–আমার বাবা-মা কোথায় পুষ্প?
–এখনই আসবেন। অসুখের সময় তোমার মা আর আমি তোমার শিয়রে বসে থাকতাম। তাঁরা অন্য জায়গায় থাকেন। পৃথিবী থেকে তোমাকে আনতে যাচ্ছিলেন কিন্তু সন্তানের মরণের দৃশ্য তাঁদের। দেখতে কষ্ট হবে ভেবে আমিই তাঁদের যেতে বারণ করি। তোমার পৃথিবীর দেহটা বড্ড খারাপ দেখতে হয়ে গিয়েছিল মরণের আগে– মা গো, ভাবলে ভয় করে।
যতীন বল্লে–আর তোমাদের দেখলে আমার ভয় হচ্চে না? তোমরা যে ভূত, সেটা খেয়াল আছে?
পুষ্প বল্লে–সে তো তুমিও।
যতীন বল্লে–এদেশে আর সব লোক গেল কোথায় পুষ্প? এখানে। কি তুমি আর আমি দুটি প্রাণী? তোমার বাবা-মা কোথায়?
পুষ্প হেসে বল্লে–এটা তৃতীয় স্তরের ওপরের অঞ্চল। তুমি জীবনে। অনেক কষ্ট পেয়েচ বলে এখানে আসতে পেরেচ–আর এসেচ আমি এখানে তোমায় ডেকেচি, ভগবানের কাছে কত প্রার্থনা করেচি তোমার দুঃখের দিনের অবসানের জন্যে। সে সব কথা তুমি কি জানো? নইলে সাধারণ লোক মরার পরে এ জায়গায় আসতে পারে না। আমার বাবা এখনও মরেন নি, খুব বুড়ো হয়েচেন, কালনায় আছেন, আমাদের দেশে। মা অনেক বছর স্বর্গে এসেছেন বটে, কিন্তু তিনি অন্য জায়গায়। আছেন। এ স্তরের নিয়ম এই যে তুমি যদি ইচ্ছে করো তুমি কাউকে দেখতে পাবে না, কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না। তুমি আমি এখন। নির্জনে খানিকটা থাকতে চাই–কতকাল তোমায় দেখিনি, তোমার সঙ্গে কথা বলিনি–আমি চাইনে যে এখানে এখন কেউ আসে।
কথা শেষ করে পুষ্প একদৃষ্টে গঙ্গার দিকে চেয়ে কি যেন দেখলে। তারপর বল্লে–চলো তোমায় পৃথিবীতে একবার নিয়ে যাই। তোমার মৃতদেহটা শ্মশানে দাহ করচে। তোমার দেখা দরকার।
পুষ্প যতীনের হাত ধরলে, পরক্ষণেই স্বর্গ গেল মিলিয়ে। তাদের গ্রামের শ্মশানে যতীন দেখলে সে আর পুষ্প দাঁড়িয়ে আছে। চিতার। ধূম জিউলি গাছটার মাথা পর্যন্ত ঠেলে উঠেছে।
যতীন হেসে বল্লে–দেখছিস্ পুষ্প, পুণ্যাত্মার চিতার ধোঁয়া কতদূর উঠেছে।
পুষ্প বল্লে–আমি না থাকলে পুণ্যাত্মগিরি বেয়িয়ে যেতো।
তাদের পাড়ার ছেলে-ছোঁকরার দল মৃতদেহ এনেচে। বুড়োদের মধ্যে এসেছেন নবীন বাঁড়য্যে। তিনিই মুখাগ্নি করচেন। সকলেই আশালতাকে কি করে খবরটা দেওয়া যায় সেই আলোচনা করছে।
যতীন হঠাৎ বলে উঠলো–পুষ্প, আশালতাকে একবার দেখবো। নিয়ে যাবি? ওর বড় সর্বনাশ করে গেলাম, ওর জন্যে ভারি মন কেমন করচে।
পুষ্প বল্লে–ভাবো যে তুমি আশালতাদের বাড়ী গিয়েচ। বেশ মনকে শক্ত করে ভাবো।
আশালতা স্বামীর মৃত্যু-সংবাদ কিছুই জানে না, সে দুপুরে খাওয়ার পরে আঁচল পেতে ঘুমুচ্ছে। তাকে সে অবস্থায় নিশ্চিন্ত মনে মাটির ওপর ঘুমুতে দেখে দুঃখে ও সহানুভূতিতে যতীনের মন পূর্ণ হয়ে গেল। আহা, হিন্দুর মেয়ে, স্বামী অভাবে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দুটিকে নিয়ে কি অসহায় অবস্থাতেই পড়লো! আজ হয়তো বুঝতে পারবে না–কিন্তু একদিন বুঝতেই হবে। মায়ের পাশে ছোট মেয়েটি ঘুমুচ্ছিল, খোকা পাড়ায় কোথায় খেলতে গিয়েছে। এই বয়সে পিতৃহীন হোল– সত্যি, কি দুর্ভাগা ওরা!
