গুহামুখ হইতে রশি-দুই দূরে ঝরনার ধারে বনের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় একটি গোঁড়-পরিবার বাস করে। দুখানা খুপরি, একখানা ছোট, একখানা একটু বড়, বনের ডালপালার বেড়া, পাতার ছাউনি। শিলাখণ্ড কুড়াইয়া তাহা দিয়া উনুন তৈয়ারি করিয়াছে আবরণহীন ফাঁকা জায়গায় খুপরির সামনে। বড় একটা বুনো বাদামগাছের ছায়ায় এদের কুটির। বাদামের পাকা পাতা ঝরিয়া পড়িয়া উঠান প্রায় ছাইয়া রাখিয়াছে।
গোঁড়-পরিবারের দুটি মেয়ে আছে, তাদের একটির ষোল-সতের বছর বয়স, অন্যটির বছর চোদ্দ। রং কালো কুচকুচে বটে, কিন্তু মুখশ্রীতে বেশ একটা সরল সৌন্দর্য মাখানো- নিটোল স্বাস্থ্য। মেয়ে দুটি রোজ সকালে দেখি দু-তিনটি মহিষ লইয়া পাহাড়ে চরাইতে যায় আবার সন্ধ্যার পূর্বে ফিরিয়া আসে। আমি তাঁবুতে ফিরিয়া যখন চা খাই, তখন দেখি মেয়ে দুটি আমার তাঁবুর সামনে দিয়া মহিষ লইয়া বাড়ি ফিরিতেছে।
একদিন বড় মেয়েটি রাস্তার উপর দাঁড়াইয়া তার ছোট বোনকে আমার তাঁবুতে পাঠাইয়া দিল। সে আসিয়া বলিল-বাবুজী, সেলাম। বিড়ি আছে? দিদি চাইছে।
-তোমরা বিড়ি খাও?
-আমি খাই নে, দিদি খায়। দাও না বাবুজী একটা, আছে?
– আমার কছে বিড়ি নেই। চুরুট আছে – কিন্তু সে তোমাদের দেব না। বড় কড়া, খেতে পারবে না।
মেয়েটি চলিয়া গেল।
আমি একটু পরে ওদের বাড়ি গেলাম। আমাকে দেখিয়া গৃহকর্তা খুব বিস্মিত হইল- খাতির করিয়া বসাইল। মেয়ে দুটি শালপাতায় ‘ঘাটো’ অর্থাৎ মকাই-সিদ্ধ ঢালিয়া নুন দিয়া খাইতে বসিয়াছে। সম্পূর্ণরূপে নিরূপকরণ মকাই-সিদ্ধ। তাদের মা কি একটা জ্বাল দিতেছে উনুনে। দুটি ছোট ছোট বালক-বালিকা খেলা করিতেছে।
গৃহকর্তার বয়স পঞ্চাশের উপর। সুস্থ, সবল চেহারা। আমার প্রশ্নের উত্তরে বলিল তাদের বাড়ি সিউনী জেলাতে। এখানে এই পাহাড়ে মহিষ চরাইবার ঘাস ও পানীয় জল প্রচুর আছে বলিয়া আজ বছরখানেক হইতে এখানে আছে। তা ছাড়া এখানকার জঙ্গলের কাঁটা-বাঁশে ধামা চুপড়ি ও মাথায় দিবার টোকা তৈরি করিবার খুব সুবিধা। শিবরাত্রির সময় অখিলকুচার মেলায় বিক্রি করিয়া দু’পয়সা হয়!
জিজ্ঞাসা করিলাম-এখানে কতদিন থাকবে?
-যতদিন মন যায়, বাবুজী! তবে এ-জায়গাটা বড় ভালো লেগেছে, নইলে এক বছর আমরা কোথাও একটানা থাকি না। এখানে একটা বড় সুবিধা আছে, পাহাড়ের ওপর জঙ্গলে এত আতা ফলে-দু-ঝুড়ি করে গাছপাকা আতা আশ্বিন মাসে আমার মেয়েরা মহিষ চরাতে গিয়ে পেড়ে আনতো-শুধু আতা খেয়ে আমরা মাস-দুই কাটিয়েছি; আতার লোভেই এখানে থাকা। জিজ্ঞেস করুন না ওদের?
বড় মেয়েটি খাইতে খাইতে উজ্জ্বল মুখে বলিল- উঃ একটা জায়গা আছে, ওই পুবদিকের পাহাড়ের কোণের দিকে, কত যে বুনো আতাগাছ, ফল পেকে ফেটে কত মাটিতে পড়ে থাকে, কেউ খায় না। আমরা ঝুড়ি ঝুড়ি তুলে আনতাম।
এমন সময় কে একজন ঘন-বনের দিক হইতে আসিয়া খুপরির সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল- সীতারাম, সীতারাম-জয় সীতারাম-একটু আগুন দিতে পার?
