হুঁ! হুজুরের গলায় আর ঝাঁজ নেই, শোন, তোর সব বেয়াদবি আমি মাপই করে দেব ভাবছি!
হুজুরের কী মহানুভবতা! আমি গদগদ হলাম।
গলাটা আরও একটু মোলায়েম করে হুজুর বললেন, এল ডোরাডো সম্বন্ধে তুই বেশ ওয়াকিবহাল মনে হচ্ছে। তোকে তাই একটা কাজ দিতে চাই।
বান্দা তৈয়ার, হুজুর!
আমার ফৌজি সেলামে একটু ভুরু কোঁচকালেও গলাটা তেমনই মোলায়েম রেখে হুজুর বললেন, সেভিলের কাছ থেকে সেকাগজ আমিই আদায় করব। তারপর তোকে আমার সঙ্গে যেতে হবে সেই গায়নায়। পারিমা হ্রদ খুঁজে বার করে এল ডোরাডোর কুবেরের ভাণ্ডার যদি সত্যি উদ্ধার করতে পারিস, তা হলে তোকে এমন বকশিশ দেব যা তুই ভাবতে পারিস না।
শুনেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, হুজুর! কিন্তু বেচারা কাপলানের কী হবে তা হলে?
কাপলান? মানে সেই বুড়োর বেটা? হুজুর নাক সেটকালেন, সে আবার এর মধ্যে আসছে কোথা থেকে?
আসছে তার বাপের কাছ থেকে। বুড়ো কাপলান হদিস দিয়ে গৈছে বলেই না কুবেরের ভাণ্ডার উদ্ধার করবার আশা করছি। সুতরাং তাকে কী করে বাদ দিই, বলুন? তার চেয়ে আরেক কাজ করুন, হুজুর! সেভিল না ডেভিল যার কাছ থেকে হোক, কাগজটা আমায় ফিরিয়ে দিন। আমি বকশিশ আর আপনাকে কী দেব? একটু বরং আপনার পিঠ চাপড়ে যাই।
বোমার মতো ফাটতে গিয়েও হুজুর কী যেন ভেবে অতি কষ্টে নিজেকে সামলালেন। তারপর তখানি সাধ্য গলাটা খাটো রেখেই বললেন, শেষ সুযোগ তোকে দিচ্ছি, এইটুকু মনে রাখিস। এক কথায় জবাব দে—আমার কথায় রাজি কি না?
বড় ফাঁপরে ফেললেন যে হুজুর! এখন আমাকে দেখছি টি-ম্যালিসেরই শরণ নিতে হয়।
টি-ম্যালিস কে? হুজুর চোখ পাকালেন।
আজ্ঞে, আপনাদের এই হাইতিরই রূপকথার একজন মানুষ। রাজা টি-ম্যালিসের ওপর কী কারণে চটেছেন। টি-ম্যালিসকে তলব করে বললেন-কাল সুয্যি ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমার পদ্মদীঘির সব কটা রাজহাঁস দুয়ে এক বালতি দুধ আনতে হবে। না আনতে পারলে তোমার গর্দান নেব। পরের দিন রাজা ভোরে উঠে বসে আছেন, টি-ম্যালিস আর আসে না। অনেক বেলায় টি-ম্যালিস আসতে রাজা হুংকার দিয়ে উঠলেন—দুধ কই রাজহাঁসের? ডাকো জল্লাদকে এখনই। টি-ম্যালিসের ভ্রুক্ষেপ নেই। বললেন—একটু সবুর করুন হুজুর, আগে আমার ঝামেলাটা শুনুন। কী তোমার ঝামেলা—রাজা রেগে শুধোলেন। আজ্ঞে পিপড়ের কামড়ে আঙুল ফুলে গেছে, দুধ দুইব কী করে? বললে টি-ম্যালিস। তা আঙুল ফোলে কেন? কেন গেছলে পিপড়ে ঘাঁটাতে? রাজা ধমকালেন। কী করি বলুন, নইলে যে সূয্যি ওঠে না— বললে টি-ম্যালিস। সূয্যি ওঠে না! রাজা হতভম্ব। আজ্ঞে হ্যাঁ, মহারাজ! অম্লানবদনে বললে টি-ম্যালিস-মাঠের শেষে ভেঁয়ো পিপড়ের বাসা ছিল, সুয্যি ঠাকুর জানত না। ভোরবেলা যেই উঠতে যাবে অমনই লাল মিঠাই মনে করে একেবারে হেঁকে ধরলে ঝাঁক ঝাঁক পিপড়ে। ছুটে গিয়ে তাই ছাড়াতে বসতে হল। পিপড়ে না ছাড়ালে সুয্যি উঠবে না। আর সুয্যি না উঠলে রাজহাঁসের দুধ আপনাকে দেখাব কী করে? পিপড়ের কামড়ে তাই তো আঙুল ফুলল। রাজামশাই এবার তেলেবেগুন। বললেনধাপ্পাবাজির আর জায়গা পাওনি? সূয্যির গায়ে কখনও পিপড়ে ধরে? ধরে, মহারাজ, ধরে!—টি-ম্যালিস এক গাল হেসে বোঝালে— রাজহাঁসের দুধ দোয়াতে হলেই ধরে!
