মিথ্যার প্রকাণ্ড একটা স্তুপ ছাড়া সে আর কিছুই নয়, নিজের কাছে এই জবাব সে পায়।
আনন্দের মুখ তার চোখের সামনে থেকে মুছে যায়। আত্মোপলব্ধির প্রথম প্রবল আঘাতে তার দেখবার অথবা শুনবার ক্ষমতা অসাড় হয়ে থাকে। এ সহজ কথা নয়। অন্তরের একটা পুরোনো শবগন্ধী পচা অন্ধকার আলোয় ভেসে গেল, একদা নিরবচ্ছিন্ন দুঃস্বপ্নের রাত্রি দিন হয়ে উঠল। এবং তা অতি অকস্মাৎ।–এরকম সাংঘাতিক মুহূর্ত হেরম্বের জীবনে আর আসে নি। এতগুলি বছর ধরে তার মধ্যে দুজন হেরম্ব গাঢ় অন্ধকারে যুদ্ধ করেছে, আজি আনন্দের মুখে লোগা চাঁদের আলোয় তারা দৃশ্যমান হয়ে ওঠায় দেখা গেছে শত্রুতা করে পরস্পরকে দুজনেই তারা ব্যৰ্থ করে দিয়েছে। হেরম্বের পরিচয়, ওদের লড়াই। আর কিছু নয়। ফুলের বেঁচে থাকবার চেষ্টার সঙ্গে কীটের ধ্বংসপিপাসার দ্বন্দু, এই রূপকটাই ছিল এতকালের হেরম্ব।
সমারোহের সঙ্গে দিনের পর দিন নিজের এই অস্তিত্বহীন অস্তিত্বকে সে বয়ে বেড়িয়েছে। চকমকির মতো নিজ্র সঙ্গে নিজেকে ঠুকে চারিদিকে ছড়িয়ে বেড়িয়েছে আগুন। কড়িকাঠের সঙ্গে দড়ি বেঁধে গলায় ফাস লাগিয়ে সে-ই উমাকে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। সে খুনী!
হেরম্ব নিঝুম হয়ে বসে থাকে। জীবনের এই প্রথম ও শেষ প্রকৃত আত্মচেতনাকে বুঝেও আরো ভালো করে বুঝবার চেষ্টায় জল-টানা পচা পুকুরের উথিত বুদবুদের মতো অসংখ্য প্রশ্ন, অন্তহীন স্মৃতি তার মনে ভেসে ওঠে।
আনন্দ দুবার তার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলে তবে সে তার কথা শুনতে পায়।
‘কি ভাবছি? ভাবছি। এক মজার কথা, আনন্দ।‘
‘কি মজার কথা?’
আমি অন্যায় করে এতদিন যত লোককে কষ্ট দিয়েছি, তুমি আমাকে তার উপযুক্ত শাস্তি দিলে।‘
এই হেঁয়ালিটি নিয়ে আনন্দ পরিহাস করল না।
‘বুঝতে পারলাম না যে। বুঝিয়ে বলুন।’
‘তুমি বুঝবে না আনন্দ।’
‘বুঝব। আমি কি করেছি, আমি তা বুঝব। যত বোকা ভাবেন আমি তত বোকা নাই।’
হেরম্ব বিষণ্ণ হাসি হেসে বলল, ‘তোমার বুদ্ধির দোষ দিই নি! কথাটা বুঝিয়ে বলবার মতো নয়। আমার এমন খারাপ লাগছে আনন্দ।
আনন্দ সামনের দিকে তাকিয়ে নিরানন্দ স্বরে বলল, ‘তার মানে আমার জন্য খারাপ লাগছে? আচ্ছা লোক যাহোক আপনি!’
হেরম্ব অনুযোগ দিয়ে বলল, ‘আমার মন কত খারাপ হয়ে গেছে জানলে তুমি রাগ করতে না আনন্দ।‘
আনন্দ বলল, ‘মন বুঝি খালি আপনারই খারাপ হতে জানে? সংসারে আর কারো বুঝি মন নেই? হেঁয়ালি করা সহজ। কারণ তাতে বিবেচনা থাকে না। লোকের মনে কষ্ট দেওয়া পাপ। এমনিতেই মানুষের মনে কত দুঃখ থাকে।’
আনন্দের অভিমানে হেরম্বের হাসি এল।
‘তোমার দুঃখ কিসের আনন্দ?’
