কিন্তু তাতে বড় বেশি বিশ্রী আওয়াজ হবে না? হোটেলের লোকেরা মকে উঠতে পারে। এমনকী পুলিশ-টুলিশ নিয়ে ছুটেও আসতে পারে এ-ঘরে। সুদানি পুলিশ বড় বেয়াড়া শুনেছি।
সুদানি পুলিশ ঘুণাক্ষরেও কিছু জানবে না, এবিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন! ফরিদ কুটিল হাসির সঙ্গে চিবিয়ে চিবিয়ে বললে, কারণ, এ হোটেলের মালিক থেকে চাকর পর্যন্ত কেউ সেনর সাবাটিনির ঘরে কী হচ্ছে উঁকি দিয়ে দেখতেও সাহস করবে না।
ও, আপনি তাহলে সেনর সাবাটিনি! আমি পরিচয় জেনে ধন্য হবার ভাব দেখালাম।
আমি যে-ই হই, ফরিদ মানে সাবাটিনি কড়া গলায় বললে, তোর পকেটের লেফাফাটা এবার বার কর দেখি, ছুঁচো। এখন বুঝতে পারছিস বোধহয়, ও লেফাফা সঙ্গে নিয়ে সিংহের গুহায় ঢুকে কী বোকামি করেছিস! অবশ, ও লেফাফা তোর কাছ থেকে কেড়ে নিতামই। সেই জন্যই আমার খার্তুম আসা। শুধু হাঙ্গামাটা তুই বাঁচিয়ে দিলি এই যা!
আমি যেন প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললাম, এ-লেফাফা আপনাকে দিতে হবেই? নিয়ে আপনি ছাড়বেন না?
না ছাড়ব না। ভালয় ভালয় দিস তো জ্যান্ত এ-ঘর থেকে বেরুতে পারবি। আর দিলে লেফাফা তো যাবেই, সেই সঙ্গে প্রাণটা। সাবাটিনির কী সে উল্লাসের হিংস্র হাসি!
কিন্তু এ-লেফাফা নিয়ে কী লাভ আপনার হবে! আমি কাতরভাবে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, রেনে লাভাল নিরিবিলিতে কোথায় একটু লুকিয়ে আছেন, তাঁকে কেন মিছিমিছি জ্বালাতন করবেন?
জ্বালাতন কেন করব? সাবাটিনি আবার হেসে উঠল, তাঁকে জ্বালাতন কিছু করব , শুধু তাঁকে তাঁর যন্ত্রপাতি কাগজপত্র লটবহর সমেত এমন জায়গায় পাচার করব, যেখানে তাঁর গবেষণার কোনও বিষ্ম আর হবে না।
কোথায়? আপনার নিজের দেশ ইটালিতে? আমার যেন দারুণ কৌতূহল।
না। সাবাটিনি গর্জন করে উঠল, কোথায় তাতে তোর কী দরকার?
ও বুঝেছি,আমি ভালমানুষের মতো বললাম, নামটা আপনার ইটালিয়ান হলেও আপনার দেশ জাত বলে কিছু নই। ও সব বালাই ঘুচিয়ে আপনি শুধু নিজের স্বার্থের ধান্দাতেই ঘোরেন। রেনে লাভালকে পাবার জন্য যারা সবচেয়ে বেশি দাম দেবে তাদের কাছেই তাঁকে বেচবেন।
চুপ কর, ছুঁচো, সাবাটিনি গর্জন করে উঠল, তোর কাছে বক্তৃতা শোনবার আমার সময় নেই। সুবোধ ছেলের মতো লেফাফাটা বার কর। আমি এক থেকে পাঁচ গুনছি। তার মধ্যে লেফাফা না দিলে এই রিভলভারই যা বলবার বলবে। এক…
দোহাই! দোহাই! আমি কাতর অনুনয় জানালাম, লেফাফাটা তো দিতেই হবে বুঝতে পারছি, কিন্তু তার আগে পৃথিবী থেকে চিরকালের মতো অন্নাভাব ঘোচাবার কল্পনাতীত উপায় যিনি আবিষ্কার করতে চলেছেন, তাঁর গোপন ঠিকানাটা একটু দেখে নিতে দেবেন? সত্যি বলছি, শিলমোহর দেওয়া খামটা খুলেও দেখিনি এখনও।
তাহলে এ-জন্মে আর তা দেখা তোর ভাগ্যে নেই। সাবাটিনি নির্মমভাবে হেসে উঠে গুনতে আরম্ভ করল, এক…দুই…।
সাবাটিনির পেছনে কামরার দরজাটা খোলার খুট করে একটু আওয়াজ হল।
সাবাটিনি চমকে উঠলেও আমার দিক থেকে চোখ বা পিস্তল কিছুই না ফিরিয়ে বিরক্তির সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে, কে?
