হয়তো দুপুরে চা-বাগানের কুলীরা কাজ সেরে সরল গাছের তলায় খেতে বসেচে– বাবা ম্যানেজারের বাংলোতে গিয়েচেন, সীতা ও দাদা ঘুমুচ্ছে–আমি কাউকে না জানিয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে কার্ট রোড ধরে অনেক দূরে চলে যেতাম–আমাদের বাসা থেকে অনেক দূরে উমপ্লাঙের সেই পোড়ো পোস্ট আপিস ছাড়িয়েও চলে যেতাম–পথ ক্রমে যত নীচে নেমেছে, বনজঙ্গল ততই ঘন, ততই অন্ধকার, লতাপাতায় জড়াজড়ি ততই বেশী–বেতের বন, বাঁশের বন শুরু হ’ত–ডালে ডালে পরগাছা ও অর্কিড ততই ঘন, পাখী ডাকত–সেই ধরনের একটা নিস্তব্ধ স্থানে একা গিয়ে বসতাম।
চুপ করে বসে থাকতে থাকতে দেখেছি অনেক দূরে পাহাড়ের ও বনানীর মাথার ওপরে নীলাকাশ বেয়ে যেন আর একটা পথ–আর একটা পাহাড়শ্রেণী–সব যেন মৃদু হলুদ রঙের আলো দিয়ে তৈরি–সে অন্য দেশ, সেখানেও এমনি গাছপালা, এমনি ফুল ফুটে আছে, হলুদ আলোর বিশাল জ্যোতির্ময় পথটা এই পৃথিবীর পর্বতশ্রেণীর ওপর দিয়ে শূন্য ভেদ করে মেঘরাজ্যের ওদিকে কোথায় চলে গিয়েছে–দূরে আর একটা অজানা লোকালয়ে বাড়িঘর, তাদের লোকজনও দেখেচি, তারা আমাদের মত মানুষ না–তাদের মুখ ভাল দেখতে পেতাম না–কিন্তু তারাও আমাদের মত ব্যস্ত, হলুদ রঙের পথটা তাদের যাতায়াতের পথ। ভাল করে চেয়ে চেয়ে দেখেছি সে-সব মেঘ নয়, মেঘের ওপর পাহাড়ী রঙের খেলার ধাঁধা নয়–সে-সব সত্যি, আমাদের এই পৃথিবীর মতই তাদের বাড়িঘর, তাদের অধিবাসী, তাদের বনপর্বত, সত্যি-আমার চোখের ভুল যে নয় এ আমি মনে মনে বুঝতাম, কিন্তু কাউকে বলতে সাহস হ’ত না–মাকে না, এমন কি সীতাকেও না–পাছে তারা হেসে উঠে সব উড়িয়ে দেয়।
এ রকম একবার নয়, কতবার দেখেছি। আগে আগে আমার মনে হত আমি যেমন দেখি, সবাই বোধ হয় ওরকম দেখে। কিন্তু সেবার আমার ভুল ভেঙে যায়। আমি একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম–আচ্ছা মা, পাহাড়ের ওদিকে আকাশের গায়ে ও-সব। কি দেখা যায়?…
মা বললেন–কোথায় রে?
—ওই কার্ট রোডের ধারে বেড়াতে গিয়ে এক জায়গায় বসেছিলাম, তাই দেখলাম আকাশের গায়ে একটা নদী–আমাদের মত ছোট নদী নয়–সে খুব বড়, কত গাছপালা–দেখনি মা?
–দূর পাগলা–ও মেঘ, বিকেলে ওরকম দেখায়।
–না মা, মেঘ নয়, মেঘ আমি চিনিনে? ও আর একটা দেশের মত, তাদের লোকজন পষ্ট দেখেচি যে–তুমি দেখনি কখনও?
