মিস নর্টনকে এ-সব কথা বলবার আমার ইচ্ছে ছিল। অনেকদিন মিস নর্টন আমায় কাছে ডেকে আদর করেছে, আমার কানের পাশের চুল তুলে গিয়ে আমার মুখ দু-হাতের তেলোর মধ্যে নিয়ে কত কি মিষ্টি কথা বলেছে, হয়তো অনেক সময়–তখন বুড়ী মেম ছাড়া ঘরের মধ্যে কেউ ছিল না–অনেকবার ভেবেছি এইবার বলব–কিন্তু বলি-বলি করেও আমার সে গোপন কথা মিস নর্টনকে বলা হয়নি। কথা বলা তো দূরের কথা, আমি সে-সময়ে মিস নর্টনের মুখের দিকে লজ্জায় চাইতে পারতাম না–আমার মুখ লাল হয়ে উঠত, কপাল ঘেমে উঠত…সারা শরীরের সঙ্গে জিবও যেন অবশ হয়ে থাকত…চেষ্টা করেও আমি মুখ দিয়ে কথা বার করতে পারতাম না। অথচ আমার মনে হত এবং এখনো মনে হয় যদি কেউ আমার কথা বোঝে, তবে মিস নর্টনই বুঝবে।
মাস দুই আগে আমাদের বাড়িতে এক নেপালী সন্ন্যাসী এসেছিলেন। পচাং বাগানের বড়বাবু বাবার বন্ধু, তিনি বাবার ঠিকানা দেওয়াতে সন্ন্যাসীটি সোনাদা স্টেশনে যাবার পথে আমাদের বাসায় আসেন। তিনি একবেলা আমাদের এখানে ছিলেন, যাবার সময় বাবা টাকা দিতে গিয়েছিলেন, তিনি নেননি। সন্ন্যাসী আমায় দেখেই কেমন একটু বিস্মিত হলেন, কাছে ডেকে তাঁর পাশে বসালেন, আমার মুখের পানে বার বার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইতে লাগলেন–আমি কেমন একটু অস্বস্তি বোধ করলাম, তখন সেখানে আর কেউ ছিল না। তারপর তিনি আমার হাত দেখলেন, কপাল দেখলেন, ঘাড়ে কি দাগ দেখলেন। দেখা শেষ করে তিনি চুপ করে রইলেন, কিন্তু চলে যাবার সময় বাবাকে নেপালী ভাষায় বললে–তোমার এই ছেলে সুলক্ষণযুক্ত, এ জন্মেছে কোথায়?
বাবা বললেন–এই চা-বাগানেই।
সন্ন্যাসী আর কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিলেন, বাবা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন– ওর হাত কেমন দেখলেন?
সন্ন্যাসী কিছু জবাব দিলেন না, ফিরলেনও না, চলে গেলেন।
আমি কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম। আমি মাঝে মাঝে নির্জনে যে অন্যান্য অদ্ভুত জিনিস দেখি সন্ন্যাসী সে সম্বন্ধেই বলেছিলেন। সে যে আর কেউই বুঝবে না, আমি তা জানতাম। সেই জন্যেই তো আজকাল কাউকে ও-সব কথা বলিওনে।
পচাং চা-বাগানের কেরানীবাবু ছিলেন বাঙালী। তাঁর স্ত্রীকে আমরা মাসীমা বলে ডাকতাম। তিনি তাঁর বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন রংপুরে, সোনাদা স্টেশন থেকে ফিরবার পথে মাসীমা আমাদের বাসায় মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। মা না খাইয়ে তাঁদের ছাড়লেন না, খেতে দেতে বেলা দুপুর গড়িয়ে গেল। আমাদের বাসা থেকে পচাং বাগান তিন মাইল দূরে, ঘন জঙ্গলের মধ্যবর্তী সরু পথ বেয়ে যেতে হয়, মাঝে মাঝে চড়াই উৎরাই। আমি সীতা ও দাদা তাঁদের সঙ্গে এগিয়ে দিতে গেলাম–পচাং পৌঁছতে বেলা তিনটে বাজল। আমরা তখনই চলে আসছিলাম, কিন্তু মাসীমা ছাড়লেন না, তিনি ময়দা মেখে পরোটা ভেজে, চা তৈরি করে আমাদের খাওয়ালেন রাত্রে থাকবার জন্যও অনেক অনুরোধ করলেন, কিন্তু আমাদের ভয় হ’ল বাবাকে না বলে আসা হয়েছে–বাড়ি না ফিরলে বাবা আমাদেরও বকবেন, মাও বকুনি খাবেন। বনজঙ্গলের পথ হ’লেও আরো অনেকবার আমরা মাসীমার এখানে এসেচি। আমি একাই কতবার এসেচি গিয়েচি। আমরা যখন রওনা হই তখন বেলা খুব কম আছে। অন্ধকার এরই মধ্যে নেমে আসছে–আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, ঝড়বৃষ্টির খুব সম্ভাবনা। পচাং বাগান থেকে আধ মাইল যেতেই ঘন জঙ্গল–বড় বড় ওক আর পাইন-আবার উৎরাইয়ের পথে নামলেই জঙ্গল অন্য ধরনের, আরো নিবিড় গাছের ডালে পুরু কম্বলের মত শেওলা ঝুলছে, ঠিক যেন অন্ধকারে অসংখ্য ভূত-প্রেত ডালে নিঃশব্দে দোল খাচ্ছে। সীতা খুশির সুরে বললে– দাদা, যদি আমাদের সামনে ভালুক পড়ে?…হি হি–
সীতার ওপর আমাদের ভারি রাগ হ’ল, সবাই জানে এ পথে ভালুকের ভয় কিন্তু সে কথা ওর মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার কি ছিল? বাহাদুরি দেখাবার বুঝি সময় অসময় নেই?
