না স্বীকার করে উপায় কী! বিশেষ নিজের কানেই সব যখন শুনে ফেলেছেন।
ক্রমশ আমিই যেন বেকায়দায় পড়ছিলাম কথা কাটাকাটিতে তাই একটু রেগেই বললাম, আমিই তাঁবুর পেছনে ছিলাম বুঝেও ফরিদ সাহেবকে হায়নার কথা বলেছিলেন কেন?
আলাপ-আলোচনাটা দীর্ঘ হবে মনে হচ্ছে, সোলোমাস হাসলেন, আপনারও অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করবার আছে, আমারও কিছু বলবার। সুতরাং এমন ভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে একটু বসলে হত না। এত রাত্রে আপনাকে আর কী দিয়ে আপ্যায়িত করতে পারি। খাঁটি জংলি মধু থেকে তৈরি আবিসিনিয়ার নামকরা তেজ আছে। বসুন। তাই একটু চাখতে দিই।
না, তার দরকার হবে না। আমি এমনিই বসছি। এখন আমার কথাগুলোর জবাব দিলে বাধিত হব। বলে আমি চিতার চামড়ায় ঢাকা একটা নিচু কৌচের উপর
বসলাম।
সোলোমাসও পাশে একটা মোড়া টেনে বসে বললেন, কেন ফরিদ সাহেবকে হায়নার কথা বলেছিলাম এই কথা জানতে চাইছেন তো? বলেছিলাম ফরিদ সাহেবকে ধোঁকা দেবার জন্য। হায়নারা রাত্রে শহরের রাস্তায় ধাঙ্গড়ের কাজ করে ঘঘারে, আমার তাঁবুর দড়ি নাড়তে তারা কখনও আসে না আমি জানি।
ওঃ, আমায় তা হলে অনুগ্রহ করেছিলেন! এ অনুগ্রহের কারণ? এবারে সত্যি অবাক হওয়ার দরুন বিদ্রুপের সুরটা ঠিক গলায় ফুটল না।
অনুগ্রহ নয়, আত্মরক্ষা যদি বলি!
আত্মরক্ষা! আপনি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন?আমি জ্বলে উঠলাম, শত্রুকে বাঁচাবার চেষ্টা আপনার আত্মরক্ষা!
কথাটা একটু গোলমেলে বটে! সোলোমাস হাড়-জ্বালানো হাসি হেসে বললেন, আমি অবশ্য বলতে পারি, শত্রুকে বাঁচানোই এ ক্ষেত্রে আমাদের আত্মরক্ষা। ফরিদ সাহেব আহাম্মুক, তাই না বুঝে শুনে অমন গুলি ছুঁড়েছিল! আপনি মারা গেলে আমাদের নিজেদেরই তো সর্বনাশ। যা খুঁজছি তার পথ দেখাত তা হলে কে!
এই তা হলে আপনার কৈফিয়ত? কিন্তু মারা তো আরেকটু হলে গিয়েছিলাম, টিপটা একটু না দৈবাৎ ফসকালে!
দৈবাৎ যেটা ভাবছেন, তার পিছনে মানুষের হাতও তত থাকতে পারে? এই সোলোমাসেরই হাত?
আমি বিস্ময় সামলে ওঠার আগেই সোলোমাস এবার গম্ভীর হয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমিই গুলি ছোঁড়বার সময় হঠাৎ চমকাবার ভান করে হাতটা তার একটু ওপর দিকে নাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
কেন? তখনও তো আপনি জানেন না যে আমিই ওখানে আছি।
ঠিক জানি না, কিন্তু আশা একটু করছিলাম বই কী! আপনার এত খবর আমরা রাখছি, আর আপনি আমাদের এই ডেরার খবর নিতে একবার আসবেন না তদন্তে, এ কি হতে পারে।
মনে মনে লজ্জিত হয়ে অবশ্য স্বীকার করলাম যে ইবন ফরিদকে ঠিক বুঝেও সোলোমাসকে একেবারেই সন্দেহ করতে পারিনি। মুখে কিন্তু ঝাঁজের সঙ্গে বললাম, আমি আসব—তাও জানতেন, এসেছি কি না এসেছি ঠিক না জেনেই প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করেছেন, এখন আবার আমারই অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন! আপনার রহস্যটা কী বলুন তো? সাপ নেউল দুই-এর মাথাতেই হাত বুলোতে চান নাকি?