–আমার ওসব দেখবার সময় নেই, ঘরের কাজ তাই ঠেলে উঠতে পারিনে, নিতুটার আবার আজ প’ড়ে পা ভেঙে গিয়েচে–আমার মরবার অবসর নেই–ও-সব তুমি দেখগে বাবা।
বুঝলাম মা আমার কথা অবিশ্বাস করলেন। সীতাকেও একবার বলেছিলাম–সে কথাটা বুঝতেই পারলে না। দাদাকে কখনো কিছু বলিনি।
আমার মনে অনেকদিন ধরে এটা একটা গোপন রহস্যের মত ছিল–যেন আমার একটা কি কঠিন রোগ হয়েছে–সেটা যাদের কাছে বলছি, কেউ বুঝতে পারছে না, ধরতে পারছে না, সবাই হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে। এখন আমার সয়ে গিয়েছে। বুঝতে পেরেছি–ও সবাই দেখে না–যারা দেখে, চুপ করে থাকাই তাদের পক্ষে সব চেয়ে ভালো।
আমাদের বাসা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা সব সময়ই চোখে পড়ে। জ্ঞান হয়ে পর্যন্ত দেখে আসছি বহুদূর দিকচক্রবালের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত তুষারমৌলি গিরিচূড়ার সারি–বাগানের চারিধারের পাহাড়শ্রেণীর যেন একটুখানি ওপরে বলে মনে হত-তখনো পর্যন্ত বুঝিনি যে ওগুলো কত উঁচু। কাঞ্চনজঙ্ঘা নামটা অনেকদিন পর্যন্ত জানতাম না, আমাদের চাকর থাপাকে জিজ্ঞেস করলে বলত, ও সিকিমের পাহাড়, সেবার বাবা আমাদের সবাইকে সীতা বাদে দার্জিলিং নিয়ে গিয়েছিলেন বেড়াতে–বাবার পরিচিত এক হিন্দুস্থানী চায়ের এজেন্ট ওখানে থাকে, তার বাসায় গিয়ে দু-দিন আমরা মহা আদর-যত্নে কাটিয়েছিলাম–তখন বাবার মুখে প্রথম শুনবার সুযোগ হল যে ওর নাম কাঞ্চনজঙ্ঘা। সীতার সেবার যাওয়া হয়নি, ওকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বাবা বাজার থেকে ওর জন্যে রঙীন গার্টার, উল আর উল বুনবার কাঁটা কিনে এনেছিলেন।
এই কাঞ্চনজঙ্ঘার সম্পর্কে আমার একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা আছে …।
সেদিনটা আমাদের বাগানের কলকাতা আপিসের বড় সাহেব আসবেন বাগান দেখতে। তাঁর নাম লিন্টন সাহেব। বাবা ও ছোট সাহেব তাকে আনতে গিয়েছেন সোনাদা স্টেশনে–আমাদের বাগান থেকে প্রায় তিন-চার ঘণ্টার পথ। ঘোড়া ও কুলী সঙ্গে গিয়েছে। তখন মেমেরা পড়াতে আসত না, বিকেলে আমরা ভাইবোনে মিলে বাংলোর উঠোনে লাট্টু খেলছিলাম। সূর্য অস্ত যাবার বেশী দেরি নেই- মা রান্নাঘরে কাপড় কাচবার জন্যে সোডা সাবান জল ফোটাচ্ছিলেন, থাপা লণ্ঠন পরিষ্কারের কাজে খুব ব্যস্ত–এমন সময় আমার হঠাৎ চোখ পড়ল কাঞ্চনজঙ্ঘার দূর শিখররাজির ওপর আর একটা বড় পর্বত, স্পষ্ট দেখতে পেলাম তাদের ঢালুতে ছোট-বড় ঘরবাড়ি, সমস্ত ঢালুটা বনে ঢাকা, দেবমন্দিরের মত সরু সরু ঘরবাড়ির চূড়া ও গম্বুজগুলো অদ্ভুত রঙের আলোয় রঙীন– অস্তসূর্যের মায়াময় আলো যা কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে পড়েছে তা নয়–তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও সম্পূর্ণ অপূর্ব ধরনের। সে-দেশ ও ঘরবাড়ি যেন একটা বিস্তীর্ণ মহাসাগরের তীরে–কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথার ওপর থেকে সে মহাসাগর কতদূর চলে গিয়েছে, আমাদের এদিকেও এসেছে, ভুটানের দিকে গিয়েছে। তার কূলকিনারা নেই যদি কাউকে দেখাতাম সে হয়তো বলত আকাশ ওইরকম দেখায়, আমায় বোকা বলত। কিন্তু আমি বেশ জানি যা দেখচি তা মেঘ নয়, আকাশ নয়–সে সত্যিই সমুদ্র। আমি সমুদ্র কখনো দেখিনি, তাই কি, সমুদ্র কি রকম তা আমি জানি। বাবার মুখে গল্প শুনে আমি যে রকম ধারণা করেছিলাম সমুদ্রের, কাঞ্চনজঙ্ঘার উপরকার সমুদ্রটা ঠিক সেই ধরনের। এর বছর দুই পরে মেমেরা আমাদের বাড়ি পড়াতে আসে, তারা দাদাকে একখানা ছবিওয়ালা ইংরেজী গল্পের বই দিয়েছিল, বইখানার নাম রবিনসন ক্রুশো–তাতে নীল সাগরের রঙীন ছবি দেখেই হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, এ আমি দেখেছি, জানি–আরও ছেলেবেলায় কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথার ওপর এক সন্ধ্যায় এই ধরনের সমুদ্র আমি দেখেছিলাম–কূলকিনারা নেই, অপার…ভুটানের দিকে চলে গিয়েছে…
