যতীন দেখলে পুষ্প কাঁদচে…ও নীরবে পুষ্পের হাতে হাত দিয়ে তাকে নিজের কাছে সস্নেহে নিয়ে এল…
তারপর কখন সে অপূৰ্ব্ব সঙ্গীত থেমে গিয়েছে, বিচিত্ররূপী জ্যোতির্ময় জীবেরা মহাশূন্যে অদৃশ্য হয়ে গিয়েচেন…কখন জ্যোৎস্নার আলোতে সারা দেশ ভরে গিয়েচে যতীনের খেয়াল নেই…জ্যোৎস্না, জ্যোৎস্না…বহু পূর্ণিমার সম্মিলিত জ্যোৎস্নালোক চারিদিকে.. যতীন বল্লে–পুষ্প, চল ওঠো।
১১. ওরা কিছু দূরে মাত্র এসেচে
ওরা কিছু দূরে মাত্র এসেচে–এক জায়গায় দেখলে মাটির বুকে যেন চাঁদ খসে পড়েছে!
দুজনে কাছে গিয়ে দেখলে, পরমরূপসী এক দেবী ঘাসের ওপর। বসে হাপুস নয়নে কাঁদছেন। ওরা অবাক হয়ে গেল। এত উচ্চস্তরের দেবীর দুঃখ কিসের?
যতীন জিজ্ঞেস্ করলে–মা, আপনার কোনো সাহায্য করতে পারি?
দেবী ওদের দিকে চাইলেন। যতীনের মনে হোল দেবী কি সাধে হয়? এত রূপ এত জ্যোতি এত মহিমা–অথচ কি মমতা, করুণা, দীনতায় ভরা দৃষ্টি!
বল্লেন–পারবে?
দুজনেই বলে উঠলো–হুঁকুম করুন, আপনার আশীর্বাদে পারবো।
দেবী বল্লেন–কল্পপৰ্ব্বত থেকে ফিরচো? তোমরা কোথায় থাকো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমরা এর নীচের স্বর্গে থাকি, তৃতীয় স্তরে।
–কি মধুর সঙ্গীত! শুনলে?
যতীন বল্লে–শুনলাম, মা। আমি বেশীদিন পৃথিবী ছেড়ে আসিনি। এই ব্যাপারটা কি আমায় একটু বলবেন দয়া করে?
দেবী বল্লেন–বলবো এর পরে। এখন বলি শোনো। আমি থাকি অন্য নক্ষত্রলোকে। পৃথিবীর এক জায়গায় মানুষের ভয়ানক কষ্ট। আমি সে দেশে জন্মেছিলুম হাজার হাজার বছর আগে। তাদের দুঃখে, আর আজ কল্পপৰ্ব্বতের সঙ্গীত শুনে, আমার মন বড় ব্যাকুল হয়েছে। চলো যাই পৃথিবীতে, দেখি কি করা যায় কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে আমি এতকাল আগে পৃথিবী থেকে চলে এসেছি, জড় জগতের সঙ্গে সম্পর্ক এতকাল হারিয়েছি যে, সরাসরি ভাবে কোনো কাজই সে জগতে করতে পারি নে। মধ্যবর্তী স্তরের আত্মার সাহায্য ভিন্ন আমি পৃথিবীতে গিয়ে কি করবো? তোমরা যদি যাও–
ওরা বলে উঠলো, নিশ্চয়ই যাবো মা!