‘আপনারই-বা মন খারাপ হওয়া কিসের? চাঁদ উঠেছে, এমন হাওয়া দিচ্ছে, এখুনি প্রসাদ খেতে পাবেন, তারপর আমার নোচ দেখবার আশা করে থাকবেন–আপনারই তো ষোল আনা সুখ। দুঃখ হতে পারে আমার। আমি এত মন্দ যে লোককে মিছিমিছ কখনো শাস্তি দিই, নিজে তা টেরও পাই না। আমার কাছে বসতে হলে লোকের এমনি বিশ্ৰী লাগে, আমি মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেও। ই আমার দুঃখের নাকি তুলনা আছে!’
হেরম্ব ভাবল, আজ নিজের কথা ভেবে লাভ নেই। নিজের কথা ভুল করে ভেবে এতদিন জীবনটা অপচয়িত হয়ে গেছে, এখন নির্ভুল করে ভাবতে গেলেও আজ রাত্রিটা তাই যাবে। আনন্দের অমৃতকে আত্মবিশ্লেষণের বিষে নষ্ট করে আগামীকালের অনুশোচনা বাড়ানো সঙ্গত হবে না।
‘খারাপ লাগছে কেন জান?’
‘কি করে জানব? বলেছেন?’ আনন্দ আশান্বিত হয়ে উঠল।
‘তোমার কাছে বসে আছি বলে যে খারাপ লাগছে। এ কথা মিথ্যে নয় আনন্দ।’
‘তা জানি।’
‘কিন্তু কেন জান?’
আনন্দ রেগে বলল, ‘জানি জানি। আমার সব জানা আছে। কেবল জান জান করে একটা কথাই এক শ বার শোনাবেন তো!’
কৃষ্টা কথা এক শ বন্ধ আমি কারকেই শোনাই না। এমন কথা শেলাব, কখনো তুমি যা শোন নি।‘
‘থাক। না শুনলেও চলবে। আপনি অনেক কথা বলেছেন, ফুসফুস হয়তো আপনার ব্যথা হয়ে গেছে। এইবার একটু চুপ করে বসুন!’
‘আর তা হয় না। আনন্দ। তোমাকে শুনতেই হবে! তোমার কাছে বসে আমার মনে হচ্ছে এতকাল তোমার সঙ্গে কেন আমার পরিচয় ছিল না? তাই খারাপ লাগছে।‘
আনন্দের নালিশ করবার পর থেকে বিনা পরামর্শেই তাদের গলা নিচু হয়ে গিয়েছিল। নিজের কথা নিজের কানেই যেন শোনা চলবে না।
হেরম্ব নয়, সে-ই যেন মিথ্যা কথা বলেছে এমনিভাবে আনন্দ বলল, ‘আপনি এমন বানিয়ে বলতে পারেন!’
আরতি শেষ করে আনন্দ আজি মন্দিরে নাচবে না। শুনে মালতী মন্দিরের দরজায় তালা দিল।
‘এসে থেকে ঠায় বসে আছ সিঁড়িতে। ঘরে চল হেরম্ব। তুই এই বেলা কিছু খেয়ে নে না আনন্দ।‘
বাড়ির দিকে চলতে আরম্ভ করে আনন্দ বলল, ‘প্ৰসাদ খেলাম যে?’
‘প্ৰসাদ আবার খাওয়া কি লো ছড়ি? আর কিছু খা। নাচবেন বলে মেয়ে আমার খাবেন না, ভারি নাচনেউলি হয়েছেন।’
আনন্দ তাকে ভয় দেখিহে বলল, ‘শোন মা, শোন। আজ যদি আমায় বক, সেদিনের মতো হবে কিন্তু।’
হেরম্ব দেখে বিস্মিত হল যে, এ কথায় মালতী সত্য সত্যই ভড়কে গেল।
‘কে তোকে বকিছে। বাবু! শুধু বলেছি, কিছু খা। খেতে বলাও দোষ?’
হেরম্ব জিজ্ঞাসা করল, ‘সেদিন কি হয়েছিল?’
আনন্দ বলল, ‘বোলো না মা।’
মালতী বলল, ‘আমি একটু বকেছিলাম। বলেছিলাম, উপোস করে থাকলে নাচতে পারবি না। আনন্দ। এই শুধু বলেছি, আর কিছুই নয়। যেই বলা–
আনন্দ বলল, ‘যেই বলা! কতক্ষণ ধরে বকেছিলে মনে নেই বুঝি?’
