আমায় খার্তুম আসার নির্দেশ দিয়ে ফরিদকেও কি তা আবার জানিয়েছে!
না, আর ধোঁকার মধ্যে থাকার কোনও মানে হয় না। ব্যাপারটার একটা ফয়সালা এখুনি আজই করে ফেলতে হবে।
ফরিদ আমায় দেখতে পায়নি। ভিক্টোরিয়া অ্যাভেনিউ দিয়ে সে খেদিভ অ্যাভেনিউর দিকেই আসছে। গর্ডনের মূর্তির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে খানিক অপেক্ষা করে আমি ফরিদের পিছু নিলাম দুর থেকে।
ফরিদ খেদিভ অ্যাভেনিউর একটা নামকরা হোটেলে গিয়ে ঢোকার কিছুক্ষণ বাদে সেখানে গিয়ে হোটেল-ক্লার্ককে জিজ্ঞাসা করে ঘরের নম্বর জেনে নিয়ে একেবারে সটান ইবন ফরিদের ঘরের দরজায় গিয়ে টোকা দিলাম! ফরিদের কামরার দরজায় কিন্তু বিরক্ত কোরো না বিজ্ঞপ্তি লটকানো।
ভেতর থেকে বাঘের মতো গলায় আওয়াজ এল, দূর হও। বাইরের নোটিস পড়তে পারো না!
কী করে পারব। হিব্রু ভাষায় বললাম, ইংরেজিটা যে জানি না।
খানিকক্ষণ ভেতরে আর কোনও আওয়াজ নেই। তারপর আবার বাজখাঁই গলায় প্রশ্ন হল, পড়তে পারো না তো আমার কথা বুঝলে কী করে?
ফরিদ সে কথা জিজ্ঞাসা করতে পারে অবশ্য। কারণ সে ইংরেজিতেই প্রথম ধমক দিয়েছিল।
বললাম, শুনে বুঝতে পারলেই কি পড়তে পারা যায়! তুমি তো আরবি বলো খাসা, কিন্তু অক্ষর চেনো কি?
ওধারে এবার গর্জন শোনা গেল, কী তুমি?
মোলায়েম মিষ্টি করে বললাম, ইবন ফরিদ।
দড়াম করে দরজাটা এবার খুলে গেল। ফরিদের মাংসের পাহাড়ে যেন ভূমিকম্প শুরু হয়েছে।
ও, তুই–মানে আপনি!ফরিদ চটপট সামলে নিয়ে বললে, আসুন, আসুন। তা, এ রকম রসিকতার মানে কী?
কামরার ভেতরে ঢোকার পর ফরিদ দরজাটা বন্ধ করে দিচ্ছে দেখে বললাম, যেন অবাক হয়ে, রসিকতা কোথায় দেখলেন?
ফরিদ গর্জন করতে পারলেই বোধহয় খুশি হত। তার বদলে অতি কষ্টে রাগ চেপে রেখে হাসবার চেষ্টা করে বললে, ইবন ফরিদ নামটা নেওয়া যদি রসিকতা না হয় তাহলে মাপ চাইছি।
ইবন ফরিদ নামটা রসিকতা! আমি যেন আকাশ থেকে পড়ে বললাম, আপনি যদি ও নাম নিতে পারেন, তাহলে আমি নিলেই রসিকতা হবে কেন?
ও নাম আমার নয় বলতে চান? ফরিদ আর বুঝি নিজেকে সামলাতে পারে না।
তাই তো বলছি। মধুর হেসে বললাম, আপনি ইবন ফরিদ তো নন-ই, আরবও আপনার দেশ নয়।
কথাটা বলে ফরিদের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। এবার হয় সে ফাটবে, নয় প্যাঁচ খেলবে।
শেষেরটাই ঠিক হল। দু-এক মুহূর্ত কী ভেবে নিয়ে ফরিদ বললে, মানলাম আপনার কথাই সত্যি, কিন্তু আপনি জানলেন কার কাছে?
কারুর কাছে জানিনি, নিজেই বুঝেছি। আপনি আরবি ভাষা যত ভালই বলুন, সত্যিকারের আরব হলে অন্তত ইবন ফরিদ নামটার দাম জানতেন!