পুষ্প ওসব ভাবনা যতীনকে ভাবতে দিলে না। বল্লে–চলো যাই, পৃথিবীতে বেশিক্ষণ থাকা নিয়ম না।
আশালতাকে আঁচল পেতে মাটিতে ঘুমুতে দেখে পৰ্য্যন্ত যতীন যেন কেমন হয়ে গিয়েছিল। তার আদৌ ইচ্ছা নেই স্বর্গে যেতে। তার মন আর কোথাও যেতে চায় না। পুষ্প বল্লে–যতীনদা, তুমি এত ভালবাসো আশাকে! ওর মত হতভাগিনী মেয়েও দেখিনি, ও তোমাকে বুঝলো না। সত্যি কষ্ট হয় ওর জন্যে, কিন্তু তুমি এখানে থেকে ওর কোনো সাহায্য করতে পারবে না। চলো যাই।
গতির বেগে পৃথিবীটা কোথায় মিলিয়ে গেল। শুধু মেঘ–সাদা মেঘ চারদিকে। ওদের পায়ের তলায় বহুদূরে কোথায় অভাগিনী আশালতা মেঝেতে আঁচল পেতে নিশ্চিন্তমনে ঘুমুতে লাগলো।
যতীন বাড়ী ফিরে এসে দেখলে একটি মহিলা তার জন্যে অপেক্ষা করছেন। প্রথমে দূর থেকে তার মনে হোল এঁকে কোথায় সে দেখেচে কিন্তু মহিলাটি যখন ছুটে এসে তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন, তখন তার চমক ভাঙলো,
–বাবা মন্টু, বাবা আমার! আমার মানিক!…
যতীন মায়ের পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলে। মায়ের মুখের দিকে চেয়ে সে অবাক হয়ে গেল। বাহান্ন বছর বয়সে তার মায়ের মৃত্যু হয়, কিন্তু এখন তাঁর মুখে বার্ধক্যের চিহ্নমাত্র নেই। তাই বোধহয় সে মাকে চিনতে পারেনি প্রথমটা।
–বাবা কোথায় মা?
যতীন কথা শেষ করে ঘরের দোরের দিকে চাইতেই বাবাকে দেখতে পেলে। পঞ্চাশ বছর বয়সে যতীনের বাবা মারা গিয়েছিলেন–এ চেহারা তত বয়সের নয়। এ দেশে প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ লোক নেই? যতীন বাবাকে প্রণাম করতেই তিনি এগিয়ে এসে ওকে আশীৰ্ব্বাদ করলেন। বল্লেন–তোমার এখনও আসবার বয়েস হয়নি বাবা, আর কিছুদিন থাকলে বিষয়সম্পত্তিগুলোর একটা গতি করতে পারতে। মাখন রায়ের জমিটা কত শখ করে খরিদ করেছিলাম কাছারীর নীলেমে, সেটা রাখতে পারলে না বাবা? আর বেচলে বেচলে ওই শশধর চক্কত্তি ছাড়া আর কি লোক পেলে না?
যতীনের মা বল্লেন–আহা বাছা এল পৃথিবী থেকে এত কষ্ট পেয়ে, তোমার এখন সময় হোল পোড়া বিষয়ের কথা নিয়ে ওকে বকতে? কি হবে বিষয় এখানে? কি কাজে লাগবে মাখন রায়ের জমি এখানে। আমায় বুঝিয়ে বলো তো শুনি?
