–তুমি আমাকে কোনদিন এই ব্যাপারটার কথা বলো নি তো?
–ভূমিকম্পের কথা পৃথিবীতে সবাইকে সবাই বলে বেড়ায়? হয়তো জীবনেই ঘটলো না, নয় তো এসে সব ওলটপালট করে দিয়ে গেল– এও তেমনি। পৃথিবীর বাসনা কামনা আসক্তি যখন মনের মধ্যে বেশি। হয় বা যখন তৃতীয় স্তরের নীচেকার আত্মিক লোকে থাকে–তখনই। ওই আবর্ত বড় বিপজ্জনক। সেইজন্যেই তোমায় বার বার বারণ করতাম। একা আর তোমাকে বেরুতে দেবো না–
–তুমি জানতে পারলে কখন?
–তখুনি। আমি তখন জপে বসেচি–
লজ্জায় পুষ্প নিজেকে হঠাৎ সামলে নিলে, সে জপ-ধ্যান করে লুকিয়ে, যতীনদার সামনে সে মস্ত বড় কোনো যোগিনী সাজতে চায় না।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ–তারপর?
-তারপর তখুনি বুঝলুম, তুমি মাতৃগর্ভে ঢুকে গিয়েচ। সঙ্গে সঙ্গে তোমার তো সব বিস্মৃতি এসে গেল, আমি মরি ছুটোছুটি করে। ছুটি করুণাদেবীর কাছে, আমার গুরুদেবের কাছে ছুটি। করুণাদেবী বল্লেন, মার মনে দুঃখ দিয়ে তোমাকে বাঁচাতে পারবেন না–
যতীন হেসে বল্লে–পৃথিবীতে মরে গেলুম, আর তোমাদের এখানকার ভাষায় বেঁচে গেলুম, এ বেশ মজার কথা বলচো কিন্তু পুষ্প। আরও দুবার এর আগে এমনি বলেচ ‘বেঁচে গেলে যতীনদা’–আরে, মরেই তো গিয়েচি আজ সকালে পৃথিবীতে?
পুষ্প হেসে বল্লে–তারপর শোনো। করুণাদেবী মাকে কাঁদাতে পারবেন না–গুরুদেব বল্লেন–তোমাকে মাতৃগর্ভে দশমাস দশদিন থাকতে হবে–তারপর ভূমিষ্ঠ হতে হবে, তবে তিনি চেষ্টা করবেন–
–কি চেষ্টা করবেন–শিশুহত্যার?
–তোমার অজ্ঞান অন্ধকার কাটেনি দেখচি এখনও–
–না, আমার মনে খটকা লেগেছে। পুষ্প, আমায় তোমাদের ভাষায়–বাঁচিয়ে খুব ভাল করে, কিন্তু ওই মেয়েটির কান্না–আমার মায়ের ওই কান্না
যতীনের চোখে জল এসে পড়লো।
পুষ্প হেসে বল্লে–চলো গুরুদেবের কাছে নিয়ে যাই–এতদিন তোমায় বলিনি তাঁর কথা–তোমার মন আজ ভাল না, চলো আমার। সঙ্গে–
–সে কতদূর?
–পঞ্চম স্বর্গের দ্বিতীয় স্তরে–তোমাকে আবরণ দিয়ে শক্তি দিয়ে নিয়ে যাবো, নইলে তোমার জ্ঞান থাকবে না অত ওপরে। কিছু দেখতেই পাবে না–
যতীন খানিকক্ষণ কি ভাবলে, তারপর বল্লে–বোসো পুষ্প, দেখে আসি মা কি করচেন–
পুষ্প ধমক দিয়ে বল্লে–কে মা? কিসের মা? বৈষ্ণবী মায়ায় ভুলো। না। অনন্ত পথে কত মা, কত বাবা, কত ছেলে, কত স্ত্রী। প্রত্যেকেই অ-বিনাশী আত্মা, প্রত্যেকেই লীলা করচে। চলো–
–না পুষ্প, আমার সত্যিই এখনো তোমার মত জ্ঞান জন্মায় নি। মনে। এখনো মায়া-দয়া মন থেকে একেবারে বিসর্জন দিতে পারিনি। তোমাদের ব্রহ্মজ্ঞান নিয়ে তোমরা থাকো–আমি ওর মধ্যে নেই, সত্যি বলছি। আমাকে যেতেই হবে মাকে দেখতে। আজ সকালে মার সেই বুকফাটা কান্না আমারই জন্যে, সে আমি ছেলে হয়ে কি করে ভুলি?
