‘কি রকম ঠাকুর হেরম্ব?’
‘বেশ, মালতী-বৌদি।’
আনন্দ ওঠে নি। সেইখানে তেমনিভাবে বসে ছিল। হেরম্ব ফিরে গিয়ে তার কাছে বসল।
‘তুমি দেবদাসী নাকি আনন্দ?’
‘আজ্ঞে না, আমি কারো দাসী নই।’
‘তবে মন্দিরে ঠাকুরের সামনে নাচ যে?’
‘ঠাকুরের সামনে বলে নয়। মন্দিরে জায়গা অনেক, মেঝেটাও বেশ মসৃণ। সবদিন মন্দিরে নাচি না। মাঝে মাঝে। আজ এইখানে নাচব, এই ঘাসের জমিটাতে। ঠাকুর আমাদের সৃষ্টি করেছেন, ভিক্তের কাছে যা প্ৰণামী পান। তাই দিয়ে ভরণপোষণ করেন। এটা হল তার কর্তব্য। কর্তব্য করবার জন্য সামনে নাচব, নাচ আমার অত সস্তা নয়।’
‘বোঝা যাচ্ছে দেবতাকে তুমি ভক্তি কর না।’
‘ভক্তি করা উচিত নয়। বাবা বলেন, বেশি ভক্তি করলে দেবতা চটে যান। দেবতা কি বলেন, শুনবেন? বলেন, ওরে হতভাগার দল! আমাকে নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তোরা একটু আত্মচিন্তা কর তো বাপু আমাকে নিয়ে পাগল হয়ে থাকবার জন্য তোদের আমি পৃথিবীতে পাঠাঁই নি। সবাই মিলে তোরা আমাকে এমন লজ্জা দিস!’
হেরম্ব খুশি হয়ে বলল, ‘তুমি তো বেশ বলতে পার আনন্দ?’
‘আমি বলতে পারি ছাঁই! এসব বাবার কথা।’
‘তোমার বাবা বুঝি খুব আত্মচিন্তা করেন?’
‘দিনরাত। বাবার আত্মচিন্তার কমাই নেই। আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আজ বোধহয় মন একটু বিচলিত হয়েছিল, এসেই আসনে বসেছেন। কখন উঠবেন তার ঠিক নেই। এক একদিন সারারাত আসনে বসেই কাটিয়ে দেন।’
মন্দিরের মধ্যে মালতী শুনতে পাবে বলে আনন্দ হেরম্বের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
‘এই জন্য মা এত ঝগড়া করে। বলে বাড়ি বসে ধ্যান করা কেন, বনে গেলেই হয়। বাবা সত্যি সত্যি দিনের পর দিন ফেন কি রকম হয়ে যাচ্ছেন। এত কম কথা বলেন যে, মনে হয় বোবাই বুঝি হবেন।’
হেরম্ব এ কথা জানে। অনাথ চিরদিন স্বল্পভাষী। সেরকম স্বল্পভাষী নয়, বেশি কথা কইলে দুর্বলতা ধরা পড়ে যাবে বলে যারা চুপ করে থাকে। নিজেকে প্রকাশ করতে অনাথের ভালো লাগে। না। তার কম কথা বলার কারণ তাই।
মন্দিরের মধ্যে পঞ্চপ্রদীপ নেড়ে টুইটাং ঘণ্টা বাজিয়ে মালতী এদিকে আরতি আরম্ভ করে দিয়েছিল। হেরম্ব বলল, ‘প্ৰণামী দেবার ভক্ত কই আনন্দ?’।
‘তারা সকালে আসে! দু মাইল হেঁটে রাত করে কে এতদূর আসবে! বিকেলে আমাদের একটি পয়সা রোজগার নেই। আজ আপনি আছেন আপনি যদি কিছু দেন।’
‘তুমি আমার কাছে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছ।’
‘আমি আদায় করব কেন? পুণ্য অর্জনের জন্য আপনি নিজেই দেবেন। আমি শুধু আপনাকে উপায়টা বাতলে দিলাম।’ আনন্দ হাসল। মালতীর ঘণ্টা এই সময় নীরব হওয়ায় আবার হেরম্বের দিকে ঝুঁকে বলল, ‘তাই বলে মা প্ৰণাম করতে ডাকলে প্ৰণামী দিয়ে বসবেন না যেন সত্যি সত্যি। মা তাহলে ভয়ানক রেগে যাবে।‘
‘মাকে তুমি খুব ভয় কর নাকি আনন্দ?’
