আসুন, আসুন, ভেতরে আসুন। ভদ্রলোক অমায়িক। ঘনাদা রোগা লম্বা শুকনো, ইনি মোটা বেঁটে এবং দিব্য গোলগাল। কিন্তু তবু কোথায় যেন মিল আছে! সে মিল ভাল করেই কিছুক্ষণ পরে টের পেলুম, কিন্তু তখন দরজায় আমাদের অবস্থা ন যযৌ ন তস্থৌ।
আমতা আমতা করে বললাম, না, ভেতরে আর যাব না। আমরা আসি।
আসবেন কী! বিলক্ষণ! ছুটোছুটি করে এসে দরজা থেকেই ফিরে যাবেন!
ব্যাপারটা একটু বিসদৃশই বটে। এসে যদি চলে যাই তা হলে এত হন্তদন্ত হয়ে আসবার মানেটা কী! তবু কাঁচুমাচু হয়ে বোঝাবার একটু চেষ্টা করলাম, না, মানে আমরা ভেবেছিলাম–আমাদের ঘনাদা এ-ঘরে থাকতেন কিনা!
ঘনাদা! ভদ্রলোক যেন চিন্তিত।
আমরা বুঝিয়ে বললাম, হাঁ, নাম ঘনশ্যাম দাস। এই মেসে অনেকদিন ধরে ছিলেন কিনা—
হঠাৎ হো হো হাসিতে আমরা চমকে উঠলাম।
ভদ্রলোক বেশ কিছুক্ষণ হেসে নিয়ে তারপর বললেন, ঘণ্টা!
ঘণ্টা! আমরা তাজ্জব।
হাঁ, হাঁ, আমাদের ঘণ্টা!ভদ্রলোক এবার আরও একটু বিশদ হলেন, আপনারা যাকে ঘনাদা বলতেন সেই হল আমাদের ঘণ্টা। হাঁ মনে পড়েছে বটে, ঘণ্টা এই রকম একটা মেসে কোথায় থাকত বলেছিল। তারপর গল্প-টল্পও দু-চারটে শুনেছি।
আপনি ঘনাদাকে চিনতেন? আমরা উদগ্রীব।
চিনতাম বই কী! ভদ্রলোক হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কিন্তু ঘণ্টা তো আর ফিরবে না।
ফিরবে না! কেন? আমরা ঘরের ভিতর তখন ঢুকে পড়েছি।
কানের প্লাগ খুলে গেল যে!
কানের প্লাগ! খালি তক্তপোশটায় কখন সবাই বসে পড়েছি টেরও পাই নাই। ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, কানের প্লাগ খুলে গেল মানে।
মানে? মানে বোঝাতে অনেক দূর যেতে হবে।ভদ্রলোক চিবুক ও বুকের মাঝে অদৃশ্য গলাটায় হাত বুলিয়ে কড়িকাঠের দিকে মুখ তুলে অনেক দূরেই যেন দৃষ্টি মেলে শুরু করলেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে। এদিকে ইংরেজ-মার্কিন, ওদিকে রুশ, কে আগে বার্লিন দখল করবে তার পাল্লায় রুশদের জিত হয়েছে। বার্লিন একটা ধ্বংস-পুরী। ইংরেজ মার্কিনের বোমা আর রুশদের গোলায় শহর গুড়ো হয়ে যে ধুলো উড়েছে আকাশে, তাই তখনও থিতোয়নি। দিনের বেলাতেই যেন ঝাপসা কুয়াশায় অন্ধকার। ভয়ে ভয়ে পথ চলতে হয়, কোথাও কোনও নড়বড়ে ছাদ কি দেওয়াল মাথায় ভেঙে পড়ে তার ঠিক নেই।
কাইজার উইলহেল্ম স্ট্রাস—চমকে উঠবেন না, ওটা রাস্তার নাম—তা থেকে বেঁকে একটা সরু গলি রাস্তায় চলেছি সেদিন, এমন সময় চমকে উঠলাম!