একরকম প্রায় ধরে ফেলেছেন! অন্তত ফরিদ সাহেবের খুব হিতৈষী যে নয় বোঝা উচিত।
হিতৈষী তা হলে কার? সন্দিগ্ধ ভাবে জিজ্ঞাসা করলাম।
আপনাদের। সোলোমাসের এবার স্পষ্ট উত্তর।
তা হলে ফরিদ সাহেবের দলে কেন?
চোরের উপর বাটপাড়ি করবার জন্য। সোলোমাস হাসলেন।
হাসিতে চটে গিয়ে বললাম, বিশ্বাস করব কীসে?
প্রমাণ দিলে। সোলোমাসের জবাবে কোনও দ্বিধা নেই।
দিন প্রমাণ তা হলে! আমি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সোলোমাসের দিকে তাকালাম।
ধরুন, যদি বলি রেনে লাভাল? সোলোমাসের মুখে ঈষৎ হাসি দেখা গেল।
ওনাম শত্রুরা সবাই জানে।আমিও অবিশ্বাসের হাসি হাসলাম এবারে।
তাহলে এমন কিছু বলি যা শত্রুদের জানবার কথা নয়?
তাই তো শুনতে চাইছি, আমি কড়া গলায় বললাম।
মোট একশো সাঁইত্রিশ। বলে সোলোমাস আমার দিকে চেয়ে মুচকে মুচকে হাসতে লাগলেন।
আমি তখন সত্যই চমকে গেছি। কোনও রকমে সামলে জিজ্ঞাসা কমলাম, কি রকম মিলিয়ে?
পাঁচ, চটপট জবাব দিলেন সোলোমাস।
আমি সত্যই তাজ্জব।
আমরাও। গৌর তো বলেই ফেলল, ভারী মজার ধাঁধা তো ঘনাদা!
হ্যাঁ, সাঙ্ঘাতিত মজার! সে মজার ধাঁধার উত্তর খুঁজতে বাঘা বাঘা বৈজ্ঞানিকেরা সারা দুনিয়ায় তখন হিমসিম খাচ্ছে, আর শয়তানেরা ছলে বলে কৌশলে তা আদায় করবার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘনাদা সিগারেটটায় কয়েকটা রাম টান দিয়ে ফেলে দিয়ে বলতে শুরু করলেন, সোলোমাস অন্তত সে শয়তানের দলের নন এটুকু তখনই বুঝলাম। কারণ, যেটুকু তিনি বলেছেন শয়তানের কারুর তা কল্পনারও বাইরে। কিন্তু সত্যি সোলোমাস তাহলে কে? শত্রুর দলে তিনি এমন করে পরিচয় ভাঁড়িয়ে আছেনই বা কেন? চোরের ওপর বাটপাড়ি করাই তাঁর উদ্দেশ্য বলছেন। সত্যিই কি তাই? চোরের ওপর বাটপাড়ি তিনি করছেন কী স্বার্থে! কার হয়ে?
এসব প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরছিল বলেই খানিকক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
সোলোমাসই হেসে বললেন, আপনি খুব মুশকিলে পড়েছেন বুঝতে পারছি, দাস। আরও একটা প্রমাণ তাই দিচ্ছি। এমন অকাট্য প্রমাণ যা পেলে অবিশ্বাসের আর কোনও কারণ থাকবে না আশা করি।
একটু থেমে যেন আমার মুখের ভাবটা পরীক্ষা করে সোলোমাস বললেন, আপনার এখান থেকে নাইরোবি যাবার কথা। কেমন ঠিক না?
এবার আমি একেবারে থ! আমায় গোপন নির্দেশ যে পাঠিয়েছে, সে এবং আমি ছাড়া দুনিয়ায় এ-খবর কারুর জানার কথা নয়। আড্ডিস আবাবা থেকে যে নাইরোবি যেতে হবে, এ-খবর আমি নিজেই ইয়েমেন থেকে রওনা হবার আগে জানতাম না। ঠিক রওনা হবার কিছু আগে সুইজারল্যান্ডের এক ব্যাঙ্কের ছাপমারা লেফাফার ভেতর সংকেতলিপিতে এই নির্দেশ এসেছে যে, আড্ডিস আবাবার বিশেষ একটি হোটেলে কদিন থেকে আমি যেন নাইরোবিতে রওনা হই। সেখান থেকে কোথায় যেতে হবে তার নির্দেশ নাইরোবির একটি সুইস ব্যাঙ্কের শাখাতেই পাব।
