আনন্দ বলে, ‘কি?’
‘একটা পোকা।’
‘কি পোকা?’
‘বিষপিঁপড়ে বোধহয়।’
মালতী বলে, ‘একটা বিষপিঁপড়ে তাড়াতে তুমি ওর পায়ে হাত দিলে!–আহা কি করিস আনন্দ, করিস নে পায় হাত দিয়ে প্ৰণাম করিম না। কুমারীর কাউকে প্ৰণাম করতে নেই জানিন নে তুই?’
আনন্দ হেরম্বকে প্রণাম করে বলল, ‘তোমার ওসব অদ্ভুত তান্ত্রিক মত আমি মানি না মা।’
হেরম্বের আশঙ্কা হয় মেয়ের অবাধ্যতায় মালতী হয়তো রেগে আগুন হয়ে উঠবে। কিন্তু তার পরিবর্তে মালতীর দুঃখই উথলে উঠল।
‘আগেই জানি কথা শুনবে না! এ বাড়িতে কেউ আমার কথা শোনে না হেরম্বা। আমি এখানে দুইিটরও অধম। কত গুর বাপ, দেখতে কথা শোনার কি ঘটা মেয়ের! আমি তুচ্ছ মা বৈ তো নই।’
তার এই সকরুণ অভিযোগে হেরম্বের সহানুভূতি জাগে না। আনন্দ মাির অবাধ্য জেনে সে খুশিই হয়ে ওঠে। আনন্দ বাপের দুলালী মেয়ে এ যেন তারই ব্যক্তিগত সৌভাগ্য। আনন্দের সম্বন্ধে প্রথমে তার যে আশঙ্কা জেগেছিল এবং পরে যে আশা করে সে এই আশঙ্কা কমিয়ে এনেছিল, তাদের মধ্যে কোনুটি যে বেশি জোরালো এতক্ষণ হেরম্ব তা বুঝতে পারে নি। অনাথ এবং মালতী এদের মধ্যে কাকে আশ্রয় করে আনন্দ বড় হয়েছে সঠিক না জানা অবধি স্বস্তি পাওয়া হেরম্বের পক্ষে অসম্ভব ছিল। আনন্দের অন্তর অন্ধকার, এর ক্ষীণতম সংশয়টিও হেরম্বের সহ্য হচ্ছিল না। মালতীর আদেশের বিরুদ্ধেও তাকে প্ৰণাম করার মধ্যে তার প্রতি আনন্দের যতটুকু শ্রদ্ধা প্রকাশ পেল, হেরম্ব সেটুকু তাই খেয়াল করারও সময় পেল না। মালতীকে আনন্দ নকল করে নি। শুধু এইটুকুই তার কাছে হয়ে রইল প্রধান! আনন্দের অকারণ ছেলেমানুষ ঔদ্ধত্যে তার এই স্বপ্নের ঘোর কেটে গেছে।
আনন্দকে চোখে দেখে হেরম্বের মনে যে আবেগ ও মোহ প্রথমেই সঞ্চারিত হয়েছিল। এতক্ষণে তার মনের সর্বত্র তা সঞ্চারিত হয়ে তার সমস্ত মনোভাবকে আশ্রয় করেছিল। নিজেকে অকস্মাৎ উচ্ছ্বসিত ও মুগ্ধ অবস্থায় আবিষ্কার করার বিস্ময় অপনোদিত হয়ে গিয়েছিল। তার মন সেই স্তরে উঠে এসেছিল যেখানে আনন্দের অনির্বচনীয় আকর্ষণ চিরন্তন সত্য। আনন্দকে চোখে দেখা ও তার কথা শোনা হেরম্বের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। নেশা জমে এলে যেমন মনে হয় এই নেশার অবস্থাটিই সহজ ও স্বাভাবিক, আনন্দের সান্নিধ্যে নিজের উত্তেজিত অবস্থাটিও হেরম্বের কাছে তেমনি অভ্যস্ত হয়ে এসেছিল। আনন্দ এখন তাকে আবার নতুন করে মুগ্ধ ও বিচলিত করে দিয়েছে। বয়স্ক হেরম্বের মনেও যে লোকটি এক রহস্যময় মায়ালোকবাসী হয়ে আছে নিজেকে সেই অনাথের অনুরক্ত কন্যা বলে ঘোষণা করে আনন্দ তার আবিষ্ট মোহাচ্ছন্ন মনের উন্মাদনা আরো তীব্র আরো গভীর করে দিয়েছে।
