পুলিশের লিস্ট দেখে কাছাকাছি দু-টি বদমাইশের আড্ডায় হানা দেওয়া হল–কিন্তু কোথাও কিছু সন্ধান মিলল না।
তারপর–রাত তখন দেড়টা–এমন এক ভীষণ ব্যাপারের সূত্রপাত হয়ে গেল যে, এর আগে যেসব বোমা ফেলার কান্ড সুরেশ্বর ও বিমল দেখেছে–এর কাছে সেগুলো সব একেবারে ম্লান হয়ে নিষ্প্রভ হয়ে মুছে গেল।
বিমল আর সুরেশ্বরের মনে হল, আকাশ থেকে চারিধারে একসঙ্গে যেন দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্ৰ পড়তে শুরু হয়েছে–অসংখ্য। অনেক, অনেক–গুনে শেষ করা যায় না! সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণের আওয়াজ, ইট টালি ছোটার শব্দ, দেওয়াল পড়ার ছাদ পড়ার শব্দ–মানুষের কলরব, হইচই, কান্না, পুলিশের হুইসল, মাথার ওপর ঘর্ঘর শব্দ–সবসুদ্ধ মিলিয়ে একটা সুপ্ত দৈত্যপুরীর দৈত্যরা যেন হঠাৎ জেগে উঠে উন্মাদ হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে!
ডেপুটি মার্শাল অর্ডার দিলেন, সব কনস্টেবল একত্র হয়ে গেল। কনসেশন পুলিশের কর্মচারীরা সাহায্য করতে চাইলে, হতাহতদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে। সেই অন্ধকারের মধ্যে টর্চ জ্বেলে অট্টালিকার ভগ্নস্তূপ অনুসন্ধান করে আহত ও চাপা-পড়া মানুষের সন্ধান চলতে লাগল। কাজ এগোয় না। ভাঙা বাড়ির ইটের রাশি পদে পদে ওদের বাধা দিতে লাগল। একটি চীনা মন্দিরের কাছে চারজন লোক মরে পড়ে আছে। দু-টি ছোটো বাড়ি চুরমার হয়ে সেখানে এমনভাবে রাস্তা আটকেছে যে, মৃতদেহগুলো টেনে বার করবার উপায়ও রাখেনি। ইটের স্কুপের ওপর উঠে আবার ওদিক দিয়ে নেমে যেতে হল–তবে জায়গাটা পার হওয়া সম্ভব হল।
বিমল চেঁচিয়ে বলে উঠল–সামনে প্রকান্ড বোমার গর্ত, সাবধান!
সবাই চেয়ে দেখলে আন্দাজ ত্রিশফুট ব্যাসযুক্ত একটা প্রকান্ড গহ্বর থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে–এবং গর্তের ধারে এখনও ছটকানো ধাতুর খোলা-ভাঙা টুকরো পড়ে আছে, বিমল টুকরোটা হাতে তুলে নিয়েই ফেলে দিলে–গরম আগুন!
কর্ডাইটের উগ্র গন্ধ জায়গাটায়! ওরা সবাই অবাক হয়ে সেই ভীষণ গর্তটার দিকে চেয়ে রইল।
এমন সময়ে দেখা গেল, ছ-খানা জাপানি প্লেন সারবন্দি হয়ে দক্ষিণ দিক থেকে উড়ে আসছে–ওদের মাথার উপর। বোধ হয় ওদের টর্চের আলো দেখেই আসছে। চীনা পুলিশের ডেপুটি মার্শাল ঘেঁকে বললেন–সাবধান! বোমার গর্তে লাফ দাও!
সবাই বুঝলে এ অবস্থায় ত্রিশফুট ব্যাসযুক্ত এবং আন্দাজ প্রায় পনেরো ফুট গভীর বোমার গর্তটাই সব চেয়ে নিরাপদ স্থান, সারা চা-পেই পল্লি অঞ্চলের মধ্যে।
ঝুপঝাঁপ! দু-সেকেণ্ডের মধ্যে ওপরে আর কেউ নেই–সবাই গর্তটার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। বিমল ওদের সঙ্গে লাফ দিয়েছিল–সঙ্গেসঙ্গে ওর হাঁটু পর্যন্ত পাঁকে পুঁতে গেল, গর্তটার মধ্যে কাদা আর জল-কাদার সঙ্গে বোমার ভাঙা টুকরো মেশানো–সবাই কোনো রকমে জল কাদার মধ্যে মাথা গুঁজে রইল ধার ঘেঁষে–কারণ মাঝখানে থাকলে অনেকখানি নক্ষত্ৰ-খচিত অন্ধকার আকাশ দেখা যায়–তখন আর নিজেকে খুব নিরাপদ বলে মনে হয় না।
ওদের মধ্যে একজন আমেরিকান পুলিশম্যান ওদের বোঝাচ্ছিল যে, এ অবস্থায় কোনো এরোপ্লেন থেকে বোমা ফেললে ওদের লাগবার কথা নয়– সে নাকি মাথুকুও রণক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে জানে–বোমার গর্তই সর্বাপেক্ষা নিরাপদ স্থান।
আর একজন বললে– কেন, যদি মেশিনগান চালায়?