তার মানে? ফরিদ সত্যিই এবার একটু হতভম্ব।
মানে, ইবন ফরিদ যে পর্যটক ভূগোলবিদ নয়, আরবি ভাষার অদ্বিতীয় একজন সুফি কবি, এ-খবর শিক্ষিত আরব মাত্রেই শুধু নয়, আরবি সাহিত্যের সঙ্গে কিছু পরিচয় যার আছে সে-ও জানে। ভূগোলবি পর্যটক হিসেবে যাঁর নাম-ডাক ছিল, তিনি ইবন ফরিদ নন, ইবন জুবের।
ফরিদ হাঁ করে আমার দিকে তখন তাকিয়ে। বলেই ঘনাদা হঠাৎ ভ্রূকুটি করলেন।
আমাদের সকলেরই তখন কোথা থেকে কাশির ছোঁয়াচ লেগেছে।
শিশির সবার আগে সামলে উঠে লজ্জিত ভাবে বললে, আপনার ঘরে লবঙ্গ আছে, ঘনাদা?
কেন? ঘনাদার গলা গম্ভীর।
এই সবাই একটা একটা চিবোতাম। গলাটা কেমন খুস খুস করছে কি না।
তা লবঙ্গ কেন? উখো দিয়ে চাঁছো না। শিবু ঠিক সময়মতো সুর পালটে দাঁত খিচিয়ে উঠল, না ঘনাদা আপনি বলে যান। ভারি একটু কাশি, তার জন্যে লবঙ্গ চাই, বচ চাই, বাসক সিরাপ চাই! কডলিভার অয়েল যে চাওনি এই আমাদের ভাগ্যি।
শিশির ও আমরা বকুনি খেয়ে যথাবিহিত কুঁকড়ে গেলাম।
ঘনাদা মানের গোড়ায় জল পেয়ে আবার শুরু করলেন, ফরিদ খানিক একেবারে বোবা হয়ে থেকে তারপর বললে, আমি ইবন ফরিদ হই বা না হই, আরব আমার দেশ হোক বা না হোক, তাতে আপনার কী আসে-যায় যে আড্ডিস আবাবা থেকে
এই খার্তুম পর্যন্ত পিছু নিয়ে এই হোটেলে এসে ধাওয়া করেছেন?
ফরিদের গলায় রাগের ঝাঁজ কিন্তু নেই। সে যেন অন্য মানুষ। নামই ভাঁড়াক আর যা-ই করুক, সে যেন কারুর সাতে-পাঁচে নেই। শুধু নিজের খুশিতে একটু দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি কেন মিছিমিছি তার পিছু নিয়ে তাকে বিব্রত করছি এই তার নালিশ।
ফরিদের তালেই তাল দিয়ে তার দিকে চেয়ে মুচকে হেসে বললাম, শুধু কি আড্ডিস আবাবা থেকে? পিছু নিয়েছি সেই ইয়েমেন থেকে, তা বুঝি জানেন না?
আমি এই সুর ধরব ফরিদ ভাবতে পারেনি। তবু যথাসম্ভব নিরীহ ভালমানুষের মতো জিজ্ঞাসা করলে, কেন নিয়েছেন তাই তো জানতে চাইছি।
তাহলে আমার মুখ থেকেই শুনতে চান? হো হো করে হেসে উঠে তার পিঠে একটা দোস্তির আদরের চাপড় দিয়ে বললাম, আসুন তাহলে বসা যাক।
ফরিদ তখন মেঝেতেই উপুড় হয়ে বসে পড়েছিল অবশ্য।
আরে, ওখানে নয়। এই আপনার সোফায়, বলে হাত ধরে তাকে তুলে সোফায় বসিয়ে দিলাম।
ধরা হাতটা আরেক হাতে টিপতে টিপতে যেভাবে সে আমার দিকে তাকাল, তাতে তার চোখে ঠিক বন্ধুত্বের প্রীতি উথলে উঠছে বলে মনে হল না।
যেন সেসব কিছু লক্ষ না করেই তার পাশে বসে পড়ে বললাম, কেন আপনার পেছনে ছিনে জোঁকের মতো লেগে আছি, জানেন? বছর দুয়েক হল একটা মানুষ ফ্রান্স থেকে নরওয়ে যাবার পথে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এমন কত লোকই তো যায়। বিভিন্ন দেশের পুলিশ কিছু দিন একটু খোঁজ-খবর হই-চই করে, তারপর নামটা খরচের খাতায় লিখে দেয়। আর সব দেশের পুলিশ তা করলেও ফ্রান্সের সুরে তা করেনি। না করাটা একটু আশ্চর্য। কারণ লোকটা বৈজ্ঞানিক বটে, কিন্তু কেওকেটা কেউ নয়। পারমাণবিক বোেমা কি গ্রহান্তরে যাবার রকেটের বারুদও তার গবেষণার বিষয় নয়। ফটো কেমিস্ট যাদের বলে, তিনি সেই জাতের রাসায়নিক। তাঁর নামটা বৈজ্ঞানিক মহলে পর্যন্ত খুব বেশি লোক জানে না। তাঁর নাম ধরা যাক রেনে লাভাল।
