শুভ সন্ধ্যা, মিঃ স্মিথ। ব’স।
জন অপাঙ্গে ছবিটির কাছে নিয়মিত স্থানে নিয়মিত ফুলের তোড়াটি দেখে অপ্রসন্ন মুখে উপবেশন করল।
আশা করি, আজকের দিনটা আনন্দ কেটেছে।
কালকের দিন যেমন কেটেছিল তার চেয়ে বেশিও নয়, কমও নয়।
মিস এলমার, আমার ইচ্ছা তোমাকে নিয়ে একদিন নৌ-বিহারে যাই। আমরা একখানা নূতন হাউসবোট কিনেছি।
মিস এলমারকে নীরব দেখে জন বলে উঠল, সঙ্গে মিস স্মিথও যাবে।
সেজন্য নয়, নদীর মাঝিদের কোলাহল আমার ভাল লাগে না তার চেয়ে এই বাগানের নীরবতা বড় মধুর।
কিন্তু কর্নেল রিকেট তো তোমাকে মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে নিয়ে যায়।
সে যে নাছোড়বান্দা।
আমি নিরীহ, সেটাই কি তবে দোষ?
কখনও কখনও, হেসে উত্তর দেয় এলমার।
বেশ, তবে এবার থেকে জবরদস্তি করব।
যার যা স্বভাব নয় তেমন আচরণ করতে গেলে আরও বিসদৃশ দেখাবে।
দেখ মিস এলমার, আমি ঐ গোঁয়ারটাকে একদম পছন্দ করি নে। তুমি কি করে ওটাকে সহ্য কর তাই ভাবি।
ও যে জঙ্গী সেপাই, গোয়ার্তুমি করাই ওর ব্যবসা।
লোকটা বড় অভদ্র।
ভদ্রতা করলে লড়াই করা চলে না।
কিন্তু তোমার বাড়ি কি লড়াই-এর মাঠ?
ও হয়তো এ-বাড়িটাকে অপরের বাড়ি মনে করে না।
ঠিক বলেছ, লোকটা এমন ভাবে তোমার ঘরে প্রবেশ করে, যেন এটা ওর পৈতৃক আলয়।
এটাই তো যুদ্ধজয়ের রহস্য।
কিন্তু এ বাড়িতে যুদ্ধজয়ের আশা ওর নেই।
বুঝলে কি করে?
এ তো সহজ ব্যাপার। আত্মম্ভরি লোকটা তোমাকে নিজের যে ছবিখানা উপহার দিয়েছিল—ঐ যে তার উপরে জমেছে ধুলো। আর প্রতিদিন ফুলের তোড়া পড়ে…আচ্ছা মিস এলমার, ছবিটি নাকি একজন কবির-কই নাম তো শুনি নি!
একদিন শুনবে।
আচ্ছা, ও কি গ্রে, বার্ন-এর মত লিখতে পারে?
এই দেখ! একজন কবি কি অপর কবির মত কবিতা লেখে? গোলাপ কি ডালিয়ার মত? তার পর বলে—জান মিঃ স্মিথ, ঐ কবির সঙ্গে আমার একটা চুক্তি হয়েছে।
শঙ্কিত জন শুধায়, কি চুক্তি?
আমি মরলে এমন সুন্দর একটা কবিতা লিখবে যাতে আমার নাম অমর হয়ে থাকবে।
আহা, তুমি মরতে যাবে কেন?
আমি কি অমর হয়ে জন্মেছি?
অন্তত একজনের মনে।
তবে বোধ করি সে অমর। কিন্তু ঠাট্টা ছাড়, আমার মনে হয় কি জান, এখানকার প্রতিকূল আবহাওয়ায় আমি বুঝি বেশি দিন বাঁচতে পারব না।
তার পরে নিজ মনে বলে চলে, কি জীবন! নাচ-গান, হৈ-হল্ল, পান-ভোজন, জুয়ো-আড্ডা, ডুয়েল-মারামারি! অসহ্য। এর মধ্যে লোকে বাঁচে কি করে?
জন বলে, বাঁচে আর কই, কটা লোক পঞ্চাশ পেরোয় কলকাতায়?
তবু তো পঞ্চাশ অবধি জেঁকে–আমি তো কুড়িও পার হতে পারব না।
Three-score and ten! তার আগে তোমাকে মারে কে? সদস্তে সদপে ঘরে প্রবেশ করে সগর্জনে বলে ওঠে জঙ্গী সেপাই কর্নেল রিকেট।
তার পরে টুপিটা টেবিলের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে প্রকাণ্ড একখানা চেয়ারের সর্বাঙ্গে আর্তনাদ উঠিয়ে বসে পড়ে বলে, শুভ সন্ধ্যা রোজি!
