‘সব। শুধু বাবার কাছে জানি নি, মা জল দিতে ডাকা পর্যন্ত ওই জানালায় দাঁড়িয়ে মার সঙ্গে আপনার যত কথা হয়েছে সব শুনে ফেলেছি।‘
আনন্দ চোখ তুলল। কিন্তু এখনো সে হেরম্বের দিকে তাকাতে পারছে না।
‘শুনে কি মনে হল?’
আনন্দ হঠাৎ জবাব দিল না। তারপর সঙ্কোচের সঙ্গে বলল, ‘মনে হল খুব নিষ্ঠুরের মতো স্ত্রীর কথা বললেন। আপনার স্ত্রী কতদিন মারা গেছেন?’
হেরম্ব বলল, ‘অনেক দিন। প্রায় দেড় বছর।’
আনন্দ হেরম্বের জামার বোতামের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অনেক দিন বললেন যে? দেড়বছর কি অনেক দিন?’
হেরম্ব বলল, ‘অনেক দিন বৈকি। দেড়বছরে ক’বার সূর্য ওঠে, কত লোক জন্মায়, কত লোক মরে যায় খবর রাখ?’
আনন্দ মনে মনে একটু হিসাব করে বলল, ‘দেড়বছরে সূর্য ওঠে। পাঁচ শ, সাতচল্লিশ বার। লোক জন্মায় কত? কত লোক মরে যায়?’
হেরম্ব হেসে বলল, ‘পনের-কুড়ি লাখ হবে।’
আনন্দও তার চোখের দিকে চেয়ে হেসে বলল, ‘মোটে? আমি ভাবছিলাম একবছরে পৃথিবীতে বুঝি কোটি কোটি লোক জন্মায়। মার কাছে রোজ যে সব মেয়ে ভক্ত আসে তাদের সকলেরই বুকে একটি, কাঁখে একটি, হাত-ধরা একটি, এমনি গাদা গাদা ছেলেমেয়ে দেখি কিনা, তাই মনে হয় পৃথিবীতে রোজ বুঝি অগুনতি ছেলেমেয়ে জন্মাচ্ছে। কিন্তু দেড়বছরে আর যাই হোক, মানুষ কি বদলাতে পারে?’
‘পারে। এক মিনিটে পারে।’ হেরম্ব জোর দিয়ে বলল।
আনন্দ একটু লাল হয়ে বলল, ‘আপনার স্ত্রীর কথা ভেবে বলি নি। এমনি সাধারণভাবে বলেছি।‘
দেড়বছরে মানুষ বদলাতে পারে কিনা প্রশ্ন করে তার মনে স্ত্রীর শোকটা কতখানি বর্তমান আছে আনন্দ তাই মাপতে চেয়েছিল হেরম্ব এ কথা বিশ্বাস করে নি। সে জেনেছে আনন্দের হৃদয়ে মানুষের সহজ অনুভূতিগুলি সহজ হয়েই আছে। মৃতা স্ত্রীকে কেউ তুলে গেছে শুনলে খুশি হবার মতো হিংস্র আনন্দ নয়।
কিন্তু আনন্দকে মিথ্যা কথা শোনানোও হেরম্বের পক্ষে অসম্ভব।
‘আমার স্ত্রীর কথা ভেবে বললেও দোষ হত না আনন্দ। সংসারে কত পরিচিত লোক, কত আত্মীয় থাকে, যারা হঠাৎ আমাদের ছেড়ে চলে যায়। বেঁচে থাকবার সময় আমাদের কাছে তাদের যতটুকু দাম ছিল, মরে যাবার পর কেবল কাছে নেই বলেই তাদের সে দাম বাড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। দিলে মরণকে আমরা ভয় করতে আরম্ভ করব। আমাদের জীবনে মৃত্যুর ছায়া পড়বে। আমরা দুর্বল অসুস্থ হয়ে পড়বা।’
‘কিন্তু —’ বলে আনন্দ চুপ করে গেল।
হেরম্ব বলল, ‘তুমি যা খুশি বলতে পাের আনন্দ, কোনো বাধা নেই।’
‘কথাগুলির মধ্যে আপনার স্ত্রী এসে পড়েছেন বলে সঙ্কোচ হচ্ছে। যাই হোক, বলি। মনের কথা চেপে রাখতে আমার বিশ্ৰী লাগে। আমার মনে হচ্ছে আপনার কথা ঠিক নয়। ভালবাসা থাকলে শোক হবেই। শোক মিথ্যে হলে ভালবাসাও মিথ্যে।’
হেরম্ব খুশি হল। প্রতিবাদ তার ভালো লাগে। প্রতিবাদ খণ্ডন করা যেন একটা জয়ের মতো।
‘ভালবাসা থাকলে শোক হয় আনন্দ। কিন্তু ভালবাসা কতদিনের? কতকাল স্থায়ী হয়। ভালবাসাঃ প্রেম অসহ্য প্রাণঘাতী যন্ত্রণার ব্যাপার। প্রেম চিরকাল টিকলে মানুষকে আর টিকতে হত। না। প্রেমের জন্ম আর মৃত্যুর ব্যবধান বেশি নয়। প্রেম যখন বেঁচে আছে তখন দুজনের মধ্যে একজন মরে গেলে শোক হয়–অক্ষয় শোক হয়। প্রেমের অকালমৃত্যু নেই বলে শোকের মধ্যে প্রেম চিরন্তন হয়ে যায়। কিন্তু প্রেম যখন মরে গেছে, তখন আছে শুধু মায়া, অভ্যাস আর আত্মসাত্ত্বনার খেলা, তখন যদি দুজনের একজন মরে যায়, বেশিদিন শোক হওয়া অসুস্থ মনের লক্ষণ। সেটা দুর্বলতা, আনন্দ। তুমি রোমিও জুলিয়েটের গল্প জান?’