প্রেমিকের কাছে প্রেমের অগ্রগতির ইতিহাস নেই। যতদূরই এগিয়ে যাক সেইখান থেকেই আরম্ভ। আগে কিছু ছিল না। ছিল অন্ধকারের সেই নিরন্ধ কুলায়, যেখানে নব জন্মলাভের প্রতীক্ষায় কঠিন আস্তরণের মধ্যে হৃদয় নিষ্পন্দ হয়ে ছিল। হেরম্ব জানে না তার আকুল হৃদয়ের আকুলতা বেড়েছে, এ শুধু বৃদ্ধি, শুধু ঘন হওয়া। আনন্দের অস্তিত্ব এইমাত্র তার কাছে প্রকাশ পেয়েছে, এতক্ষণে ওর সম্বন্ধে সে সচেতন হল। এক মুহূর্ত আগে নয়।
এক মুহূর্ত আগে তার হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হচ্ছিল। কেবল শিরায় শিরায় রক্ত পাঠাবার প্রাত্যহিক প্রীতিহীন প্রয়োজনে। এইমাত্র আনন্দ তার স্পন্দনকে অসংযত করে দিয়েছে।
খানিক পরে মালতী উঠে দাঁড়াল।
আনন্দ বলল, ‘কোথায় যাচ্ছ মা?’
‘গা ধুতে হবে না, আরতি করতে হবে না? সন্ধে হল, সে খেয়াল আছে!’
গোধূলিলগ্নে হেরম্বের কাছে আনন্দকে ফেলে মালতী উঠে চলে গেল।
পৃথিবী জুড়ে নয়, এইখানে সন্ধ্যা নামছে। পৃথিবীর আর এক পিঠে এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সমগ্রভাবে বিস্তৃত চলমান অবিচ্ছিন্ন দিন। এখানে যে রাত্রি আসছে তাকে নিজের দেহ দিয়ে সৃষ্টি করেছে মাটির পৃথিবী। থেকে সূৰ্য যতদূর, মহাশূন্যে রাত্রির বিস্তার তার চেয়েও অনন্তগুণ বেশি। রাক্রির অন্ত নেই। মধ্যরাত্রিকে অবলম্বন করে কল্পনায় যতদূর খুশি চলে যাওয়া যাক, রাক্রির শেষ মিলবে না। পৃথিবীর এক পিঠে যে আলো ধরা পড়ে দিন হয়েছে, অসীম শূন্যের শেষ পর্যন্ত তার অভাব কোথাও মেটে নি।
মালতী চলে গেলে মুখ তুলে আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে হেরম্বের মনে যে কল্পনা দেখা দিয়েছিল, উপরের কথাগুলি তারই ভাষান্তরিত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আনন্দের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এ তার ক্ষণিকের বিশ্রাম মাত্র। মালতীর অন্তরাল সরে যাওয়ায় আনন্দ যে নিজেকে অনাবৃত অসহায় মনে করছে হেরম্বের তা বুঝতে বাকি থাকে নি। চোখের সামনে ধূসর আকাশটি থাকায় আকাশকে উপলক্ষ করেই সে তাই কথা আরম্ভ করল। আকাশ থেকে কথা পৃথিবীতে নামতে নামতে আনন্দ তার লজ্জা ও সঙ্কোচকে জয় করে নেবে।
‘ক’টা তারা উঠেছে বল তো আনন্দ?’
‘ক’টা? একটা দেখতে পাচ্ছি। না, দুটো।’
‘দুটো তারা দেখতে পেলে কি যেন হয়?’
‘কি হয়? তারার মতো চোখের জ্যোতি বাড়ে?’
আনন্দের কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সে একদৃষ্টি তাকিয়ে আছে তার পায়ের নখের দিকে।
অবান্তর কথা বেশিক্ষণ চলে না। আনন্দই প্ৰথমে আলাপকে তাদের স্তরে নামিয়ে আনল।
‘বাবা বললেন, আপনি কলেজে পড়ান। আপনি খুব পড়াশোনা করেন বুঝি?’
‘না। পড়া হল পরের ভাবনা ভাবী। তার চেয়ে নিজের ভাবনা ভাবতেই আমার ভালো লাগে। তুমি বুঝি বাবার কাছে আমার কথা সব জেনে নিয়েছ?’