পুষ্প মৃদু হেসে একটু ধীরভাবে বল্লে–উঃ, কি বাঁধন, তাই দেখচি! মায়ার শক্তি আছে বটে! এড়ানো বল্লেই কি এড়ানো যায়? মানুষকে নিয়ে পৃথিবীর লীলা তা হোলে হয় কি করে!
পরে সে হঠাৎ সুস্বরে গেয়ে উঠলো দুটো মাত্র কলি–
‘এ বাঁধন বিধির সৃজন, মানব কি তায় খুলতে পারে?
কারাগার ভাঙতে কি পারো, ও যে মায়ার পাঁচিল আছে ঘিরে!’
যতীন ব্যঙ্গের সুরে বল্লে–থাক, থাক্, ব্রহ্মবিদ্যে এখন তুলে রেখে। দাও, ওসব, সইবে না ধাতে।
পুষ্প হেসে বল্লে–কেমন গলা, যতীনদা?
–চমৎকার!
–তা এখন মার কাছে না গিয়ে এর পরে যেও।
–আমি একবার দেখে আসি, বোসো।
আবার সেই কোলা-বলরামপুর গ্রাম। বেলা দুপুর। বৃষ্টি থেমেচে, কিন্তু আকাশ মেঘ-মেদুর। সজল বর্ষার বাতাস বইছে, সারারাত্রি বর্ষণের ফলে পথে-ঘাটে জল দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টিসিক্ত লতাঝোঁপের। পত্রপুঞ্জ থেকে টুপটাপ বৃষ্টির জল ঝরে পড়চে এখনও।
রান্নাঘরের দাওয়ায় মেয়েটি খেতে বসেচে। কলাইয়ের দাল, মোচা হেঁচকি আর কাঁচকলা ভাজা। সকালবেলার সেই প্রৌঢ়াও পাশে বসে খাচ্চে। সে খেতে খেতে বল্লে–একটু ডাল দেবো বৌ?
–না, আমি আর কিছু খাবো না মাসী। যা খেয়েচি সকালবেলা, পেট ভরে গিয়েছে–
–ছিঃ, অমন কথা বলতে নেই বৌ, আবার কোলজোড়া ছেলে পাবে, হাতের নোয়া সিঁথের সিঁদুর বজায় থাক।
মেয়েটি ভাত খাওয়া ছেড়ে হাত তুলে বল্লে–কি মুখ চোখের ছিরি, মাসীও যে বাঁচবে না সে আমি জানি–আমার কপালে কি অমন ছেলে বাঁচে। সেবার কিসে কামড়ালো রাত্তিরে, ছেলে ককিয়ে কেঁদে উঠলো, আমি তাড়াতাড়ি টেমি জ্বেলে দেখি ছেলের কাঁথার তলায় এতবড় কাঁকড়া বিছে! সেই রাত্তিরে কাঁটানটের শেকড় বেটে, জলপড়া এনে নাপিতবাড়ী থেকে দিই। আহা, আশ্বিন মাসে একবার এমন কাশি হোল যে বাছা দম আটকে বুঝি যায়–কি যে বল্লে শিব ডাক্তার, হুপিং কাশি না কি–যে ক’দিন ছিল, কষ্টই পেয়ে গিয়েছে বাছা আমার!
প্রৌঢ়া বল্লে–কেঁদো না বৌ, ছিঃ–ভাতের থালা সামনে কাঁদতে নেই দুপুর বেলা। অলক্ষণ।
মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বল্লে–আর আমার লক্ষণ অলক্ষণ সব হয়ে গিয়েচে মাসী–এখন তোমরা বলো আমিও তার সঙ্গে চলে গিয়ে হাড় জুড়ই। আমি কি করে খোকার মুখ না দেখে থাকবো, ও মাসী!
মেয়েটি এবার ডুকরে কেঁদে উঠলো ডাল ভাত মাখা হাত তুলে হাঁটুর ওপর রেখে।
ছিঃ বৌ, ওকি! খাও, খাও, আরে অমন করে না। তুমি তো অবুঝ নও, আবার হবে, এই-স্ত্রী মানুষ, ভাবনা কি? কোল জুড়ে আবার পাবে–
