সাধারণত বিশ্বের এই রাজমার্গগুলিতে আত্মিক পুরুষেরা সর্বদা যাতায়াত করেন, কিন্তু আজ সেখানে কেউ নেই–আরও ওপরে এসে যে স্থান ধূসরবর্ণ আত্মাদিগের অধিষ্ঠানভূমি, সেও জনহীন।
যতীন বুঝতে পারলে না, এরকম ব্যাপারের কারণ কি। আজ এত বছর সে এসেচে আত্মিকলোকের তৃতীয় স্তরে–কিন্তু এমন অবস্থা সে দেখেনি কখন। তাঁর মনে যেন কেমন ভয়ের সঞ্চার হোল। অথচ কিসের ভয় সে নিজেই জানে না। যে একবার মরেচে, সে আর মরবে না, তবে ভয়টা কিসের?
হঠাৎ যতীন দেখলে একটি লোক যেন আতঙ্কে চারিদিকে চাইতে চাইতে ঝড়ের বেগে উড়ে দ্বিতীয় স্তরের আত্মিক লোক থেকে আরো ঊর্ধ্বলোকের দিকে পালাচ্চে। পৃথিবী হোলে বলা চলতো লোকটা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাচ্চে। ব্যাপার কি? এর নিশ্চয় কোনো গুরুতর কারণ আছে।
যতীন তাঁকে কিছু বলতে গেল, কিন্তু তাঁর পূর্বেই লোকটা অন্তর্হিত হোল–মনে হোল পলায়মান ব্যক্তি যেন হাতের ইঙ্গিতে তাকে কি বল্লে–কি বিষয়ে সাবধান করতে গেল।
লোকটি অদৃশ্য হবার কিছু পরেই যতীনের মনে হোল কী এক ভীষণ টানে তাকে নীচের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অতি ভীষণ সে টানের বেগ, তিমির-প্রসারক যেন কোন্ বিশাল চৌম্বক শক্তি জগব্রহ্মাণ্ড চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তাঁর জাল বিস্তার করেছে–যতীনের সামনে, পাশে, দূরে, চারদিকে ঝড়ের মত কোথা থেকে সেই ভীষণ শক্তির লীলা এক মুহূর্তে ব্যাপ্ত হয়ে গেল। যতীন যেন ভীম আবর্তে তলাতল পাতালের
অভিমুখে কোথায় চলেচে..তার জ্ঞান লোপ পেয়ে আসচে…কেবল। এইটুকু সে লক্ষ্য করলে, শুধু সে নয়, ঝড়ের মুখে তার মত বহু জীবাত্মা কুটোর মত কোথায় চলেছে বিষম ঘূর্ণিপাকের টানে!…তারপর একটা আর্ত চীৎকার স্বর, এক কি বহু সম্মিলিত কণ্ঠের আর্তনাদ, যতীন ঠিক বুঝতে পারছে না, তার সংজ্ঞা নেই, অতিপ্রাকৃত কী এক বিষম শক্তির আমোঘ আকর্ষণ তাকে খেলার পতুলে পরিণত করেছে।
ভয়ানক অন্ধকার তার চারিদিকে, এই কি তলাতল পাতাল? পৃথিবী কোথায়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, চন্দ্র সূৰ্য্য কোথায়, পুষ্প কোথায়? করুণাদেবী কোথায়, হতভাগিনী আশা কোথায়–সব লুপ্ত, একেবারে! কোন্ রসাতলে সে চলেচে দুর্লঙ্ঘ্য আকর্ষণে।
অনেকক্ষণ…অনেক যুগ যেন কেটে গিয়েছে…জ্ঞান নেই যতীনের। অন্ধকার ছাড়া আর কোনদিকে কিছু নেই। বহুদিন সে কী এক গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিল। সব অন্ধকার…বিস্মৃতি…
পুষ্পের ডাকে তার চৈতন্য হোল। পুষ্প তাকে ডাকচে, ও যতীনদা, যতীনদা, বেরিয়ে এসো।
পুষ্প ও আর একজন তাকে প্রাণপণে ডাক দিচ্চে, যেন কতদূর থেকে…
যতীন বলে উঠলো–অ্যাঁ!
–শীগগির চলে এসো–ওঁ কৃষ্ণ, ওঁ কৃষ্ণ নাম উচ্চারণ করো–ওঁ কৃষ্ণ, ওঁ কৃষ্ণ, ওঁ কৃষ্ণ–
পুষ্প, পুষ্প ডাকচে!