গৃহকর্তা বলিল-আসুন-বাবাজী, বসুন।
দেখিলাম, জটাজূটধারী একজন বৃদ্ধ সাধু। সাধু ইতিমধ্যে আমায় দেখিতে পাইয়া একটু বিস্ময়ের ও বোধ হয় কথঞ্চিৎ ভয়ের সঙ্গে, সঙ্কুচিত হইয়া একপাশে দাঁড়াইয়া ছিল।
আমি বলিলাম-প্রণাম, সাধু বাবাজী-
সাধু আশীর্বাদ করিল বটে, কিন্তু তখনো যেন তাহার ভয় যায় নাই।
তাহাকে সাহস দিবার জন্য বলিলাম-কোথায় থাকা হয় বাবাজীর?
আমার কথার উত্তর দিল গৃহস্বামী। বলিল-বড্ড গজার জঙ্গলের মধ্যে উনি থাকেন, ওই দুই পাহাড় যেখানে মিশেছে, ওই কোণে। অনেক দিন আছেন এখানে।
বৃদ্ধ সাধু ইতিমধ্যে বসিয়া পড়িয়াছে। আমি সাধুর দিকে চাহিয়া বলিলাম-কতদিন এখানে আছেন?
এবার সাধুর ভয় ভাঙ্গিয়াছে, বলিল-আজ পনের-ষোল বছর, বাবুসাহেব।
-একা থাকা হয় তো? বাঘ আছে শুনেছি এখানে, ভয় করে না?
-আর কে থাকবে বাবুসাহেব? পরমাত্মার নাম নিই-ভয়ডর করলে চলবে কেন? আমার বয়স কত বল তো বাবুসাহেব?
ভালো করিয়া লক্ষ্য করিয়া বলিলাম-সত্তর হবে।
সাধু হাসিয়া বলিল-না বাবুসাহেব, নব্বইয়ের উপর হয়েছে। গয়ার কাছে এক জঙ্গলে ছিলাম দশ বছর। তারপর ইজারাদার জঙ্গলের গাছ কাটতে লাগল, ক্রমে সেখানে লোকের বাস হয়ে পড়ল। সেখান থেকে পালিয়ে এলাম। লোকালয়ে থাকতে পারি নে।
-সাধু বাবাজী, এখানে একটা গুহা আছে, তুমি সেখানে থাক না কেন?
-একটা কেন বাবুসাহেব, কত গুহা আছে, এ-পাহাড়ে। আমি ওদিকে যেখানে থাকি সেটাও ঠিক গুহা না হলেও গুহার মতো বটে। মানে তার মাথায় ছাদ ও দু-দিকে দেয়াল আছে-সামনেটা কেবল খোলা।
-কি খাও? ভিক্ষা কর?
-কোথাও বেরুই নে বাবুসাহেব। পরমাত্মা আহার জুটিয়ে দেন। বাঁশের কোঁড় সেদ্ধ খাই, বনে এক রকম কন্দ হয় তা ভারি মিষ্টি, লাল আলুর মতো খেতে, তা খাই। পাকা আমলকী ও আতা এ-জঙ্গলে খুব পাওয়া যায়। আমলকী খুব খাই, রোজ আমলকী খেলে মানুষ হঠাৎ বুড়ো হয় না, যৌবন ধরে রাখা যায় বহুদিন। গাঁয়ের লোক মাঝে মাঝে দর্শন করতে এসে দুধ, ছাতু, ভুরা দিয়ে যায়। চলে যাচ্ছে এই সবে এক রকম করে।
-বাঘ ভালুকের সামনে পড়েছ কখনো?
-কখনো না। তবে ভয়ানক এক জাতের অজগর সাপ দেখেছি এই জঙ্গলে-এক জায়গায় অসাড় হয়ে পড়ে ছিল-তালগাছের মতো মোটা, মিশ্কালো, সবুজ রাঙা আঁজি কাটা গায়ে। চোখ আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলছে। এখনো সেটা এই জঙ্গলেই আছে। তখন সেটা জলের ধারে পড়ে ছিল, বোধ হয় হরিণ ধরবার লোভে। এখনো কোনো গুহাগহ্বরে লুকিয়ে আছে। আচ্ছা যাই বাবুসাহেব, রাত হয়ে গেল।
সাধু আগুন লইয়া চলিয়া গেল। শুনিলাম মাঝে মাঝে সাধুটি এদের এখানে আগুন লইতে আসিয়া কিছুক্ষণ গল্প করিয়া যায়।
