আজ শ্যামল আসিবে। কাল মালতী নিজে তাকে আসিতে বলিয়াছে। শ্যামলের সঙ্গে তার সিনেমায় যাওয়ার কথা আছে। বাহিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়ার কথা সে ভাবিতেছে, হঠাৎ তার মনে হইল, এভাবে চলিতে পারে না, এভাবে রাজকুমারকে দূরে সরিয়া যাইতে দেওয়া অন্যায়, তারও অন্যায়, রাজকুমারেরও অন্যায়। চুপ করিয়া ঘরে বসিয়া শুধু উতলা হইলে তার চলিবে না। আজ রাজকুমারকে তার কাছে পাওয়া চাই। শ্যামল যখন আসিল, রাজকুমারের সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়া মালতী সবে রিসিভারটা নামাইয়া রাখিয়াছে।
উৎসাহে শ্যামল অস্থির হইয়া পড়িয়াছিল।
শিগগির তৈরি হয়ে নাও মালতী, দেরি হয়ে গেছে।
আমি যাব না!
কেন? লক্ষ্মী চল। প্লিজ।
কি আশ্চর্য, বলছি তোমার সঙ্গে যাব না, রাজুদার সঙ্গে আমার দরকার আছে, জোর করে। নিয়ে যাবে তুমি আমায়?
জোর করে–?
যাব না–তোমার সঙ্গে কোথাও যাব না কোনোদিন। কেন তুমি আমায় জ্বালাতন কর?
আমি তো কিছুই করি নি মালতী?
কর নি? দিন রাত পেছনে লেগে আছ তুমি আমার, কিছু কর নি? এই যে তাকিয়ে আছ অমন করে, এটা কিছু করা নয়, এই যে তর্ক করছ, এটাও কিছু করা নয়–তুমি কিছুই কর না, বড় ভালো ছেলে তুমি। যেতে বলছি, চলে যাও না? তোমার কি মান অপমান জ্ঞান নেই? এত অপমান। করি, কিছুতেই তোমার অপমান হয় না?
তুমি আমায় কখনো অপমান কর নি!
করি নি? হাজারবার করেছি। অন্য কেউ হলে–?
রাগের মাথায় কখনো দু-চারটে কথা বললে, তাকে অপমান বলে না। আসতে বারণ করে নিজেই আবার আসতে বলেছ।
আমি আসতে বলেছি? ছুতো করে তুমি নিজে এসেছ।
ছুতোগুলি তুমি মেনে নাও নি কেন? বই নিতে এসেছি, বই নিয়ে চলে যেতে দিলেই চুকে যেতঃ দু-চার দিনের বেশি তো আর ছুতো করে আসতে পারতাম না, আপনা থেকে আমার আসা যাওয়া বন্ধ হয়ে যেত। মালতীর সঙ্গে কলহ বাধিলে চিরদিন শ্যামলের কথা জড়াইয়া গিয়াছে, আজ তাকে চাপা গলায় ধীরে ধীরে অপরিচিত ভঙ্গিতে কথা বলিতে শুনিয়া মালতীর হঠাৎ কেমন ভয় করিতে লাগিল। শ্যামল ভয়ানক চটিয়া গিয়াছে। রাগে সে থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। তবু সে এত আস্তে এত স্পষ্টভাবে কথা বলিতেছে কি করিয়া?
থাকগে। ওসব কথা থাক শ্যামল।
না, থাকবে না।
মালতী ভীরু চোখ তুলিয়া শ্যামলের মুখের দিকে তাকায়। শ্যামলের চোখে কি হইয়াছে অমন করিয়া তার দিকে সে তাকায় কেন?
রাজকুমারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর শ্যামলের সম্পর্কে মালতীর মনটা বিগড়াইয়া গিয়াছিল। নিজে সে যাচিয়া রাজকুমারকে জানাইয়া দিয়াছিল, শ্যামলের সঙ্গে তার সিনেমায় যাওয়ার কথা আছে, শ্যামল এখনই তাকে নিতে আসিবে, কিন্তু রাজকুমারের সঙ্গে সে আজ সন্ধ্যাটা কাটাইতে চায়। ভাবিয়াছিল, শ্যামলকে বাতিল করিয়া তার সঙ্গ চায় শুনিয়া রাজকুমার নিশ্চয় খুশি হইবে। খুশি সে হইয়াছিল কিনা ভগবান জানেন, শ্যামলের সঙ্গেই সিনেমায় যাওয়ার জন্য তাকে রাজি করাইতে কত চেষ্টাই যে রাজকুমার করিয়াছিল! শ্যামলের মনে নাকি কষ্ট দেওয়া উচিত নয়, শ্যামল তাকে ভালবাসে। শেষে রাজকুমার বলিয়াছিল, ওকে অন্তত মিষ্টি কথা বলে ফিরিয়ে দাও মালতী, মনে যেন দুঃখ না পায়। আমার কাছে আসছ ওকে জানিয়ে দরকার নেই। ওর সম্বন্ধে আমার ভয় আছে মালতী, মাথাপাগলা ছেলে তো, কখন কি করে বসে। তার সঙ্গে সন্ধ্যা যাপনের জন্য রাজকুমারকে রাজি করাইতে রীতিমতো চেষ্টা করিতে হওয়ায় মালতীর গা জ্বালা করিতেছিল, এসব কথা শুনিতে শুনিতে তার মনে হইয়াছিল শ্যামলের চেয়ে বড় শত্ৰু বুঝি তার নাই। হয়তো ঈর্ষাতে নয়, শ্যামলের মনে কষ্ট দেওয়ার ভয়েই রাজকুমার তাকে এড়াইয়া চলিতে আরম্ভ করিয়াছে, তাকে উপেক্ষা করিতেছে। শ্যামল রাজকুমারের পরিবর্তনের কারণ। তাকে ভালবাসিয়া শ্যামল তার সর্বনাশ করিয়া ছাড়িবে।
মিষ্টি কথার বদলে অতি কড়া ভাষাতেই শ্যামলের সঙ্গে সিনেমায় যাওয়া সে তাই বাতিল করিয়া দিয়াছে। রাজকুমারের সঙ্গে তার দরকার আছে এ কথাটা জানাইয়া দিতেও কসুর করে নাই। এখন শ্যামলের রকম দেখিয়া তার বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করিতে লাগিল। এতক্ষণ বিশ্বাস করে নাই, এবার মনে হইতে লাগিল রাজকুমার হয়তো ঠিক বলিয়াছে, শ্যামল ভয়ানক কিছু করিয়া বসিতে পারে।
শ্যামল বলিতে থাকে–তুমি হয়তো সত্যি আমায় অপমান করেছ, বাদর নাচিয়েছ, আজ তাড়িয়ে দিয়ে কাল আবার ডেকে পাঠিয়ে পোষা কুকুরের মতো খেলা করেছ আমার সঙ্গে। করে থাকলে বেশ করেছ। আমি বোকা, বোকাই থাকতে চাই, আমার যা ইচ্ছা তাই আমি বিশ্বাস করব। তবে তোমাকে আর জ্বালাতন করব না মালতী, প্রতিজ্ঞা করছি। তুমি আর টেরও পাবে না শ্যামল বলে কেউ এ জগতে আছে। সত্যি বলছি মালতী, কাল থেকে তুমি ধরে নিতে পারবে, আমি বেঁচে নেই।
তার মানে? এসব কি বলছ? কি করবে তুমি? শক্ত করিয়া শ্যামলের কজি চাপিয়া ধরিয়া বিস্ফারিত চোখে তার পাংশু মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে মালতী শিহরিয়া উঠিল, এই সব উদ্ভট মতলব জাগছে তোমার মাথায়। আমি আগেই জানতাম তুমি একটা ভীষণ কাণ্ড না করে থামবে না। তোমার মতো যারা ছেলেমানুষ হয়, চিরকাল তারাই লেকে ড়ুবে, সায়ানাইড খেয়ে জগতের ওপর শোধ নেয়–তোমার মতো যারা ভীরু আর কাপুরুষ!
আরো জোরে মালতী শ্যামলের হাত চাপিয়া ধরিয়া রাখিয়াছিল, ছাড়িয়া দিলেই সে যেন সঙ্গে সঙ্গে লেকে গিয়া ড়ুব দিবে অথবা কলেজের ল্যাবরেটরিতে গিয়া সায়ানাইড গিলিবে তোমায় একটা কথা বলি, মন দিয়ে শোন। এই যে মতলব তুমি করেছ—আগে শুনে নাও আমার কথা—এর মানে তো এই যে আমি অন্যের হয়ে যাব, তুমি তা সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারবে না? আমার। জন্যই মরবে তো তুমি? কিন্তু তুমি কি ভেবে দেখছ, আমাকেও তুমি কি ভাবে মেরে রেখে যাবে, এক মুহুর্তের জন্য আমি শান্তি পাব না? আমি কি করে বাঁচব বল তো? আমায় ভালবাস বলে তোমায় মরতে হবে আমাকে শাস্তি দিয়ে। একে ভালবাসা বলে নাকি? আমায় পেলে না বলে মরতে পারবে, আমার সুখের জন্য বেঁচে থাকার কষ্ট তুমি সহ্য করতে পারবে না!
