বিমল এতক্ষণে যেন সংবিৎ ফিরে পেল। বললে–দাঁড়াও, তোমরা যেও না! প্রথমে বলো আলো নিবিয়ে দেব কেন?
মিস্টার, সাংহাই পুলিশ-মার্শালের নোটিশ দেখনি? রাত এগারোটার পরে শহরের সব আলো নিবিয়ে দিতে হবে। ব্ল্যাক আউট। বোমা ফেলছে জাপানিরা। তোমার কি বাড়ি?
আমার এ বাড়ি নয়। সব বলছি, আমি কনসেশনের লোক–যুদ্ধের ডাক্তার, ভারতবর্ষ থেকে তোমাদের সাহায্য করতে এসেছি। আমরা চারজনে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এইপথে রিকশা করে যাচ্ছিলুম–সঙ্গে ছিলেন দু-টি মার্কিন মহিলা। রিকশাওয়ালা তাঁদের নিরে কোথায় পালিয়েছে। আমাদের রিকশা অন্য পথে নিয়ে গেলে আমরা এই গলির মধ্যে ঢুকে সন্ধান পাই এই বাড়িটার সামনে রিকশাটা মেয়েদের নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমরা বাড়িতে ঢুকে দেখি, এটা মা জং জুয়াড়িদেরও চন্ডুর আড্ডা। ওদের সঙ্গে মারামারি হয়ে যাওয়ার পরে ওরা কোথায় পালিয়েছে। আমার বন্ধু পুলিশ ডাকতে গিয়েছে। তোমরা এসেছ ভালোই হয়েছে, এই তালা-বন্ধ ঘরটা খোলো–আমার বিশ্বাস এরই মধ্যে মহিলা দু-টিকে আটকে রেখেছে।
পুলিশম্যান দু-জন আবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করলে। তারা যে বেজায় আশ্চর্য হয়ে গিয়েছে, মা জং খেলার ঘরে চীনে লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোয়ও ওদের মুখ দেখে বিমলের সেটা বুঝতে দেরি হল না। যেন ওরা কখনো ওদের ক্ষুদ্র পুলিশ জীবনে এমন একটা আজগুবি ব্যাপারের সম্মুখীন হয়নি–ভাবখানা এই রকম।
একজন পুলিশ চৌকিদার এগিয়ে বন্ধ ঘরের তালাবদ্ধ দরজাটার কাছে দাঁড়িয়ে বললে– এই ঘর? কই, কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না তো?
না, সাড়া দেবে কে? ধরো অজ্ঞান করে রেখে দিয়েছে।
পুলিশম্যান দুটির মধ্যে একজন বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমানের মতো অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে বললে–না, আমার তা মনে হয় না মিস্টার। তুমি জান না এইসব জুয়াড়ি ও চন্ডুর আড্ডাধারী বদমাইশদের। এ ঘরে ওদের রাখেনি। ওদের গায়ে গহনা ছিল?
একজনের গলায় একটা ঝুটো মুক্তোর মালা ছিল–দু-জনের হাতে দুটো সোনার হাতঘড়ি আর সোনার পাতলা বালা–
এমন সময় বাইরে মোটরের আওয়াজ শোনা গেল, সঙ্গেসঙ্গে হুড়মুড় করে বাড়িতে ঢুকল–আগে-আগে সুরেশ্বর, পেছনে একদল চীনা পুলিশ সঙ্গে একজন কনসেশন পুলিশ।
সুরেশ্বর ঢুকেই বললে–টেলিফোন করে দিয়েছি কনসেশনে–পুলিশ মার্শালকে জানানো হয়েছে। এই একজন কনসেশনের পুলিশম্যানকে রাস্তায় দেখতে পেয়ে আনলুম। এদিকে মহামুশকিল, শহরে ব্ল্যাক-আউট, আলো জ্বালবার জো নেই–সব ঘুটঘুঁটে অন্ধকার।
ভাঙো দরজা সবাই মিলে।
সকলের সমবেত চেষ্টায় ও ধাক্কায় হুড়মুড় করে দরজা ভেঙে পড়ল।
বিমল সকলের আগে ঘরে ঢুকলে। পেছনে ছটা পুলিশ টর্চ জ্বেলে ঢুকল। তিনটি বড়ো বড়ো জালা ছাড়া ঘরে কিছু নেই। মানুষের চিহ্ন তো নেই-ই।
একজন পুলিশ উঁকি মেরে জালার মধ্যে দেখলে। জালাতে মানুষ তো দূরের কথা, একবিন্দু জল পর্যন্ত নেই। খালি জালা।
মাথার ওপর আকাশে আবার অনেকগুলি এরোপ্লেনের ঘড়ঘড় আওয়াজ শোনা গেল। দু জন পুলিশম্যান উঠোনে গিয়ে হেঁকে বললে–আলো নিবিয়ে দাও, নিবিয়ে দাও, জাপানি বম্বার–
সুরেশ্বর বললে–আরে, এরা বেশ তো! সারা সন্ধ্যেবেলা জাপানিরা বোমা ফেললে, তখন ব্ল্যাক-আউট করলে না–আর এখন এদের হুঁশ হল–
বিমল উপরের দিকে মুখ তুলে বললে–হাঁ, জাপানি কাওয়াসাকি বহুবার। মিনি চিনিয়ে দিয়েছিল কনসেশনে–মনে আছে?