‘জানি। বাবার কাছে শুনেছি।‘
‘প্রেমের মৃত্যু হওয়ার আগেই ওরা মরে গিয়েছিল। একসঙ্গে দুজনে মরে না গিয়ে ওদের মধ্যে একজন যদি বেঁচে থাকত। তার শোক কখনো শেষ হত না। কিন্তু কিছুকাল বেঁচে থেকে ক্রমে ক্ৰমে ভালবাসা মরে যাওয়ার পর ওদের মধ্যে একজন যদি স্বর্গে যেত, পৃথিবীতে যে থাকত চিরকাল তার শোকাতুর হয়ে থাকার কোনো কারণ থাকত না। একটা ব্যাপার তুমি লক্ষ করেছ। আনন্দ? রোমিও জুলিয়েটের ট্রাজেডি তাদের মৃত্যুতে নয়?’
‘কিসে তবে?’
‘ওদের প্রেমের অসমাপ্তিতে। রোমিও জুলিয়েটের কোনো দাম মানুষের কাছে নেই। জগতের লক্ষ লক্ষ রোমিও জুলিয়েট মরে যাক, কিছু এসে যায় না। কিন্তু ওভাবে ভালো বাসতে বাসতে ওরা মরল কেন ভেবেই আমাদের চোখে জল আসে।’
আনন্দ আনমনে বলল, ‘তাই কি? তা হবে বোধহয়।’
হেরম্ব জোর দিয়ে বলল, ‘হবে বোধহয় নয়, তাই। ওদের অসম্পূর্ণ প্রেমকে আমরা মনে মনে সম্পূর্ণ করবার চেষ্টা করে ব্যথা পাই–রোমিও জুলিয়েটের ট্রাজেডি। তাই। নইলে, ওদের জীবনে ট্রাজেডি কোথায়? ওরা দুজনেই মরে গিয়ে সবকিছুরই অতীত হয়ে গেল–ওদের জীবনে দুঃখ সৃষ্টি হবার সুযোগও ছিল না। আমরা সমবেদনা দেব কাকে? কিসের জোরে রোমিও জুলিয়েট আমাদের একফোঁটা অশ্রু দাবি করবে? ওরা তো দুঃখ পায় নি। প্রেমের পরিপূর্ণ বিকাশের সময় ওরা দুঃখকে এড়িয়ে চলে গেছে। আমরা ওদের প্রেমের জন্য শোক করি, ওদের জন্য নয়।’
আনন্দ বলল, ‘প্রেম কতদিন বাঁচে?’
হেরম্ব হেসে বলল, ‘কি করে বলব আনন্দ! দিন গুনে বলা যায় না। তবে বেশিদিন নয়। এক দিন, এক সপ্তাহ, বড়জোর এক মাস।’
শুনে আনন্দ যেন ভীত হয়ে উঠল।
‘মোটে।‘
হেরম্ব আবার হেসে বলল, ‘মোটে হল? একমাসের বেশি প্ৰেম কারো সহ্য হয়? মরে যাবে আনন্দ–একমাসের বেশি হৃদয়ে প্রেমকে পুষে রাখতে হলে মানুষ মরে যাবে। মানুষ একদিন কি দুদিন মাতাল হয়ে থাকতে পারে। জলের সঙ্গে মদের যে সম্পর্ক মদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তাই—প্রেম এত তেজী নেশা।’
