এ জাহাজের রহস্য তা হলে আছে কিছু! দামি জিনিসের মধ্যে আমি তো লুকোনো সিন্দুকে এক বান্ডিল কাগজই দেখলাম।
সে কাগজ তুলে ঘেঁটেছিস তা হলে? বেনিটোর রাগের পারা চড়ছে।
তা ঘেঁটেছি বইকী, তবে নিইনি যে কিছু সে তো তুমি নিজেই গুনে দেখেছ।
আমার নির্বিকার ভাবটাই বুঝি বেনিটোর বেশি অসহ্য।
না নিলেও, টুকে যে রাখিসনি তাতে বিশ্বাস কী!
ও বাবা, ওই বিদঘুটে মাথা-গুলোনো এক বান্ডিল অঙ্ক আমি টুকব, এইটুকু সময়ে!
যা-ই করে থাকিস, নিস্তার তোর নেই। এ জাহাজের রহস্য জেনে কেউ জ্যান্ত ফেরে না। ডেকস্টার মতোই তোকে হাঙরদের ভোজে লাগাবার ব্যবস্থা করছি এখুনি। তবে তোর ওই কেলে মাংস হাঙরেও বোধ হয় ছোঁবে না।
তা হলে তোমার মতো যে মাংস হাঙরের পছন্দ তাই তাদের পাতে দিলে ভাল হয় না?
কী বলব, খ্যাপা গোরিলা না ষাঁড়, না দুই-এর একত্র সম্মিলনের মতো বেনিটো এবার আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
জামাটা ঝেড়ে নিয়ে আর একটা সিগারেট ধরিয়ে বললাম, অনেক দিনের অনেক কিছুর শোধ নেবার আছে বেনিটো, এত তাড়াতাড়ি কীসের?
ঘাড়মুড় গুজে কেবিনের যে ধারে বেনিটো পড়েছিল সেখান থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে এবার সে সাবধানে আমার দিকে এগুতে লাগল। তাড়াহুড়োয় কিছু হবে সে বুঝেছে।
কাছাকাছি এসেই সাঁড়াশির মতো দু হাত দিয়ে সে আমায় জাপটে ধরতে গিয়ে সেই যে পড়ল আর ওঠবার নাম নেই। রদ্দাটা অত জোর হবে ভাবিনি।
কোমর ধরে তুলে তাকে কামরার সোফাটার ওপর বসিয়ে দিলাম।
পরমুহূর্তেই দেখি তার পিস্তল আমার দিকে তাক করা। আমি তাকে ধরে তোলবার সময় সুযোগ পেয়ে সে পকেট থেকে সেটা বার করেছে।
এইবার শয়তান? শয়তানের মতোই বেনিটোর মুখের হাসি—বল, কী করেছিস আমার সিন্দুকের কাগজপত্র ঘেঁটে?
সিগারেটে একটা টান দিয়ে বললাম, আর বলে লাভ কী! বললেও যা না বললেও তা-ই। মরতে তো হবেই।
না, সত্য কথা যদি বলিস তো একটা সুযোগ তোকে দেব।
শুনতে পাই সুযোগটা?
এই জাহাজ থেকে সাঁতরে দ্বীপে যাবার সুযোগ।
হেসে বললাম, ডেকস্টাকেও এই সুযোগই তো দিয়েছিলে, কিন্তু এখানকার হাঙরগুলো যে বড় হ্যাংলা।
এখনও রসিকতা! বেনিটো চিৎকার করে উঠল, এ পিস্তলটা কি রসিকতা মনে হচ্ছে?
পাগল, বিশেষত তোমার মতো আনাড়ির হাতে। কিন্তু যা বলব শুনলে যদি তোমার মেজাজ আরও খারাপ হয়?
তবু শুনতে আমি চাই। বেনিটো হুংকার দিলে।
তবে শোনো, নেহাত যখন ছাড়বে না। ও কাগজপত্রের আমি ফোটো নিয়েছি।
ফোটো নিয়েছিস?
হ্যাঁ, নির্ভুল মাইক্রোফোটো যাকে বলে, এক এক করে সব পাতার।
অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নিল বেনিটো, কোথায় সেসব ফোটো?
সেসব তো আর এ-জাহাজে নেই।
জাহাজে নেই! উত্তেজনায় বেনিটো উঠে দাঁড়াল, কোথায় ফেলেছিস!