অন্ধকার ক্রমেই খুব ঘন হয়ে এল, আর খানিকটা গিয়ে সরু পায়ে-চলার পথটা বনের মধ্যে কোথাও হারিয়ে গেল–সঙ্গে সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হল–তেমনি কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। শীতে হাত-পা জমে যাওয়ার উপক্রম হ’ল। গাছের ডালে শেওলা বৃষ্টিতে ভিজে এত ধরনের গন্ধ বার হয় এ আমরা সকলেই জানতাম, কিন্তু সীতা বার বার জোর করে বলতে লাগল ও ভালুকের গায়ের গন্ধ।–দাদা আমাদের আগে আগে যাচ্ছিল, মাঝখানে সীতা, পেছনে আমি–হঠাৎ দাদা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সামনে একটা ঝর্ণা–তার ওপরটায় কাঠের গুঁড়ির পুল ছিল–পুলটা ভেঙে গিয়েছে। সেটার তোড় যেমন বেশী, চওড়াও তেমনি। পার হ’তে সাহস করা যায় না। দাদা বললে–কি হবে জিতু…চল পচাঙে মাসিমার কাছে ফিরে যাই। সীতা বললে–বাবা পিঠের ছাল তুলবে আজ না ফিরে গেলে বাসায়। না দাদা, বাড়িই চলো।
দাদা ভেবে বললে–এক কাজ করতে পারবি? পাকদণ্ডীর পথে ওপরে উঠতে যদি পারিস–ওখান দিয়ে লিন্টন বাগানের রাস্তা। আমি চিনি, ওপরে জঙ্গলও কম। যাবি?
দাদা তা হলে খুব ভীতু তো নয়!
পাকদণ্ডীর সে পথটা তেমনি দুর্গম, সারা পথ শুধু বন জঙ্গল ঠেলে ঠেলে উঠতে হবে, পা একটু পিছলে গেলেই, কি বড় পাথরের চাঁই আলগা হয়ে খসে পড়লে আটশ’ কি হাজার ফুট নীচে পড়ে চুরমার হতে হবে। অবশেষে ঘন বনের বৃষ্টিভেজা পাতা-লতা, পাথরের পাশের ছোট ফার্নের ঝোপ ঠেলে আমরা ওপরে ওঠাই শুরু করলাম–অন্য কোনো উপায় ছিল না। কাপড়-চোপড় মাথার চুল বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেল– রক্ত জমে হাত-পা নীল হয়ে উঠল। পাকদণ্ডীর পথ খুব সরু, দুজন মানুষে কোনোগতিকে পাশাপাশি যেতে পারে, বাঁয়ে হাজার ফুট খাদ, ডাইনে ঈষৎ ঢালু পাহাড়ের দেওয়াল খাড়া উঠেছে তাও হাজার-বারোশ ফুটের কম নয়। বৃষ্টিতে পথ পিছল, কাজেই আমরা ডাইনের দেওয়াল ঘেঁষে-ঘেঁষেই উঠছি। পথ মানুষের কেটে তৈরি করা নয় বলেই হোক, কিংবা এ-পথে যাতায়াত নেই বলেই হোক–ছোটখাটো গাছপালার জঙ্গল খুব বেশী। ডাইনের পাহাড়ের গায়ে বড় গাছের ডালপালাতে সারা পথটা ঝুপসি ক’রে রেখেছে, মাঝে মাঝে সেগুলো এত নিবিড় যে সামনে কি আছে দেখা যায় না।
