জবাবে ঘাড়ে একটা রদ্দা খেয়ে যেন নেতিয়ে পড়লাম।
সর্দারের ইঙ্গিতে দুজনে পাঁজাকোলা করে সিঁড়ি দিয়ে আমায় নামিয়ে নিয়ে গেল। নীচে হোটেল ক্লার্ক সভয়ে তার কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছে।
যেতে যেতে করুণ সুরে তাকে বলে গেলাম, তোমাদের হোটেলের বিল কিছু বাকি রইল। বকশিশটাও দিয়ে যেতে পারলাম না!
মাথায় একটা গাঁট্টা দিয়ে যমদূতেরা হোটেলের বাইরে আমায় এনে ফেললে।
একটা কালো রঙের ঢাকা গাড়ি সব আলো নিবিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে। গাড়ির ভেতর আমায় ঢুকিয়ে, সামনে দুজন আর পেছনে দুজন আমার দুপাশে বসে আমার চোখের ওপর একটা কালো রুমাল বেঁধে দিলে।
কাতরস্বরে বললাম, আমি কিন্তু বাবা মুস্তাফা নই।
কী বকছিস, হতভাগা! সর্দার মুখে একটা থাবড়া দিলে। ককিয়ে উঠে বললাম, আমোক মারছ কেন? বাবা মুস্তাফার নাম শোনোনি? আলিবাবার গল্প তো শুনেছ? না শুনে থাকো তো বলতে পারি। খুব মজার।
আর একটা থাবড়া দিয়ে সর্দার বললে, তোর নিজের মজার কথা এখন ভাব, হতভাগা। টু শব্দটি আর করেছিস তো দাঁতগুলো উপড়ে দেব।
অগত্যা ভয়ে ভয়েই যেন চুপ করে রইলাম।
বেশ একটু ঘুরপাক রাস্তায় আধঘণ্টা বাদে এক জায়গায় এসে গাড়িটা থামল। গাড়ি থেকে আমায় টেনে নামিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থাতেই একটা বাড়ির ভেতর নিয়ে গেল তারপর।
যেতে যেতে দুবার আমি কাশলাম, হোঁচট খেলাম একবার সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময়। আর, পায়ে পায়ে জড়িয়ে পড়েই গেলাম একবার প্রায় আছাড় খেয়ে।
হেঁচকা টানে আমায় তুলে প্রায় ঝুলোতে ঝুলোতে একটা বড় ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে সর্দার আমার চোখের বাঁধনটা খুলে দিয়ে বললে, মর্কটটাকে জ্যান্তই এনেছি, হুজুর।
বাঁধা চোখ এতক্ষণ বাদে খোলার পর প্রথমটা মিটমিট করে তাকিয়ে সব একটু ঝাপসা লাগল। তাতেও হুজুর বলে কাকে সম্বোধন করা হয়েছে বুঝতে কষ্ট হল না।
আমি যদি মর্কট হই তা হলে তিনি গোরিলার খুড়তুতো ভাই। সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ করা একটি বেশ বড় ঘরের এক পাশের একটি বিরাট টেবিলের ধারে কয়লার পাহাড়ের মতো বসে আছেন।
তাঁর দিকে কিয়ে বেশ সসম্ভ্রমে কাঁদো কাঁদো গলায় নালিশ করলাম, আপনার
পোষা গুণ্ডাগুলো মিছিমিছি আমায় হয়রান করেছে, হুজুর।
ভাঁটার মতো চোখ দুটো কুঁচকে বিদ্রুপের স্বরে হুজুর বললেন, তাই নাকি? বড় অন্যায় তো!
আজ্ঞে হ্যাঁ, অন্যায় নয়? আমি গলায় সরলতা মাখিয়ে বললাম, আমি পাশের হোটেলে থাকি, সেখান থেকে এখানে আনবার জন্যে আধঘণ্টা এ রাস্তা ও রাস্তা ঘোরাবার কিছু দরকার ছিল?
গোরিলা-হুজুরের চোখ দুটো এক মুহূর্তে আগুনের ভাঁটাই হয়ে উঠল। গুণ্ডা চারটের দিকে ফিরে ইঞ্জিনের স্টিম ছাড়ার মতো আওয়াজ ছাড়লেন, কী শুনছি!