ফেলব কেন! পাঠিয়ে দিয়েছি। আশ্চর্য যে guided missile অর্থাৎ দূর থেকে চালানো অস্ত্রের এখানে পরীক্ষা চালাচ্ছ, অস্ত্র পরীক্ষার সঙ্গে রসিকতার লোভ সামলাতে না পেরে টরপেডোর মতো যে জলে-ডোবা অস্ত্র দিয়ে টুনি শিকারিদের ছিপের সুতো কেটে নীলিমাকে অজেয় করে তুলে সবাইকে থ করে দিয়েছ, সেই টরপেডো দিয়েই নিউপোর্ট-এর সমুদ্রকূলে সে-সব ফোটো পাঠিয়ে দিয়েছি। খবর যাদের দেওয়া আছে তারা কাল সকালেই সমুদ্রতীর থেকে টরপেডো তুলে তা খুলে সে-সব ফোটো উদ্ধার করবে।
মিথ্যা কথা? বেনিটোর আর্তনাদ না চিৎকার বোঝা যায় না! সে টরপেডো একজন ছাড়া কেউ চালাতে জানে না।
যে জানে সে-ই চালিয়েছে। আমার নয়, বেনিটোর পেছনে আর একজনের কণ্ঠস্বর। শীর্ণদেহ, কিন্তু ঋজু সৌম্য চেহারার এক বৃদ্ধ বেনিটোর পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কখন তিনি তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, বেনিটো উত্তেজনার মধ্যে বুঝতেও পারেনি।…
দিশাহারা অবস্থায় তার মুখ দিয়ে কটা অস্ফুট আওয়াজ শুধু বেয়োয়, আপনি— অ্যান-ট-নি…
হ্যাঁ, আমি অ্যান্টনি ফিশার। চুরি করে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে পাঁচ বছর ধরে যাকে দিয়ে ক্রীতদাসের মতো যা খুশি তোমরা করিয়েছ সেই হতভাগ্য নীচ বৈজ্ঞানিক। আমি দুর্বল, মরতে আমি ভয় পাই। তাই তোমাদের হুকুম কাপুরুষের মতো আমি তামিল করেছি। আমায় দিয়ে শুধু এই দূর থেকে চালানো অস্ত্র তোমরা তৈরি করিয়ে নাওনি, যে কোবাল্ট বোমা আজও কেউ তৈরি করতে পারেনি, তার সমস্ত অঙ্ক লিখিয়ে নিয়েছ। সে অঙ্কের খাতা আর তোমাদের শুধু একলার নয়। তার হুমকি দেখিয়ে দুনিয়াকে আর তোমরা ভয় দেখাতে পারবে না, এই আমার সান্ত্বনা। নরপিশাচদের হাতের পুতুল হয়ে যে আমায় থাকতে হবে না তার জন্যে এই মানুষটিকে ধন্যবাদ।
বেনিটোর হাত থেকে তার পিস্তল কেড়ে নিয়ে বললাম, আমায় নয়, ধন্যবাদ দিন সেই ডে কস্টাকে, প্রাণ দিয়ে এ-রহস্যের কিনারা করার ইঙ্গিত যে দিয়ে গিয়েছে।
তার সংকেত-টেলিগ্রাম যে আপনাকেই নিয়ে তা এতদিনে কাল সবে বুঝেছি। টুনা-শিকারির কথাটার ভেতর যে অ্যান্টনি ফিশার নামটা লুকোনো আছে তা আগে মাথাতেই আসেনি।
কিন্তু কিন্তু ফোটো তোলা হল কীসে? বেনিটো এই হতাশার মধ্যেও জিজ্ঞেস না করে পারেনি। আমি গোপনে কে কী নিয়ে জাহাজে উঠেছে সব সন্ধান রেখেছি। ছোট-বড় কোনও ক্যামেরা তোমার কাছে দেখা যায়নি। ক্যামেরা তোমার ছিল কোথায়?
আমার কথা শুনেও ক্যামেরা কোথায় ছিল বুঝতে পারছ না!
কথা শুনে মানে? হঠাৎ মানেটা বুঝতে পেরে বেনিটো মেঝের ওপরই হতভম্ব হয়ে বসে পড়ল।