সমস্ত সাংহাই শহর অন্ধকার। সেই আধো আলো আধো অন্ধকারের মধ্যে–কারণ নক্ষত্রের আলো সাংহাইয়ের পুলিশ মার্শালের আদেশ মানেনি–জাপানি বোমারু প্লেনগুলির শব্দ মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছিল, তাও সবসময় নয়। মাঝে মাঝে যেন সেগুলি কোনদিকে চলে যায়, আবার খানিক পরে মাথার ওপরে আসে।
বিমল ভাবছিল, জাপানি বম্বার থেকে আর বোমা ফেলছে না তো!
সুরেশ্বরকে কথাটা বলতে সে বললে–ব্ল্যাক আউটের জন্যে নিশ্চয়। সবাই লুকিয়েছে, রাস্তাঘাটে জনপ্রাণী নেই। কোনোদিকে কোনো শব্দ আছে?
দু-জন চীনা পুলিশ বললে তোমরা বোঝোনি মিস্টার। ওরা বোমা ফেলবে না, এখন সুবিধে খুঁজছে হাই এক্সপ্লোসিভ বোমা ফেলবার। সেই বোমা ফেলে লোকদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার পরে, যেমন সব ভয়ে রাস্তাঘাটে বেরোবে কী পালাতে যাবে, অমনি গ্যাসের বোমা ফেলবে। এখন গ্যাসের বোমা ফেললে তো মানুষ মরবে না, কারণ সব ঘরের মধ্যে জানালা দরজার আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে। সেখান থেকে ওদের আগে বার করবে রাস্তায়–পরে সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের বোমা ছাড়বে, এ-ই করে আসছে দেখছি আজ ক-দিন থেকে–
একটু পরে কনসেশনের পুলিশ এল, চীনা পুলিশের ডেপুটি মার্শাল স্বয়ং এলেন বহু লোকজন নিয়ে। ওদের দিয়ে চড়ুর ও জুয়াড়িদের আড্ডার ছোট্ট উঠোনটা ভরে গেল।
ডেপুটি মার্শাল বললেন–শহরে ব্ল্যাক আউট, ঘুটঘুঁটে অন্ধকার চারিধারে–এক্ষুনি জাপানিরা হাইএক্সপ্লোসিভ বম্ব ফেলবে, তারপরে ফসপেন গ্যাসের বোমায় বিষ ছাড়বে। এ অবস্থায় কী করা যায়? মেয়ে দু-টিকে কোথায় আটকে রেখেছে, কী করে খুঁজি।
কনসেশন পুলিশের কর্মচারীরা বললেন–আপনার এলাকায় যত বদমাইশের আড্ডা আছে, সব হানা দিই চলুন।
কিন্তু তাতে সময় নেবে। এখুনি যেসব ছত্রাকার হয়ে চারিদিকে ছুটে বেরিয়ে পড়বে। দেখছেন না ওপরকার অবস্থা? ওদের প্ল্যান করে নিতে যা দেরি! আচ্ছা, দেখি কতদূর কী হয়। মেয়ে দু-টিকে গুন্ডারা আটকে রেখেছে, মুক্তিপণ আদায় করবার উদ্দেশ্যে। সুতরাং, তাদের প্রাণের ভয় বর্তমানে নেই একথা ঠিকই। সাংহাইতে এ-রকম অনবরত হচ্ছে। এই ভদ্রলোক দু-টি এত রাতে মেয়েদের নিয়ে চা-পেই পল্লিতে বেরিয়ে বড়ো বিবেচনার অভাব দেখিয়েছেন। যত গুন্ডা আর বদমাইশের আড্ডা এই পাড়ায়।