আগের লোকটা বললে-ফু :! মেশিনগান! এই অন্ধকারে!
এমন সময় হঠাৎ দেখা গেল সেই ছ-খানা প্লেন ঠিক ওদের গর্তের ওপর এসে চক্রাকারে উড়ছে এবং ক্রমে নীচু হয়ে নামছে যেন।
কে একজন বললে–আমাদের টের পেলে নাকি!
মুখের কথা সবারই ওষ্ঠাগ্রে যেন জমাট বেঁধে গিয়েছে–বুকের রক্ত পর্যন্ত জমাট বেঁধে গেল সকলের। কেবল আগের পুলিশম্যানটি বলতে লাগল– কোনো ভয় নেই–ওরা মেশিনগান ছুঁড়ে কিছু করতে পারবে না–কাওয়াসাকি বম্বারের মেশিনগানের তরিবৎ সুবিধের নয়– হত যদি জার্মান হেঙ্কেল ফিফটিওয়ান, কী স্কুলজ-ব্যাঙ্ক এক-শো এগারো–
সবাই চাপা গলায় বিষম রাগের সঙ্গে একসঙ্গে বলে উঠল–আঃ–চুপ! সঙ্গেসঙ্গে প্লেনগুলো অনেকখানি নেমে এল এবং অকস্মাৎ এক তীব্র সার্চলাইটের আলোয় ওদের বোমার গর্ত এবং চারপাশের আরও অনেক দূর পর্যন্ত আলোকিত হয়ে উঠল–ওঠবার সঙ্গেসঙ্গে পটকা বাজির মতো মেশিনগান ছোঁড়ার শব্দে ওদের কানে তালা ধরবার উপক্রম হল।
একজন ফিস ফিস করে বললে–যদি বাঁচতে চাও তো সবাই মড়ার মতো পড়ে থাকো –ভান করো যেন সবাই মরে গিয়েছ–
আগের সেই মার্কিন পুলিশম্যানটি যুক্তিতর্কে অদম্য। সে বলে উঠল–কিছু হবে না দেখো হ্যাঁ হত যদি হেঙ্কেল ফিফটিওয়ান কিংবা—
আবার!
সেই কাদাজলের মধ্যে হাত-পা গুটিয়ে উপুড় হয়ে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে থেকে বিমল অতীত বা ভবিষ্যতের কোনো কথা ভাবছিল না। তার চিন্তা শুধু বর্তমানকে আশ্রয় করে। সংসার নেই, অতীত নেই, ভবিষ্যৎ–শুধু সে আছে, আর আছে–এই দুর্ধর্ষ, বিভীষণ, নিষ্ঠুর বর্তমান। যেকোনো মুহূর্তে মেশিনগানের গুলি ওর জীবলীলা, ওর সমস্ত চৈতন্যের অবসান করে দিতে পারে, সারাদুনিয়া ওর কাছ থেকে মুছে যেতে পারে এক মুহূর্তে যেকোনো মুহূর্তে। কাদার মধ্যে মুখ গুঁজে, চোখ বুজে ও পড়ে রইল–ওর পাশে সবাই সেইভাবেই আছে–বীরত্ব দেখাবার অবকাশ নেই, বাহুবল বা সাহস দেখাবার অবসর নেই– খোঁয়াড়ের শুয়োরের দলের মতো ভয়ে কাদার মধ্যে ঘাড় গুঁজে থাকা–এর নাম বর্তমান যুগের যুদ্ধ! ওরা আজ দেশপ্রেমিক বীর সৈনিক দল হলেও এর বেশি কিছু করতে পারত না–এই একই উপায় অবলম্বন করতেই হত–অন্য গত্যন্তর ছিল না। অন্য কিছু করা আত্মহত্যার নামান্তর মাত্র। কানের এত কাছে এরোপ্লেনের শব্দ বিমল কখনো পায়নি। এরোপ্লেনের বিরাট আওয়াজ কানে একেবারে তালা ধরাল যে! ওর ভয়ানক আগ্রহ হচ্ছে। একবার মুখ তুলে ওপরের দিকে চোখ চেয়ে দেখে, এরোপ্লেনগুলি গর্তটার কত ওপরে এসেছে।
