চণ্ডীর কথা শুনে মহারাজা বললেন, দেখ বাপু, জাত-কাছারির এলাকা কলকাতার হিন্দু সমাজ। তার বাইরে আমার দণ্ড অচল। তার উপর আবার এর মধ্যে দেখছি এক সাহেব আছে।
চণ্ডী এত সহজে নিবৃত্ত হওয়ার জন্যে এতদূর আসে নি। সে বলল, মহারাজ, কোন সাহেবটা আপনাকে ভয় না করে শুনি? বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায় আপনার নামে!
এবারে নবকৃষ্ণ বাহাদুর ম্লান হেসে বললেন, সে দিন আর নেই বক্সী। এখনকার নতুন লাট-বেলাটেরা আর আগের মত মানীজনের মান রাখতে জানে না। হত ক্লাইভ কি ওয়ারেন হেস্টিংসের সময়, তোমার মামলা সুরাহা করে দিতাম। তাছাড়া, দেখ, আমি প্রাচীন হয়ে পড়েছি, আগের সে উদ্যম আর নেই।
চণ্ডী বলল, আজ্ঞে, নামে করে কাজ, বয়সে কি আসে যায়!
তাছাড়া, আসামী ধরা পড়ত বড়লাটকে না হয় একবার বলে দেখতাম।
তর্কপঞ্চানন বললেন, কোন্ সাহেব, গেল কোনদিকে তার ঠিক নেই, এহেন অবস্থায় মহারাজ কি করবেন?
আজ্ঞে, ভাগীরথী বেয়ে উত্তরদিকে গিয়েছে।
আরে বাপু, ভাগীরথী তো একটুখানি নদী নয়, আর উত্তরদিকটাও নাকি প্রকাণ্ড, আসামী ধরা পড়বে কি করে?
একটা হুকুম পেলেই আসামী খুঁজে বার করি। আর কিছু নয়, শুধু মহারাজের মুখের একটা হুকুম!
বেশ, হুকুম পেলেই যদি আসামী খুঁজে বার করতে পার, না হয় তা-ই দিলাম। কিন্তু দেখো, খুব সাবধান, সাহেবের গায়ে হাত তুললো না।
চণ্ডী শিউরে ওঠে, বলে, সাহেবের গায়ে হাত তুলব, আমি কি বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ঘর করি নে! আমি কেবল মহারাজের হুকুম দর্শিয়ে মেয়েটার চুলের ঝুটি ধরে টেনে নিয়ে হাজির করে দেব শ্রীচরণের তলায়।
না না, আমার কাছে আনতে হবে না, তোমরা যা হয় ক’র, মানে শাস্ত্রে যা বলে তাই কর।
তখন চণ্ডী উঠে দাঁড়িয়ে বুকের উপর হাত দিয়ে বলল, মহারাজার হুকুমে দেহে দশটা হাতীর বল পেলাম, দেখি এবারে ম্লেচ্ছটা কেমন করে সতী নারীকে লুকিয়ে রাখে!
তার পরে সে সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বলে, দেখলে তো, একটা মুখের কথার
আচ্ছা পণ্ডিত মশায়, সতীকে চিতায় আরোহণ করাবার আগে ম্লেচ্ছদোষ দূর করবার জন্যে তো একটা অঙ্গ-প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে নেওয়া আবশ্যক—কি বলেন?
