.
২.১৭ তিনু চক্রবর্তীর কর্তব্যপালন
সন্ধ্যাবেলায় মাঝিরা বলল, কর্তা, এখানেই নৌকা বাঁধি?
রাম বসু বলল, কেন রে?
সামনের পথটা ভাল নয়, একা রাত-বিরেতে যাওয়া কিছু নয়, বোম্বটের ভয় আছে।
তবে এখানেই আজ রাতের মত নৌকা বাঁধ।
গাঁয়ের নাম কিরে? শুধায় পার্বতী।
আজ্ঞে, জোড়ামাউ।
জোড়ামউ! সবাই চমকে ওঠে।
রেশমীকে ডেকে রাম বসু সাবধান করে দিল, ভিতরে চুপটি করে বসে থাক, বাইরে বের হস না। চণ্ডী বক্সীর এলাকায় এসে পড়েছে জেনে রেশমী নৌকার মধ্যে গিয়ে আত্মগোপন করল। কিন্তু তবু তার মনের মধ্যে কৌতূহল ও করুণা একযোগে আলোড়ন শুরু করে দিল। এই তার গাঁ! আহা, একবার দিদিমার সঙ্গে দেখা করা যায় না? না, তা অসম্ভব। আহা, কোন রকমে যদি তিনুদাদার সঙ্গে একবার দেখা হয়ে যেত, গাঁয়ের খবরাখবর পায় নি। না, তা-ও সম্ভব নয়। তাই সে একা শুয়ে শুয়ে গাঁয়ের কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়ল।
মাঝিরা চাল ডাল পান তামাক কেনবার জন্যে বাজারের দিকে গেল।
তাদের সাবধান করে দিতে, নৌকোর আরোহীদের পরিচয় জ্ঞাপনে নিষেধ করতে সবাই ভুলে গেল। আর না ভুললেও সতর্ক করা সহজ নয়, হয়তো তাতেই গোল বাধবার। আশঙ্কা ছিল বেশি।
মাঝিরা বাজারে গিয়ে কথাবার্তার সূত্রে কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাবে, নৌকোর যাত্রীদের বিবরণ প্রকাশ করল। তারা তো জানে না লুকোবার কিছু আছে। সেখানে চণ্ডী বক্সীর এক চেলা উপস্থিত, খবরটা চণ্ডীকে পৌঁছে দেবার জন্যে সে উঠে গেল।
চণ্ডী সব শুনে বলল, জয় মা কালী, তোমার ইচ্ছায় বলি একেবারে ঘাটে এসে উপস্থিত! তার পরে দলের আর পাঁচজনের দিকে তাকিয়ে বলল, হবে না? শাস্ত্র তো মিথ্যা হবার নয়?
তখন দলবল জুটিয়ে নিয়ে সে পরামর্শ করল। স্থির হল অনেক রাতে সকলে মিলে গিয়ে পড়বে নৌকাখানার উপরে আর তার পরে রেশমীকে টেনে তুলে রাতেই কাজটা শেষ করে ফেলতে হবে। শাস্ত্রজ্ঞ চণ্ডী বক্সী জানিয়ে দিল যে চিতাপলায়িতাকে চিতায় অর্পণ করাই শাস্ত্রের বিধান।
একজন বলল, দেখো দাদা, শেষে বিপদে না পড়ি!
আরে বিপদ বাধাবে কে? সাহেব তো নেই?
