আমরা শিশিরের ওপরেই চটে উঠলাম, বুঝতে পারেনি বললেই হল। নামে গোলমাল থাক, ঠিকানা তো ছিল, আর বিদেশের চিঠিতে নামের বানান তো কতরকম হতে পারে। ঘনাদার কি শুধু ইংরেজেদের সঙ্গেই কারবার! জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান কার সঙ্গে নয়?
না, দোষ কিন্তু শিশিরের! শেষ পর্যন্ত আমরা শিশিরের ওপরেই গিয়ে পড়লাম, চিঠিটা ও কী বলে ফেরত দিলে?
খুব অন্যায় হয়েছে আমার! অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্য শিশির যেন সিগারেটের টিনটা খুলে ধরল।
ঘনাদা অন্যমনস্ক ভাবে তা থেকে একটা তুলে নিতেই আর আমাদের পায় কে? চিঠিটা কোনও জার্মানের লেখা বোধহয়। শিবুই জল্পনা শুরু করে দিলে সোৎসাহে, ঘনাদাকে সেখানে হের ডস নামেই তো সবাই চেনে।
গৌর প্রতিবাদ জানালে, না, না, নিশ্চয়ই ফরাসি কেউ লিখেছে। কী শিশির নামের আগে সঁসিয়ে ছিল না?
মঁসিয়ে নয়, সেনর বলে মনে হচ্ছে। ইটালি থেকে কেউ লিখেছে বোধহয়। তাই? প্রশ্নটা শিশিরকেই করলাম।
শিশির অপরাধীর মতোই স্বীকার করলে চিঠির নামের আগে কী লেখা ছিল সে লক্ষই করেনি।
তা লক্ষ করবে কেন? তা হলে যে কাজ হত! বলে শিশিরকে ধমকে গৌর সোজা ঘনাদাকেই প্রশ্ন করলে, চিঠিটা কোথা থেকে কে পাঠিয়েছিল কিছু বুঝতে পারছেন?
কয়েকটা উৎকণ্ঠিত মুহূর্ত। পাল্লা কোনদিকে হেলবে? সন্ধি, না বিগ্রহ?
শিবু হঠাৎ পাল্লায় পাষাণ চড়িয়ে দিলে আলসে থেকে ঝুঁকে ঠাকুরকে চিৎকার করে ডেকে, আমাদের কবিরাজি কাটলেটগুলো আর চা ওপরেই নিয়ে এসো ঠাকুর। ঘনাদার দিকে ফিরে সলজ্জভাবে বিশদ বিবরণও দিয়ে দিলে, স্পেশা , অর্ডার দিয়ে আনিয়েছি আজ!
ওই পাষাণটুকুতেই পাল্লা হেলল। কাটলেটের কথা যেন শুনতেই পাননি এইভাবে ঘনাদা আগেকার প্রশ্নটাকেই তুলে ধরলেন, চিঠিটা কোথা থেকে কে পাঠিয়েছে, জানতে চাও, কেমন?
আমরা ঘনাদার আগেই তাঁর ঘরের দিকে পা বাড়িয়ে বললাম, হ্যাঁ, হঠাৎ বিদেশ থেকে ইনসিওর করা চিঠি!
ততক্ষণে ঘনাদার ঘরে আমরা ঢুকে পড়েছি। নীচে থেকে বড় ট্রেতে করে চা আর কাটলেটের ডিসও এসে গেছে।
ঘনাদা তাঁর তক্তপোশটিতে সমাসীন হয়ে অন্যমনস্ক ভাবে একটা কাটলেট তুলে নিয়ে বললেন, চিঠিটা হঠাৎ নয় হে, এই চিঠি…
কথাটা আর শেষ করা তাঁর হল না। পরপর চারটি স্পেশাল অর্ডার দেওয়া কবিরাজি কাটলেট যথাস্থানে প্রেরিত না হওয়া পর্যন্ত কথাটার সঙ্গে আমরাও মাঝপথেই ঝুলে রইলাম।
কাটলেটের পর ডান হাতের তর্জনী ও অনামিকার মধ্যে শিশিরের গুঁজে দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া সিগারেটটিতে দুবার সুখটান দিয়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে তিনি বাক্যাংশটি শেষ করলেন।
…অনেকদিন আগেই আসার কথা।
তাহলে কে পাঠিয়েছে বুঝতে পেরেছেন! আমরা যেন অবাক!
