যতীন বল্লে–আচ্ছা এই খড়ের ঘরটা–
এবার উত্তর দিলে পুষ্প। বল্লে–বুঝলে না? ওর আসল পৃথিবীর ঘরখানা কোন্ কালে পড়ে ভূমিসাৎ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই ঘরখানার ছবি ওর মনে তো আছে–ওর চিন্তা সেই ছবির সাহায্যে ঘরটা গড়েচে যেমন আমার তৈরী গঙ্গা আর কেওটার বুড়োশিবতলার ঘাট। এ লোকে তো ও তৈরী করা কঠিন নয়। অনেক সময় আপনা-আপনি হয়।
দেবী বল্লেন–পুষ্পকে আর আমাকে ও তো দেখতে পাবেই না। যতীন এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াও তো ওর সামনে!
সন্ধ্যা হয়ে গেল। জঙ্গলের মধ্যে ঘন অন্ধকারে ঝোঁপঝাড়ে জোনাকি পোকা জ্বলে উঠলো। যতীন গিয়ে বুড়োর সামনে দাঁড়ালো, কিন্তু তার ফল হলো উল্টো। বৃদ্ধ ওকে হঠাৎ দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে চীৎকার করে উঠলো এবং ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে লাগলো। দেবী বল্লেন, ও তোমাকে দেখতে পেয়েছে, কিন্তু ভাবচে তুমি ভূত।
পুষ্প ভাবলে, কি মজার কাণ্ড দ্যাখো! ভূত হয়ে ভূতের ভয় করছে!
দেবী বল্লেন–ওর সঙ্গে কথা বলো–
যতীন বল্লে–ভয় কি বুড়োকৰ্ত্তা! ভয় পাচ্ছ কেন?
বৃদ্ধ ভয়ে কাঁপছে আর রাম রাম বলচে। যতীনের হাসি পেল কিন্তু দেবী সামনে রয়েছেন বলে সে অতি কষ্টে চেপে গেল।
যতীন আবার বল্লে–বুড়োকর্তা, ভয় কিসের, তুমি এখানে একলা আছ কেন?
এবার বোধহয় বৃদ্ধের কিছু সাহস হোল। সে বল্লে–আজ্ঞে কর্তা আপনি কে?
–আমার এখানেই বাড়ী। কাছেই থাকি। তুমি কতদিন এখানে। আছ? একলা থাকো কেন? তোমার কেউ নেই?
বৃদ্ধ এইবার একটু ভিজল। বল্লে–বাবু, আপনি পুলিশের লোক নয়? আমায় ধরিয়ে দেবেন না?
যতীন বল্লে না, কেন ধরিয়ে দেবো? কি করেছ তুমি? তা ছাড়া তোমার যা অবস্থা তাতে পুলিশে তোমাকে এখন আর কিছু করতে পারবে না।
বৃদ্ধ উৎকণ্ঠিত সুরে বল্লে–কি হয়েছে বলুন তো বাবু আমার? আপনি কি ডাক্তার? সত্যি বাবু, আমিও বুঝতে পারিনে যে আমার এ কি হোল। একবার অনেককাল আগে আমার শক্ত অসুখ হয়– তারপর অসুখ সেরে গেল, কিন্তু সেই থেকে আমার কি হয়েছে আমার কথা কেউ শুনতে পায় না, লোককে ডেকে দেখেছি আমার ডাক না। শুনে তারা চলে যায়। মামুদপুরের হাটে যাই, কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে না। আমার শরীরে যেন খিদে তেষ্টা চলে গিয়েছে। আগে আগে। ভাত খেতাম, এখন খিদে হয় না বলে বহুঁকাল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। শরীরটা কেমন হালকা মনে হয়, যেন তুলোর মত হালকা–মনে হয়, যেন আকাশে উড়ে যাবো। তেষ্টা নেই শরীরে। আর একটা জিনিস বাবু, কোনো কিছুতে হাত দিলে আগের মত আর আঁকড়ে ধরতে পারিনে। হাত গলিয়ে চলে যায়। এ কি রকম রোগ বাবুমশাই? পুলিশের ভয়ে কোথাও যেতে পারি নে, নইলে নলদীর সরকারী ডাক্তারখানায় গিয়ে একবার ডাক্তারবাবুকে দেখাবো ভেবেছিলাম।
যতীন বল্লে–বলছি সব কথা। কিন্তু পুলিশের ভয় কর কেন? কি করেছিলে?