নৌকোয় সাহেব নেই মাঝিরা বলেছিল।
অন্ধকারে আবার নৌকা ভুল করে ব’স না—বললে আর একজন।
পাগল নাকি! চণ্ডী বক্সীর চোখ পেঁচার চোখ, অন্ধকারেই খোলে ভাল। ঘাটে আর ক-খানা নৌকা! সাহেবের নৌকা যখন, অবশ্যই বজরা হবে। চিনতে ভুল হবে না।
চণ্ডী বক্সীর অভিপ্রায়ের সংবাদ গড়াতে গড়াতে তিনু চক্রবর্তীর কানে গিয়ে পৌঁছল। জেলেদের উপরে তিনুর অপ্রতিহত প্রভাব, সে রসিক জেলেকে ডেকে বলল, তোরা জন কতক ঠিক থাকিস, সময়মত আমি খবর দেব।
গভীর রাত্রে কোলাহল ও বন্দুকের আওয়াজে রাম বসুদের নৌকায় নিদ্রাভঙ্গ হল। সকলে ব্যস্তভাবে জেগে বাইরে এসে ঘটনা কি জানবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠল। সকলেরই মুখে এক প্রশ্ন—কি হল? ওরা কারা? কাকে আক্রমণ করল? নিদ্রার ঘোর। কাটলে সকলে দেখতে পেল অদূরে অবস্থিত একখানা বজরার হাদে অনেক লোক চড়বার চেষ্টা করছে, সেই অন্ধকারেও চোখে পড়ল বজরার ছাদে জন-দুয়েক লোক দণ্ডায়মান, খুব সম্ভব তারাই বন্দুকের আওয়াজ করে আক্রমণকারীদের তাড়াবার চেষ্টা করছে।
রাম বসু পরামর্শ দিল যে আর এখানে থাকা নয়, আস্তে-সুস্থে নৌকা খুলে দিয়ে এগনো যাক। এখন ওরা বজরাখানা লুট করছে, এর পরে হয়তো আমাদের পালা আসবে।
সেই পরামর্শ সকলের মনঃপূত হল, মাঝিরা সন্তর্পণে নৌকা খুলে দিয়ে মাঝগাঙে গিয়ে নৌকা স্রোতের মুখে ছেড়ে দিল। মাঝিরা নিজেদের মধ্যে বলা-কওয়া করছিল, ও ভাই, বোম্বেটের ভয়ে গাঁয়ে আশ্রয় নিলাম, এখন দেখছি গাঁয়েই ছিল বোম্বটের দল। মাঝিদের কথাবার্তায় আকৃষ্ট হয়ে পার্বতী ও রাম বসু তাদের কাছে গেল। অনেকক্ষণ তাদের জেরা করে বুঝল যে বাজারে গিয়ে কথাপ্রসঙ্গে নৌকার আরোহীদের পরিচয়, কোথা থেকে আসছে কোথায় যাবে প্রভৃতি মাবিয়া সবই প্রকাশ করে দিয়েছে।
তখন রাম বসু পার্বতীকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল, দেখ ভাই, এবারে ব্যাপারটা যেন বুঝতে পারছি। এ সেই চণ্ডী বক্সীর কাজ। মাঝিদের কথায় চণ্ডী বী আমাদের পরিচয় পেয়ে আমাদের আক্রমণ করবে ভেবেছিল, ভুলক্রমে বজরাখানা আক্রমণ করেছে।
পার্বতী শুধাল, কিন্তু বজরায় ছিল কারা?
রাম বসু বলল, যারাই থাক, ভীরু নয়, বন্দুক চালিয়েছে তারাই মনে হচ্ছে।
নৌকা গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে এসেছে, ইতিমধ্যে রাতও ফরসা হয়ে এসেছে, তারা দেখতে পেল একখানা বজরা পিছু পিছু আসছে।
পার্বতী বলে উঠল, পিছু নিল নাকি?
রাম বসু ভাল করে দেখে নিয়ে বলল, এ সেই বজরা। তবু সাবধানের মার নেই। ও মাঝি, পাল তুলে দেওয়া যায় না?
মাঝিরাও বজরাখানা দেখেছিল, পাল খাটাবার কথা ভেবেছিল। এখন রাম বসুর কথা শুনে বলল, না কর্তা, পাল চলবে না, হাওয়া উত্তরে।
বেশ ফরসা হয়ে এসেছে, বজরাখানাও কাছে এসে পড়েছে, বজরার হাদের লোক চিনতে পারা যায়, জন-তিনেক লোক বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে।
রাম বসু তাদের ঠাহর করে দেখে বলল, পার্বতী ভায়া, চেনা লোক যেন!
সাহেব যে!
জন স্মিথ বলে মনে হচ্ছে—আর ও দুজনকেও তাদের বাড়িতে দেখেছি মনে হয়।
তারা বুঝল যে বজরা থেকে ভয়ের কারণ নেই, তখন নৌকার গতি ধীর করে দেওয়া হল।