‘না, মাকে ভয় করি না। মার রাগকে ভয় করি।’
হেরম্ব এক টিপ নস্য নিল। সহজ। আলাপের মধ্যে তার আত্মাগ্লানি কমে গেছে।
‘আমাকে? আমাকে তুমি ভয় কর না আনন্দ?’
‘আপনাকে? আপনাকে আমি চিনি না, আপনার রাগ কি রকম জানি না। কাজেই বলতে পারলাম না।’
‘আমাকে তুমি চেন না আনন্দা! আমি তোমার বন্ধু যে!’
আনন্দ অতিমাত্রায় বিস্মিত হয়ে বলল, ‘ব্যস! শোন কথা! আপনি আবার বন্ধু হলেন কখন?’
‘একটু আগে তুমি নিজেই বলেছ। মালতী—বৌদি সাক্ষী আছে।’
আনন্দ সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ভুল করে বলেছিলাম। আমি ছেলেমানুষ, আমার কথা ধরবেন না। কখন কি বলি-না—বলি ঠিক আছে কিছু?’
‘এরকম অবস্থায় তোমার তবে কিছু না বলাই ভালো, আনন্দ।’
‘কিছু বলছিও না। আমি। কি বলেছি? চুপ করে বসে আছি। আপনার যদি মনে হয়ে থাকে আমি বেশি কথা বলছি, আপনার ভুল মনে হয়েছে জানবেন।.. ওই দেখুন চাঁদ উঠেছে।’
আনন্দ মুখ তুলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর হেরম্ব তাকায় তার মুখের দিকে। তার অবাধ্য বিশ্লেষণপ্রিয় মন সঙ্গে সঙ্গে বুঝবার চেষ্টা করে তেজী আলোর চেয়ে জ্যোৎস্নার মতো মৃদু। আলোতে মানুষের মুখ আরো বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে। কেন। আলো অথবা মানুষের চোখ, কোথায় এ ভ্রান্তির সৃষ্টি হয়?
হেরম্বের ধারণা ছিল কাব্যকে, বিশেষ করে চাঁদের আলোর কাব্যকে সে বহুকাল পূর্বেই কাটিয়ে উঠেছে। জ্যোৎস্নার একটি মাত্র গুণের মৰ্যাদাই তার কাছে আছে, যে এ আলো নিষ্প্রভ, এ আলোতে চোখ জ্বলে না। অথচ, আজ শুধু আনন্দের মুখে এসে পড়েছে বলেই তার মতো সিনিকের কাছেও চাঁদের আলো জগতের আর সব আলোর মধ্যে বিশিষ্ট হয়ে উঠল।
হেরম্বের বিশ্লেষণ-প্রবৃত্তি হঠাৎ একটা অভূতপূর্ব সত্য আবিষ্কার করে তাকে নিদারুণ আঘাত করে। কবির খাতা ছাড়া পৃথিবীর কোথাও যে কবিতা নেই, কবির জীবনে পর্যন্ত নয়, তার এই জ্ঞান পুরোনো। কিন্তু এই জ্ঞান আজো যে তার অভ্যাস হয়ে যায় নি, আজ হঠাৎ সেটা বোঝা গেছে। কাব্যকে অসুস্থ নার্ভের টঙ্কার বলে জেনেও আজ পর্যন্ত তার হৃদয়ের কাব্যপিপাসা অব্যাহত রয়ে গেছে, প্রকৃতির সঙ্গে তার কল্পনার যোগসূত্রটি আজো ছিঁড়ে যায় নি। রোমান্সে আজো তার অন্ধবিশ্বাস, আকুল উচ্ছ্বসিত হৃদয়াবেগ আজো তার কাছে হৃদয়ের শ্ৰেষ্ঠ পরিচয়, জ্যোৎস্না তার চোখের প্রিয়তম আলো। হৃদয়ের অন্ধ সত্য এতকাল তার মস্তিষ্কের নিশ্চিত সত্যের সঙ্গে লড়াই করেছে। তার ফলে, জীবনে কোনো দিকে তার সামঞ্জস্য থাকে নি, একধার থেকে সে কেবল করে এসেছে ভুল। দুটি বিরুদ্ধ সত্যের একটিকে সজ্ঞানে আর একটিকে অজ্ঞাতসারে একসঙ্গে মৰ্যাদা দিয়ে এসে জীবনটা তার ভরে উঠেছে শুধু মিথ্যাতে। তার প্রকৃতির যে রহস্য, যে দুর্বোধ্যতা সম্মোহনশক্তির মতো মেয়েদের আকর্ষণ করেছে, সে তবে এই? রূঢ় বেদনা ও লজ্জার সঙ্গে হেরম্ব নিজেকে এই প্রশ্ন করে।