তকপঞ্চানন উত্তর দেবার আগে উত্তর দিল হরু ঠাকুর, হাঁ, যেমন বেগুনটা পোড়াবার আগে এক দফা তেল মাখিয়ে নিতে হয়।
ব্যঙ্গে কর্ণপাত না করে চণ্ডী আর-এক প্রস্থ মহারাজার জয়গান করে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত অন্তে সদলবলে বিদায় গ্রহণ করল।
তর্কপঞ্চানন ও হরু ঠাকুরকে বিদায় দিয়ে মহারাজা অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন।
২.০৮ অপূর্ব নীলকর
দু মাস হল সদলবলে কেরী মদনাবাটিতে এসে উপস্থিত হয়েছে।
মালদা জেলার উত্তরদিকে টাঙন নদীর তীরে ছোট্ট গ্রাম মদনাবাটি। গাঁয়ের বর্তমান অবস্থা ভাল নয়, কিন্তু ইতস্তত ভগ্ন অট্টালিকার তৃপ, পাথরের টুকরা, মজা দিঘি প্রমাণ করে যে, চিরকাল এমন ছিল না; কোন প্রাচীনকালে সমদ্ধি ছিল, হয়তো বা প্রতাপও ছিল গ্রামটির। সেই বিস্মৃত অতীতের প্রেতচ্ছায়ায় পঁচিশ-ত্রিশ ঘর অধিবাসী কায়ক্লেশে দিন যাপন করে। অধিংকাশই নিম্নবর্ণের লোক আর কিছু সাঁওতাল।
গাঁয়ের পশ্চিমদিকে নদীর ধারে জর্জ উডনীর নীলকুঠি। আম কাঁঠাল বট অশ্বথের ছায়ায় ঘেরা কুঠিবাড়ি উডনীর তৈরি নয়, পুরাতন ইমারত, খুব সম্ভব প্রাচীন সমৃদ্ধির শেষ জীবন্ত সাক্ষী। নীলের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে উডনী কুঠিবাড়িটা কিনে নিয়েছিল কয়েক বছর আগে। ব্যবসা অবশ্য চলছে, কিন্তু মন্দা তালে, নিজে না দেখলে কোন ব্যবসা চলে! কেরী ভার নিয়েছে, উডনীর বিশ্বাস ব্যবসা এবার তেজের সঙ্গে চলবে। দুই নৌকায় পা রেখে চলা দুষ্কর, তবু হয়তো চলে নৌকা যদি এক শ্রেণীর হয়। ধর্মপ্রচার ও নীলের ব্যবসার মত ভিন্ন শ্রেণীর নৌকা অল্পই আছে।
দশ-বারো মাইল দূরে দিনাজপুর জেলা-ভুক্ত মহীপাল দিঘি গ্রাম। সেখানে উডনীর আর একটি নীলকুঠির ভার নিয়ে বসেছে টমাস। সে মাঝে মাঝে টাটু ঘোড়ায় চড়ে মদনাবাটিতে এসে উপস্থিত হয়–দু-চার দিন কাটিয়ে যায়।
কুঠির নায়েব, গোমস্তা, কারকুন, পাইক প্রভৃতি নৃতন কাজ পেয়েছে। এখন আর তাদের দাদন দেওয়া, নীলের চাষ তদারক, প্রজা-শাসন—এসব কিছুই করতে হয় না। তার বদলে এখন তারা কেরীর বাংলা বিদ্যালয়ের জন্য ছাত্র সংগ্রহ করে বেড়ায়। কেরীর হুকুম, যে বাড়ির হেলে পড়তে আসবে সে বাড়ির দু মাসের খাজনা মাপ, দুটি ছেলে পড়তে এলে বরাদ্দ নীলের বদলে টাকা দিলেই চলবে; তবু হাত্র জুটতে চায় না। লোকে ভাবে, এর চেয়ে নায়েবের জরিমানা, পাইকের লাঠি অনেক ভাল। এ কি নূতন উৎপাত!
ছাত্র জুটতে চায় না সত্য, তবু দু টাকা করে জলপানি দেবার লোভ দেখিয়ে আট দশটি ছাত্র যোগাড় করেছে কেরী। তারা সকালবেলা এসে তিন-চার ঘণ্টা পড়ে যায় শিক্ষক রাম বসু, পার্বতী ব্রাহ্মণ। আরও একটি শিক্ষক পাওয়া গিয়েছে, গোলকচরণ শর্মা, সে এই অঞ্চলেরই লোক।
কেরীর বাংলা বিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র রেশমী। যেমন তার মনোযোগ, তেমনি বুদ্ধি, তেমনি উৎসাহ। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ন্যাড়াকে ঢোকাতে পারা যায় নি বিদ্যালয়ে।
ন্যাড়া বলে, রেশমী দিদি, আমি আবার কি শিখব? কোন্ বিদ্যাটা আমার অজানা বল! জুতো-সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব জানি।
