপ বেড়েও হয়, কমেও হয়, এরা দুজনে তেমনি একই মানসিক বিকারের শান্ত ও অশান্ত অবস্থা দুটি ভাগ করে নিয়েছে।
কখনো কখনো এমন কথাও হেরম্বের মনে হয় যে, অনাথের চেয়ে মালতীরই বুঝি ধৈর্য বেশি, তিতিক্ষা কঠোরতর, অনাথের আধ্যাত্মিক তপস্যার চেয়ে মালতীর তপস্যাই বেশি বিরামবিহীন। অনাথের বিষয়ান্তরের আশ্রয় আছে, অন্যমনস্কতা আছে, যৌগিক বিশ্রাম আছে–-মালতীর জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গতি নিরবচ্ছিন্নভাবে একনিষ্ঠ। অনাথকে কেন্দ্র করে সে পাক খাচ্ছে। অনাথ তার জগৎ অনাথ তার জীবন, অনাথকে নিয়ে তার রাগ-দুঃখ-হিংসা-ক্লেশ, অনাথ তার অমার্জিত পার্থিবতার প্রস্রবণ, তার মদের নেশার প্রেরণা। অনাথকে বাদ দিলে তার কিছুই থাকে না।
হেরম্বকে চোখ ঠেরে মালতী গম্ভীর মুখে অনাথকে বলল, ‘কাল এক স্বপন দেখলাম। তুমি আর আমি যেন কোথায় গেছি–অনেক দূর দেশে। পোড়া দেশে আমরা দুজন ছাড়া আর মানুষ নেই, রাস্তায়-ঘাটে, ঘরে-বাড়িতে সব মরে রয়েছে।’
অনাথ বলল, ‘ভুলেও তো সৎচিন্তা করবে না। তাই এরকম হিংসার ছবি দ্যাখ।’