যতীনের জ্ঞান একটু একটু ফিরে এসেচে–এ কোন্ স্থান।
কে যেন ওর হাত ধরলে এসে। পুষ্পের কণ্ঠস্বর ওর কানে গেল আবার। পুষ্প যেন কাকে বলচে–এবার যতীনদা বেঁচে গেল। তবে এখনও ঠিক জ্ঞান হয়নি–
আবার আত্মিকলোকের নির্মল বায়ুস্তরে ওর নিশ্বাসপ্রশ্বাস সহজ ও আনন্দময় হয়ে আসছে। যতীন জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখলে, সামনে। পুষ্প ও পুষ্পের মা। সে বিস্ময়ে ওদের দিকে চেয়ে বল্লে–কি হয়েছিল। বল তো? এ কি কাণ্ড! এমন তো কখনো–
তারপর সে চারিদিকে চেয়ে দেখে আরও অবাক হয়ে গেল। সে পৃথিবীর এক গরীব গৃহস্থের পুরোনো কোঠাঘরের মধ্যে। পৃথিবীতে রাত্রিকাল, সম্ভবত গভীর রাত্রি। বর্ষাকাল, বাইরে ঘোর অন্ধকার, টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে বাড়ীর পেছনের বাঁশবনে। ঘরের এক কোণে কিছু পেতল কাঁসার বাসন একটা জলচৌকির ওপরে, একটা পুরোনো তক্তপোশ, দুতিনটি বস্তা–একটার ওপর আর একটা সাজানো-সম্ভবত ধান। ঘরের মেঝের একপাশে একটা জলের বালতি, ওদের ঠিক সামনে মেঝের ওপর মলিন কাঁথা পাতা একটা বিছানার একপাশে ছোট ছোট বালিশ পাতা–আর একটা ছোট বিছানা, কিন্তু সে ছোট বিছানাটা খালি। আর বিছানার সামনে মেঝের ওপরেই মলিন শাড়ী পরনে একটি মেয়ে বসে অঝোরে কাঁদচে, মেয়েটির কোলে একটি মৃত শিশু, সম্ভবত ছ’সাত মাসের। ঘরের দরজার কাছে একটা পুরোনো হ্যারিকেন লন্ঠনে বোধ হয় লাল তেল জ্বলচে, কারণ আলোর চেয়ে ধোঁয়া বেশি হয়ে লণ্ঠনের কাঁচের একটা দিক কালো করে ফেলেচে। ঘরের মধ্যে আরও দুতিনটি মেয়ে ও পুরুষমানুষ সবাই ক্রন্দনরতা মেয়েটিকে ঘিরে নিঃশব্দে বসে।
মেয়েটি কাঁদছে আর বিলাপ করচেও আমার ধনমণি, ও আমার সোনা, হাসো, দেয়ালা করো, আমার মানিক, চোখ চাও–আমার কোল খালি করে পালিও না আমার সোনা–কোথায় যাবা আমায় ফেলে?
যতীন বিস্ময়ের দৃষ্টিতে পুষ্পের ও পুষ্পের মার দিকে চেয়ে বল্লে–এ সব কি ব্যাপার! এরা কারা? আমি কোথায়?
মেয়েটি একমনে বিলাপ করেই চলেচে কোলের মৃত শিশুর দিকে চোখ রেখে।
–কাল থেকে তুমি একবারও মাইএ মুখ দ্যাওনি যে বাবা আমার! মাই খাবা? মায়ের মাইএ মুখ দেবা না, ও মানিক আমার? আর মুখ দেবা না? চোখ চাও দিনি–
মেয়েটির আকুল ক্রন্দনে যতীনের মনের মধ্যে এক অদ্ভুত ধরনের চঞ্চলতা দেখা দিল, পরের কান্না শুনে এমন কখনো তার হয়নি সম্পূর্ণ অননুভূত কোন্ অনুভূতিতে ওর চোখে জল এসে পড়লো।
পুষ্প বল্লে–চলে এস যতীন দা, চলো সব বলছি। তুমি পুনর্জন্মের টানে পড়ে পৃথিবীতে জন্মেছিলে আজ ছ’সাত মাস। ওই তোমার মা। আজ আবার দেহ থেকে মুক্তি পেলে। ওই মৃত শিশুই তুমি কি বিপদেই ফেলেছিলে আমাদের।
