ডোকপা লোকটা কাজের। একদিন খেয়ে দেয়ে একটু চাঙ্গা হয়েই শুধু কাজের গুণে সে ব্রুলের নজরে পড়ে গেল। তাঁবু পরিষ্কার, বন্দুক সাফ থেকে সাহেব-সুবোর হেন কাজ নেই, সে জানে না।
দুদিন বাদে তাকে দিয়ে হ্যাসাক বাতি সাফ করাতে করাতে ব্লুল হঠাৎ একটা বুটের (ঠাক্কর দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, এই বেটা ভূত! এসব সাহেব-সুবোর কাজ শিখলি কোথায়?
আজ্ঞে, হেডিন সাহেবের সঙ্গে ছিলাম যে কবার।
হেডিন সাহেব! বুল অবাক। কে হেডিন?
আজ্ঞে গরিবের মা বাপ সোয়েন হেডিন।
ব্রুল সাহেব এবার যেন একটু হতভম্ব। সোয়েন হেডিনের সঙ্গে তুই কাজ করেছিস। তিব্বতের এ-অঞ্চল তো তুই তা হলে জানিস কিছু?
আজ্ঞে তা আর জানি না! এমন সব পাহাড়, নদী, হ্রদের খবর রাখি, এ দেশের লোকেরাও যার নাম জানে না।
বেশ বেশ! তোকে আমার কাজে লাগবে। বলে ব্রুল বেরিয়ে গেল, তার পরদিন তাঁবু উঠিয়ে নতুন পথে রওনা হবার ব্যবস্থা করতেই বোধহয়।
পরের দিন পর্যন্ত ঢুলকে অপেক্ষা করতে হল না।
সেদিনই বিকেলের দিকে কাছাকাছি বুঝি শিকারে গেছল একটু। সন্ধের পর ফিরে এসে ঘরে ডোকপাকে দেখে একটু বিরক্তই হয়ে উঠল।
কী করছিস কী এখানে এখন, ভূত কোথাকার!
হ্যাসাক বাতিটা তুলে এদিক ওদিকে ঘোরাতে ঘোরাতে ডোকপা বললে, আজ্ঞে, একটা জিনিস খুঁজছি।
জিনিস খুঁজছি! হতভাগা জানোয়ার! এটা তোমার জিনিস খোঁজবার সময়! কী খুঁজছিস, কী?
আজ্ঞে, একটু জল।
জল! প্রথমটা ব্লুল হাসবে না রাগবে ঠিক করতে পারল না। তার পরমুহূর্তেই তার প্রকাণ্ড বাঘের মতো মুখখানা লাল হয়ে উঠল রাগে। হুংকার দিয়ে বললে, কী এখানে খুঁজছিস?
আজ্ঞে একটু ভারী জল, ডিউটোরিয়াম অকসাইড।
পায়ের তলায় হঠাৎ পৃথিবীটা সরে গেলেও ঝুল বোধহয় এমন চমকে উঠে ফ্যাকাশে মেরে যেত না। সামলাতে তার কিন্তু বেশিক্ষণ লাগল না। তবে রে, শয়তান! বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা! বলে পাক্কা সাড়ে ছফুট দুমনী লাশটা নিয়ে ডোকপার ওপর এবার সে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অত বড় লাশটা তো আর চারটিখানি কথা নয়! একদিকের দড়ি ছিঁড়ে তাঁবুর একটা কোণ ঝুলে পড়ল।
হ্যাসাক বাতিটা একটু সরিয়ে রেখে বললাম, তাঁবুটা বড়ই ছোট। এর মধ্যে অত লাফালাফি দাপাদাপি কি ভাল?
বাপি দত্ত হঠাৎ লাফ মেরে উঠল উত্তেজনায় ও! আপনিই তাহলে ডোকপা! আমিও তাই ভাবছিলাম, ডোকপাটা এল কোথা থেকে।
করুণামিশ্রিত অবজ্ঞার সঙ্গে বাপি দত্তর দিকে একবার চেয়ে ঘনাদা আবার শুরু করলেন, গা-টা ঝেড়ে ঝুড়ে উঠে বুল বেশ একটু হতভম্ব হয়েই আমার দিকে এবার তাকাল। যা শিক্ষা ওইটুকুতেই হয়েছে তাতে গায়ের জোর পরীক্ষা করবার উৎসাহ আর তার তখন নেই। কিন্তু ভেতরের জ্বালা যাবে কোথায়! গলা দিয়েই সেটা বেরুল আগুনের হলকার মতো—কে তুই! কী মতলবে এখানে ঢুকেছিস?