খানিক আগে পর্যন্ত কেঁদো বাঘ হয়ে যে হুঙ্কার ছেড়েছে, সেই সর্দার এক নিমেষে নেংটি ইদুর হয়ে চি চি করে যেন কাতরে উঠল, আমরা হুকুমমতো চোখ বেঁধেই এনেছি, হুজুর! আপনার সামনেই তো ওর চোখের বাঁধন খুললাম।
তা হলে ও জানল কী করে? হুজুর গর্জন করে উঠলেন।
জানি না হুজুর! সর্দারের গলার সঙ্গে সমস্ত শরীরটাই বুঝি তখন কাঁপছে!
নেহাত হাঁদা বেকুফ সেজে বললাম, আপনার হয়ে ওর কানটা মলে দেব, হুজুর?
কী! হুজুর প্রথমটা রাগেই ফেটে পড়বেন মনে হল, তারপর হঠাৎ ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠে বললেন, কান মলে দিবি! তুই? তাই দে, দেখি। অবশ্য যদি নাগাল পাস।
নাগাল ঠিক পাব, হুজুর! কিন্তু গুলিগোলা যদি ছোঁড়ে তাই ভয়!
না, না গুলি ছুঁড়বে না! হুজুর তখন আমার মতো গাঁইয়া একটা উজবুকের নাকাল দেখবার জন্য মেতে উঠেছেন। হুকুম করলেন, রিভলভার ফেলে দে, গোবো।
সর্দার, মানে গোবো, রিভলভারটা খাপ থেকে বার করে ফেলে দিয়ে আবার কেঁদো বাঘ হয়েই আমার দিকে ফিরে দাঁড়াল। আক্রোশে অপমানে তার দাঁত কিড়মিড়ের আওয়াজ পর্যন্ত আমি তখন শুনতে পাচ্ছি।
গাছ থেকে যেন ফুল পাড়তে যাচ্ছি এমনই ভাবে আনাড়ির মতো একটা হাত তুলে গোবোর দিয়ে এগিয়ে গেলাম।
সেই হাত মুচড়ে ধরে গোবো যে ঝটকানি দিলে তাতে মেঝেয় আছড়ে পড়ে যেন কাতরাতে কাতরাতে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আপনার গোবো একটু বেয়াড়া হুজুর! কান মলতে দিতে চায় না!
হুজুরের হাসিতে ছাদটাই বুঝি খসে পড়ে! হাসতে হাসতেই বললেন, তুই কী চাস তা-ই বল। এখনও কান মলার সাধ আছে?
আছে বই কী হুজুর! আমি একেবারে সাদাসিধে ভালমানুষ, ওর কান না মললে আমার মান থাকবে না যে!
এবার হুজুরের সঙ্গে তাঁর বাহনদের হাসিও থামতে চায় না।
হুজুর হাসি থামিয়ে শেষে বললেন, হুঁ, বেজায় মানী লোক তুই বুঝতে পারছি। মানটা যাতে থাকে তা হলে তাই দেখা
যে আজ্ঞে হুজুর! বলে আবার আগের মতোই একটা হাত তুলে এগিয়ে গেলাম। গোবো মোচড় দিয়ে ধরলও হাতটা কষে। তারপর হুজুরের টেবিলটাই মড় মড় করে উঠল দু-মণি গতরটা সচাপটে তার ওপর পড়ায়।
জানি! জানি! ধোবিকা পাট! বিশে আর নিজেকে সামলাতে পারল না উচ্ছাসের চোটে, এই একটি প্যাঁচ ঠিক মতো লাগাতে পারলে কুম্ভকর্ণও কাবু!
না রে না, ধোবিকা পাট নয়, দশরথ মুরুব্বির মতো বিশেকে শোধরালে, ও হল বাংলা কাঁচি।
উঁহু! ওটা হাফ নেলসন! এতক্ষণ ধৈর্য ধরে থেকে গৌর আর ফোন না দিয়ে পারল না।
দূর! স্রেফ জুডো। আমিই বা কেন কম যাই!
উঁহু! সুমো! শিশির আমাদের সকলের উপর টেক্কা দিতে চাইল।