শুভ সন্ধ্যা কর্নেল, এই যে এখানে মিঃ স্মিথ আছে।
মিস এলমারের কথায় ফলোদয় হয় না, রিকেট লক্ষ্যই করে না জনকে। তার বদলে উঠে দাঁড়িয়ে তরুণ কবির পদপ্রান্তে লুষ্ঠিত তোড়াটি হস্তগত করে বলে ওঠে–এটা তো আমার প্রাপ্য, অস্থানে কেন?
নীরব ঈর্ষায় জ্বলতে থাকে জন।
তার পর রিকেট নিজের বোম থেকে লাল গোলাপের কুঁড়িটি খসিয়ে নিয়ে মিস এলমারের দিকে এগিয়ে দেয়-সঙ্গে সঙ্গে ফরাসী কায়দায় ‘বাউ’ করে–বলে-Rose to Rose! তার পরে একবার কটাক্ষে জনকে লক্ষ্য করে বলে, ফরাসী ধরনে ‘বাউ’ করার কায়দাটি শিখেছি ম দুবোয়ার কাছে। লোকটা গুণী বটে।
লজ্জায় ঘৃণায় মাটিতে মিশিয়ে যায় জন। মিস এলমারেরও সঙ্কোচের অবধি থাকে।
মিস এলমার, কাল আমরা মস্ত একটা দল নৌকোয় করে সুখচরে যাচ্ছি। খুব হৈ-হল্লা, স্ফূর্তি হবে।
কথায় মোড় ঘুরল এই আশায় মিস এলমার বলল, তাই নাকি, খুব আনন্দের বিষয়। তা কে কে যাচ্ছে?
অনেকেই যাচ্ছে, সঙ্গে তুমিও যাচ্ছ।
রোজ কুষ্ঠিতভাবে বলল—আমার তো ভাল লাগে না।
সঙ্গে আমি থাকলে অবশ্যই ভাল লাগবে।
রোজ আবার মৃদু আপত্তি করল। রিকেট সে সব ঠেলে দিয়ে বলল, ওসব ঠিক হয়ে গিয়েছে। কাল ব্রেকফাস্টের পরে তোমাকে তুলে নিতে আসব।
ম্লান ছায়ার মত সন্তর্পণে প্রস্থান করল জন, তার পক্ষে আর বসে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। প্রেমে ও সঙ্কটে যারা ইতস্তত করে, তাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
নিঃসপত্ন যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ীর অকুণ্ঠিত প্রত্যয়ে কর্নেল বলে উঠল, তুমি অবশ্যই যাচ্ছ–তোমার জন্যেই এত আয়োজন এত খরচ, দেশ থেকে সদ্য আনীত তিন কাস্কেট বী-হাইভ ব্রান্ডি!…নাও, অমন মনমরা হয়ে থেকো না রোজি, চল একটু হাওয়া খেয়ে আসা যাক—আমার গাড়ির নৃতন জন্তুটা দেখবে কেমন ছোটে! চল, রেলকোর্সে এক পাক ঘুরে এলেই মনটাও হাল্কা হবে—আর খিদেটাও বেশ জমবে।
জঙ্গী কর্নেলের উৎসাহে বাধাদান রোজ এলমারের সাধ্য নয়—কাজেই সে ফাঁসির আসামীর মুখ নিয়ে চেপে বসল গিয়ে নূতন জন্তুতে টানা গাড়িতে, আদিম জন্তুটির পাশে।
গাড়ি ছুটল টগবগিয়ে। চরম বিজয়ের আশায় উল্লসিত সুখাসীন কর্নেল রিকেট তখন জীবনের ফিলজফি ব্যাখ্যায় লেগে গিয়েছে। সে ফিলজফি তার যেমন, তেমনি সেকালের কলকাতা সমাজের অধিকাংশ শ্বেতাঙ্গেরও বটে।
রোজি ডিয়ার, জীবনটার অর্ধেক যুদ্ধক্ষেত্র, অর্ধেক জুয়োর আড়া, দুই জায়গাতেই লড়াই আর তার জন্যে চাই টাকা। কাজেই যেন-তেন-প্রকারেণ চাই টাকা রোজগার করা। যে কটা দিন বাঁচা যায় স্ফুর্তি করে নিতে হবে, কারণ কবে যে কলকাতার Ditch Fever আক্রমণ করে বসবে তার স্থিরতা নেই।