পেছন থেকে চাপা গলায় আওয়াজ এল, আমি সোলোমাস।
সোলোমাস! সাবাটিনি হতভম্ব হল বুঝতে পারলাম, কিন্তু তার চোখ আর পিস্তল আমার ওপরই নিবদ্ধ রইল। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বললে, এখানে কেন?
শোনা গেল, তোমায় শেষ করতে!
আমি হাত তুলে সভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, ও কী করছেন, মসিয়ে সোলোমাস? পিস্তল ছুঁড়বেন না! আমার গায়ে গুলি লাগবে যে!
সাবাটিনি চমকে একটু পিছনে তাকাতেই তার হাতের রিভলভার এল আমার হাতে, আর সে তখন সোফার ওধারে চিৎপাত।
রিভলভারটার সেফটি ক্যাচ আবার লাগিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে বললাম, উঠুন সেনর সাবাটিনি। মেঝেয় অমন শুয়ে থাকা কি ভাল!
সাবাটিনির কিন্তু ওঠবার কোনও লক্ষণ তখনও নেই। একবার বন্ধ দরজা আর একবার আমার দিকে ভ্যাবাচাকা খেয়ে তাকিয়ে বললে, সোলোমাস কোথায় গেল?
সোলোমাস আবার যাবে কোথায়? আড্ডিস আবাবাতেই আছে। হেসে বললাম, ভেনট্রিলোকুইজম বিদ্যেটা অনেক সময় খুব কাজে লাগে।
সাবাটিনি সেই বিরাট দেহ নিয়েও এবারে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললে, শয়তান, পাজি, ছুঁচো, শুধু তোর হাতে রিভলভার-তাই, নইলে তোর হাড়-মাংস আমি আলাদা করে রাখতাম।
রিভলভারটা দুরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললাম, ও আফশোস আপনার তাহলে আর রাখলাম না।
আমার কথা শেষ হতে না হতেই সাবাটিনি লাফ দিয়ে পড়ল। না, আমার ওপরে নয়, রিভলভারটা যেখানে ছুঁড়েছিলাম সেদিকে। কিন্তু সেখান পর্যন্ত তাকে পৌঁছোতে হল না। তার শয়তানি বুঝেই সোফাটা তৎক্ষণাৎ ঠেলে দিয়েছিলাম। তার ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে সে দেওয়ালের গায়ে গিয়ে ছিটকে পড়ল।
সেখান থেকে তাকে তুলে একটা ধোবি পাট দিয়ে বললাম, কী ভাগ্যি, সেনর সাবাটিনি, আপনার ঘরে এ-হোটেলের মালিক থেকে চাকরবাকর কেউ উঁকি দিতে সাহস করে না, নইলে আপনার কাছে দুটো লড়াইয়ের প্যাঁচ শেখবার এ সৌভাগ্য হয়তো পেতাম না। হয়তো হোটেলের লোকেরা ভূমিকম্প হচ্ছে বলে এ-ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকতে পারত।
সাবাটিনিকে একটা চরকি পাক দিয়ে মাটিতে ফেলে আবার বললাম, আপনার মতো টনটনে ন্যায়নীতিবোধ কোথাও আমি দেখিনি। ধর্মযুদ্ধে অন্যের হাতে রিভলভার আপনি পছন্দ করেন না, কিন্তু নিজের হাতে সেটা রাখা ন্যায্য মনে করেন! আপনাকে আবার তাই একটা সেলাম জানাচ্ছি।