বৃদ্ধ সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে বল্লে–কেন বাবু?
-বল না। আমি কাউকে বলবো না। আমার অবস্থা বুঝতে পারচ? আমিও তোমার দলের একজন। আমিও মানুষজনের সঙ্গে মিশতে পারিনে।
কথাটার মধ্যে দুরকম অর্থ ছিল। বৃদ্ধ সোজাটাই বুঝলে। বুঝে বল্লে আপনার নামেও গ্রেপ্তারী পরোয়ানা আছে না কি বাবু? কি করেছিলেন আপনি?
–আমি আমার স্ত্রীকে খেতে দিতাম না। বাপের বাড়ী ফেলে রেখেছিলাম। তার সঙ্গে আমার ঝগড়া হোত প্রায়ই। তারপর একদিন
বৃদ্ধ বল্লে–বাবু মশাই, আপনি পুলিশের লোক। আমি বুঝতে পেরেচি। আপনি সব জানেন দেখচি। তা ধরুন আমায়, আমার যে রোগ হয়েচে, বোধহয় বেশিদিন বাঁচবো না। এ রকম জ্যান্ত মরা হয়ে থাকার চেয়ে ফাঁসি যাই যাবো। এতদিনে আমার ভুল বুঝতে পেরেচি বাবু মশাই। আমার বৌ-এর কোনো দোষ ছিল না, সতীলক্ষ্মী ছিল সে। আমার মনে মিথ্যে ধুবুক ছিল কালীগয়লার ছোট ভাইটার সঙ্গে বড় হাসিঠাট্টা করতো। বারণও করে দেলাম অনেকবার, তাও শুনতো না। তাই একদিন রাগের মাথায়–কিন্তু দোহাই দরোগা বাবু, খুন করবো বলে মারিনি। মাঠ থেকে সবে এসে দিইচি বাড়ীতে দেখি কালীগয়লার ভাই ছিচরণ খিড়কী দোর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে; চাষার রাগ-বল্লাম–ও কেন বাড়ীর মধ্যে ঢুকেছিল; বউ উত্তর দেবার আগেই রাগের মাথায় তার মাথায় এক ঘা–
বৃদ্ধ হঠাৎ কেঁদে ফেললে। বল্লে–তারপর আমি সব বুঝতে পেরেছিলাম দারোগাবাবু। ছিচরণকে বউ ভাই-এর মত দেখতো। ছিচরণ হাসির গল্প বলতে পারতো, বউ তাই শুনতে ভালবাসতো। বৌ-এর কোন দোষ ছিল না। সেই পাপের ফলে আজ আমার এই ভয়ানক রোগ জন্মেচে শরীরে। আর আমার জীবনে মায়া নেই, সৰ্ব্বদা। বউড়ার কথা ভাবি আজকাল। অনেকদিন থেকেই ভাবি। একা একা এই জঙ্গলে এই রোগ নিয়ে আর কাটাতে পারিনে, দারোগাবাবু। জেলে গেলে তবুও পাঁচটা মানুষের সঙ্গে কথা বলে বাঁচবো।
দেবী বল্লেন–ওকে জিজ্ঞেস কর, ওকি বৌ-এর সঙ্গে দেখা করতে চায়?
যতীন বৃদ্ধকে কথাটা জিজ্ঞেস্ করতেই সে অবাক হয়ে ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে বল্লে–তবে কি বাবু বৌ হাসপাতালে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিল?
যতীন বল্লে–তা নয়, তুমিও আর বেঁচে নেই। তুমিও মরে গিয়ে, তোমার বৌও মরে গিয়েছে। আমিও মরে গিয়েছি। সবাই আমরা পরলোকে আছি এখন। তোমাকে উদ্ধার করতে আরও দু’জন দেবী এখানে এসেছেন, তুমি তাদের দেখতে পাচ্চ না। এখানেই তাঁরা আছেন। তোমার এ অবস্থা দেখে তাঁদের দয়া হয়েছে। এবার তোমার ভাবনা নেই, তোমার স্ত্রীর সঙ্গেও আমরা দেখা করিয়ে দেব।