বললাম তো, শুধু একটা ভারী জলের খোঁজে। এক শিশি যে-জল এই হাইড্রোজেন বোমার যুগে বেচলে সারা জীবন পায়ের ওপর পা দিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায়। ড. ক্যালিও প্রাণের মায়া ত্যাগ করে এই সদুর তিব্বতে এসে যে ভারী জলের এমন স্বাভাবিক এক গুপ্ত হ্রদ খুঁজে পেয়েছেন, পিপে পিপে চালান দিলেও যা একশো বছরে ফুরোবে না। ড. ক্যালিও কাজ সেরে দেশে ফেরবার মুখে নিরীহ সাধারণ পর্যটক ভেবে যে-জলের হ্রদ আবিষ্কারের কথা তোমার মতো শয়তানকে বলেছিলেন, আর ড. ক্যালিওর কাছে যে জলের হ্রদের গুপ্ত মানচিত্র কেড়ে নিয়ে তাঁকে তুষার ঝড়ের মধ্যে একলা মরতে ছেড়ে দিয়ে তুমি এখন হ্রদের সন্ধানে চলেছ।
এসব কথা তুই জানলি কী করে! রাগে বিস্ময়ে ব্রুলের গলাটা তখন কাঁপছে।
জানলাম ড. ক্যালিওর কাছে।
হতে পারে না! বুল চেঁচিয়ে উঠল, ড. ক্যালিওকে কথা বলবার অবস্থায় আমি রেখে আসিনি।
তাই নাকি! শয়তানের নিজের মুখের এই স্বীকারটুকুই চাইছিলাম।
কোথা থেকে তুই জানলি আগে বল। ব্লুল পারলে আমায় ছিঁড়ে খায়।
তাহলে শোন। জানলাম ড. ক্যালিওর ভূতের কাছে!
ভুতের কাছে! ব্রুল বুঝি খেপেই যায়।
হেসে বললাম, হ্যাঁ, ভূতের কাছে। আর জেনেছি যে ঠিক তাতে কোনও সন্দেহ আছে কি?
কিন্তু জেনে তোর লাভ কী! হঠাৎ ব্রুল তাঁবুর ধারে রাখা তার বন্দুকটা তুলে নিয়ে আমার দিকে উঁচিয়ে তার চাল আর গলা দুই-ই পালটে ফেললে, এ-জলের হ্রদ কি তুই কখনও খুঁজে পাবি ভেবেছিস? আর পেলেও তোর মতো কালো মর্কটের কাছে ও-জল কিনবে কে?
বিদ্রুপের হাসি হাসতে গিয়ে হঠাৎ ব্রুল থমকে আমার দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল। টুপি সমেত মাথার চুলটা আর তিব্বতিদের চেহারার ধরনের সামান্য যে কটা দাড়ি-গোঁফ মুখে ছিল তা আমি তখন খুলে ফেলেছি।
দাস।
হ্যাঁ, মূলার, সেই দাস, তোমার সঙ্গে অনেক দিনের বোঝাপড়া যার বাকি। ড. ক্যালিও তোমায় নিরীহ ব্রুল বলেই জেনেছিলেন। কিন্তু আমি তোমার আসল পরিচয়টা ভুলিনি-বিজ্ঞানের কলঙ্ক, জালিয়াৎ খুনে ফাঁসির আসামি জেল-পালানো মূলার! জীবনের প্রথমে ল্যাবরেটরির রেডিয়াম চুরি করে ধরা পড়ার পর অনেকবার যে নাম পালটেছে, সে-ই!
মূলার এবার সত্যিই হো হো করে হেসে উঠল, যাক, ভালই হয়েছে, দাস, নিজে থেকে এ সুযোগটা আমায় দিয়েছ বলে। মূলার নামটা যারা ভোলেনি তাদের সংখ্যা আমি কিছু কমাতে চাই।
মূলার বন্দুকটা আমার দিকে বাগিয়ে ধরল। হেসে বললাম, শিকার করে তো এই ফিরলে বন্দুকে আর টোটা আছে কি? হিংস্রভাবে হেসে মূলার জবাব দিলে, আছে একটাই আর সেই একটাই তোমার মতো মর্কটকে মারবার পক্ষে যথেষ্ট।