দেবী বল্লেন–একটু অপেক্ষা কর। আমার এক সঙ্গী আছেন– তিনি আমার লোকেই থাকেন, উচ্চ স্তরের জীব, পৃথিবীতে গিয়ে শুধু আঁকুপাঁকু করেন, কিছু করতে পারেন না কাজে। পৃথিবীর জড়স্তরে আমরা সংস্পর্শ স্থাপন করতে পারি নে। তিনি প্রাচীন যুগের একজন বড় কবি ছিলেন। তাঁকে নিয়ে যাই চলো। এসো আমার সঙ্গে।
আবার নীল শূন্যে যাত্রা।…বহু দূরে একটা ক্ষীণ নক্ষত্র জ্বলছিল। দেবী সেই নক্ষত্র লক্ষ্য করে চললেন। পরক্ষণেই এক সুন্দর উপবন। এক ক্ষুদ্র নদী বয়ে যাচ্ছে উপবনের মধ্য দিয়ে–লতাপাতা কিন্তু পৃথিবীর মত শ্যামল–পৃথিবীরই যেন এক শান্ত প্রাচীনকালীন তপোবন। মৃগকুল নির্ভয়ে খেলা করে বেড়াচ্চে, লতায় লতায় বিচিত্র বন্য পুষ্প প্রস্ফুটিত। এক সৌম্যমূৰ্ত্তি জ্যোতির্ময় আত্মা লতাবিতানে বসে কি যেন লিখচেন। দেবী ওদের নিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড় করালেন। মুখ তুলে চাইতেই যতীন ও পুষ্প এগিয়ে গিয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলে।
দেবী বল্লেন–কল্পপৰ্ব্বতের পথে এদের সঙ্গে দেখা। পৃথিবীতে নিয়ে যাবো তাই সঙ্গে করে আনলাম।
যতীন ও পুষ্পের দিকে চেয়ে দেবী বল্লেন–রামায়ণ-রচয়িতা কবি বাল্মীকি তোমাদের সামনে।
ওরা দুজনেই চমকে উঠলো। মহাকবি বাল্মীকি!
দেবতা স্মিতহাস্যে ওদের বসতে বল্লেন। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বল্লেন–এই আমার আশ্রম। ওই পাশেই তমসা নদী। ওই আমার গৃহ। পৃথিবীতে যা আমার প্রিয় ছিল এখানে তাই সৃষ্টি করেচি, ওই আমার স্বর্গ। আর তোমাদের সামনে ইনি আমার মানসদুহিতা-সীতা, যিনি তোমাদের সঙ্গে করে এনেছেন।
পুষ্প, যতীন বিস্মিত, স্তব্ধ। ভারতবর্ষের ছেলেমেয়ে তারা। সীতার নামে ওদের সৰ্ব্ব শরীরে বিদ্যুতের ঢেউ বয়ে গেল। কত যুগ ধরে ভারতের আকাশ বাতাস যে পুণ্য নামে মুখরিত, সেখানকার বনের পাখীও যে নামে গান গায়, সেই ভগবতী দেবী জানকী তাদের সম্মুখে! এ কি স্বপ্ন, না মায়া, না মতিভ্রম?
বাল্মীকি বল্লেন–তোমরা বিস্মিত হয়েচ। বোধ হয় এ লোকে বেশী দিন আসনি। সীতাকে আমি সৃষ্টি করেচি। যা ছিলেন পৃথিবীতে আমার কল্পনার মধ্যে–এ লোকে তা মূর্তিমতী হয়েচেন।
যতীন বল্লে–বুঝতে পারলাম না, দেব।
–এ লোকে চিন্তার দ্বারা জীবের সৃষ্টি করা যায়। শুধু যে বাড়ীঘর করা যায় তাই নয়, স্থানের ও সময়েরও সৃষ্টি করা যায়। আমাদের। আশ্রমের সময় কি দেখছো?
–আজ্ঞে, সন্ধ্যা গোধূলি।
–আমার সময় সন্ধ্যা গোধূলি। আমি ভালবাসি গোধূলি। আমার কল্পনা এই সময় জাগ্রত হয়। তাই আমার আশ্রমে সব সময় গোধূলি।
–আচ্ছা দেব, শ্রীরামচন্দ্র তবে কোথায়?
–সীতাকে যত আন্তরিক আগ্রহ নিয়ে সৃষ্টি করেছিলাম, রামচন্দ্রকে তত সহানুভূতি নিয়ে গড়িনি। তাই আমার স্বর্গে আমার প্রিয়তম সৃষ্টি সীতাই আছেন, রামচন্দ্র নেই। লক্ষণ নেই, ভরত নেই, কেউ নেই।
–তবে কি, দেব, সীতা বা রামচন্দ্র সত্যি সত্যি কেউ ছিলেন না?
–হয়তো ছিলেন। আমি তাঁদের জানি না। আমার কাব্যের রাম, আমার কাব্যের সীতা–আমারই সৃষ্ট জীব। ও প্রায়ই আমার এখানে আসে। নানা কাজে সারা জগৎ ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু আমায় ভোলে না।
করুণাদেবী বল্লেন–বাবা, ওসব এখন রাখো। পৃথিবীতে যাবে?