একটু থেমে মুখ কাঁচুমাচু করে বললাম, আপনার কথায় টি-ম্যালিসের মতোই তা হলে রাজি হতে হয়। কোন সুয্যির গায়ে কী পিপড়ে ধরাতে হবে তা না হয় পরে ভাবা যাবে।
এবার সত্যিই বোমা ফাটল। হুজুর হুংকার ছাড়লেন, তবে রে, চিমড়ে চিমসে ছারপোকা! একটু ঢিলে দিয়েছি বলে কোঁকাকে কাতুকুতু ভেবেছিস! শমনের ডাক তোর এসে গেছে। নে, ইস্টনাম কিছু থাকে তো জপ করে নে।
কিন্তু কটা কাজ যে বাকি আছে, হুজুর! করুণ সুরে নিবেদন করলাম, কাপলানের কাছে ওই কাগজটা আর নতুন এক পাল ম্যানাটি না পৌঁছে দিলে যে কথার খেলাপ হবে।
তা একটু হবে। তবে তুই শুশুক না পৌঁছোত পারিস, তোর ফুটো লাশটা না হয় হাইতির সেন্ট মার্ক উপসাগরের জলে শুশুকদের বদলে হাঙরদের কাছেই পৌঁছে
দেব। হুজুরের মুখে যেন হাঙরেরই হাসি এবার।
বললাম, ধ্যেৎ!
হুজুর শুনেই ভ্যাবাচাকা। লজ্জা লজ্জা ভাব করে এবার বললাম, হাঙরের কামড়ে আমার যে সুড়সুড়ি লাগে। তা ছাড়া কথার নড়চড় আমার যে কিছুতেই হবার নয়। প্রথমবার গায়নায় বাপের খোঁজ না পেয়ে হতাশ হয়ে কাপলান এই হাইতিতে ফিরে এসে রাজনীতির লড়াইতেই মাতে। দ্বিতীয়বার শুশুকগুলোর খোঁজ নিতে গায়নায় গিয়ে, সেগুলো জংলিরা মেরে শেষ করেছে দেখলাম বটে, কিন্তু ভাগ্যক্রমে বুড়ো কাপলানের দেখা পেলাম। তাঁর শেষ খবর নিয়ে হাইতিতে এসে বহু কষ্টে ছোট কাপলানকে খুঁজে বার করি। তারপর কত বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে রাজনীতির নেশা ছাড়িয়ে আবার গায়নায় পাঠিয়েছি। কথা দিয়েছি সেভিলের কাছ থেকে কাগজটা আর, ওই যে বললাম, নতুন একপাল শুশুক নিয়ে তার কাছে দুদিন বাদেই যাচ্ছি। আর দেরি করলে তাই যে আর চলে না, হুজুর!
না, দেরি আর তোকে করতে হবে না। হুজুর রিভলভারের সেফটি ক্যাচটা সরালেন, সেভিল না ডেভিলের কাছ থেকে কী করে কাগজটা নিবি ভেবে রেখেছিস আশা করি।
তা একটু ভেবেছি বই কী! আপনার মতো সাদাসিধে হোঁৎকা কেউ হলে ভাবনারও বিশেষ কিছু নেই।
তাই নাকি! হুজুর রিভলভারটা আমার দিকে উঁচোলেন।