দাদা।
কাতর ডাকটা আমার পেছন থেকেই, কিন্তু চমকালাম—আওয়াজ শুনে নয়, এই দাঁতভাঙা ভাষার দেশে দাদা বলে বাংলায় কে ডাকতে পারে তা-ই ভেবে।
ফিরে তাকিয়ে দেখি আমাদের ঘণ্টা। অকাজে বেপোট জায়গায় বেঘোরে পড়তে তার জুড়ি নাই। বিরক্ত হয়েই বললাম, তুমি আবার এখানে কোথা থেকে হে।
ঘণ্টা ছুটে এসে আমার হাত দুটো বাড়িয়ে ধরে বললে, সব কথা পরে বলব দাদা, এখন আমায় বাঁচাও।
দিব্যি বেঁচেই তো আছো দেখছি, বাঁচাব আর কী? বলে বিদ্রুপ করে আবার মায়াও হল একটু। বললাম, কী ফ্যাসাদ আবার বাধিয়েছ শুনি।
ঘণ্টা কিছু বলবার আগেই হঠাৎ বড় রাস্তার দিকে মেশিন-গান পটপটিয়ে উঠল। চোখের পলক পড়তে না পড়তে ঘণ্টা আর সেখানে নাই। এক দৌড়ে রাস্তার ধারে এক বোমা-ভাঙা বাড়ির শুকনো এক চৌবাচ্চায় গিয়ে তখন সেঁধিয়েছে। সেখানে গিয়ে ধরতেই কাঁপতে কাঁপতে বললে, ফ্যাসাদ দাদা ওই।
অবাক হয়ে বললাম, আরে, ও তো বেওয়ারিশ বাড়ি-ঘর পেয়ে যুদ্ধের গোলমালে যারা লুটপাটের ফিকিরে আছে তাদের রুশ সান্ত্রীরা গুলি করছে। তোমার ওতে ভয়টা কীসের?
ভয়টা কীসের তো বলে দিলে! আমার চেহারাটা কি লুটেরার বদলে দেবদূতের মতো যে, সান্ত্রীরা আমায় ছেড়ে কথা কইবে।
ঘণ্টার কাঁদুনি শুনে হাসিই পেল একটু, বললাম, চেহারা তোমার যা-ই হোক না, মিলিটারি পাস তো আছে।
হাঁ, মিলিটারি পাস! আমি কি রুজভেল্ট চার্চিলের ইয়ার, না স্টালিনের দোস্ত যে মিলিটারি পাস পাব! প্রাণটা নিয়ে ইদুরের মতো এই ক-দিন বার্লিন শহরে লুকোবার গর্ত খুঁজে ছুটোছুটি করছি। কখন ধরা পড়ি কে জানে?
এবার পিঠ চাপড়ে তাকে সাহস দিয়ে বললাম, আচ্ছা ভয় নাই, মিলিটারি পাসের ব্যবস্থা তোমায় করে দেব।কিন্তু মরতে এই শহরে এমন সময় কেন এসেছিলে বলো তো?
ভরসা পেয়ে ঘণ্টা তখন একটু চাঙ্গা হয়েছে। বললে, বেশি কিছু নয়, দাদা একটা হিসাবের কল। তার একটা সুলুক সন্ধান নিয়ে যেতে পারলেই মোটা বকশিশ পেতাম। কিন্তু কারিগর সমেত সেকল এখন রুশদের গোলায় কোন পাতালে চাপা পড়েছে কে জানে!
না হেসে আর পারলাম না। বললাম, সাগর ডিঙোতে তোমার মতো ব্যাঙকে যারা পাঠিয়েছে তাদেরও বলিহারি! আরে, ওটা সামান্য হিসাবের কল নয়, পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য ইলেকট্রোনিক ব্রেন, আর ও যন্ত্র যিনি তৈরি করে বিজ্ঞানের জগতে যুগান্তর এনেছেন তাঁর নাম হল ড. বেনার। ওদিকে মিত্রশক্তি আর এদিকে রাশিয়া তাঁকে পাবার জন্য অর্ধেক রাজত্ব এখুনি দিতে প্রস্তুত। কিন্তু পাবে কোথায়? সে গুড়ে বালি! ড. বেনার মারাও যাননি, তাঁর যন্ত্রও কোথাও চাপা পড়েনি। মিত্রশক্তি যেদিন নরম্যান্ডির কূলে নেমেছে, তিনটে স্পরকেল সাবমেরিনে তাঁর যন্ত্রপাতি সাজসরঞ্জাম চড়িয়ে সেদিনই তিনি উধাও।
হতভম্ব হয়ে ঘণ্টা এবার শুধােলে, এত কথা তুমি জানলে কী করে, দাদা?
কী উত্তর আর দেব। হেসে বললাম, এই বার্লিন শহরে ঘাস কাটতে কি অলিগলি ঘুরে বেড়াচ্ছি মনে করো?