তা আর বুঝিনি! ওই নামের বানান দেখেই বুঝেছি। আমার নামের বানান শুধু একজনেরই করা সম্ভব। আজ ছ-বছর ধরে তার এই চিঠির জন্যই দিন গুনছি!
ছ-বছর ধরে! খুব দামি চিঠি নিশ্চয়? শিশির চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞাসা করলে।
ধমকে বললাম, দামি না হলে ইনসিওর করে।
ঘনাদা কিন্তু একটু বিদ্রুপের হাসি হাসলেন, ইনসিওর তো নামে, নইলে ও-চিঠি ইনসিওর করার খরচা দিতে পেরুর ট্রেজারি ফতুর হয়ে যেত!
এবার নির্ভাবনা হয়ে কপালে চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করলাম, চিঠিটার এত দাম?
কী ছিল ওতে? হিরে-মুক্তো? সরলতার প্রতিমূর্তি হয়ে জিজ্ঞাসা করলে শিবু।
দুর! হিরে-টিরে হলে তো ভারী হত! আর হিরের দাম যতই হোক ইনসিওর করবার খরচ দিতে ট্রেজারি ফতুর হয় নাকি? শিশির শিবুর মৃঢ়তায় বিরক্ত হয়ে উঠল।
কিন্তু পেরুর ট্রেজারি কেন? গৌর একেবারে সার কথাটা ধরে বসল, চিঠিটা পেরু থেকে এসেছিল নাকি?
ঘনাদা একটু হেসে আমাদের উগ্রীব মুখগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, হ্যাঁ, পেরুর কুজকো শহর থেকে ডন বেনিটো ছাড়া আর কেউ ও-চিঠি পাঠাতে পারে না।
কিন্তু কী ছিল ওতে? আমরা উদগ্রীব।
আমাদের যথারীতি কয়েক সেকেন্ড রুদ্ধ নিশ্বাসে অপেক্ষা করিয়ে রেখে ঘনাদা ধীরে ধীরে বললেন, ছিল কটা রঙিন সুতো।
সুতো! আমরা এবার সত্যিই হতভম্ব।
সুতো মানে এই কার্পাসের তুলো থেকে যে সুতো পাকানো হয়? শিবুর মুখের হাঁ আর বুজতে চায় না।
হ্যাঁ, গাঁটপড়া রঙিন খানিকটা সাধারণ সুতোলি? ঘনাদা আমাদের দিকে সকৌতুক অনুকম্পার সঙ্গে তাকিয়ে বললেন, ওই সুতোর জট ক-টা পেলে, আমেরিকা এ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে যেখানে যত ধার দিয়েছে, সব শোধ করে দেওয়া যায়। শুধু ওই গাঁটপড়া সুতোলি ক-টার জন্য গত সওয়া চারশো বছরে সওয়া চার হাজার মানুষ অন্তত প্রাণ দিয়েছে!
আমাদের এবার আর অবাক হবার ভান করতে হল না। গৌর শুধু ধরা গলায় কোনও রকমে জিজ্ঞাসা করলে, তা ওই সর্বনাশা সুতো আপনার কাছে পাঠাবার মানে?
মানে? মানে কিংকাজুর ডাক। কিংকাজু একরকম ভাম। মরণ নিশ্চিত জেনেও তার ডাক সেদিন চিনতে না পারলে এ গল্প শুনতে পেতে না। তবে ঘনাদা একটু হাসলেন। মানে ভাল করে বুঝতে হলে বারো বছর আগের ব্রেজিলের মাত্তো গ্রসোর এমন একটি জঙ্গলে যেতে হয় কোনও সভ্য মানুষ যেখান থেকে জীবন্ত কখনও ফিরে আসেনি।
সেই ভরসায় আপনি বুঝি সেখানে গেছলেন? দুম করে কথাটা বলে ফেলে শিশির একেবারে কুলের কাছে ভরাড়ুবি প্রায় করেছিল আর কী!
কিন্তু কবিরাজি কাটলেটের গুণ অনেক। শিশিরের কথা ঘনাদার যেন কানেই গেল না।
