শয়তানি ছাড়া আর সবই থাকবে।
তুমি বড় নিষ্ঠুর ডরোথি।
তার কারণ সংসারে শয়তান অগণিত। যাই হক, এখন পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে ধর্মতত্ত্ব আলোচনার স্পৃহা আমার নেই, তাড়াতাড়ি ফিরে চল।
কেরী বলল, না না, ছেলেটার একটা ব্যবস্থা না করে ফিরতে পারি না। আচ্ছা মিঃ মুন্সী, কেউ যদি কুড়ি টাকা দেয় তবে ওকে পেতে পারে না কি?
টমাস, পার্বতী, রাম বসু সবাই দেশের রীতি জানত, একযোগে বলল, অবশ্যই পারে।
তবে দেখ ছেলেটাকে পাওয়া যায় কিনা।
ঢুলির সঙ্গে একজন পেটি পুলিস অফিসার ছিল, সমস্ত শুনে বলল, আপনি কুড়ি টাকা দিলে এখনই আপনি ছেলেটার possession পেতে পারেন।
কিন্তু ওর মালিকের অনুমতি আবশ্যক হবে না কি?
পুলিস অফিসার বলল, মার্টিন সাহেবের অনুমতি দেওয়াই আছে, তিনি ছেলেটাকে রাখতে চান না।
ঢুলি সমর্থনে বলল, হুজুর, ছোঁড়া ভারি বজ্জাত। অমন কাজও করবেন না। ওর জ্বালায় আপনার হাড় একদিকে মাস একদিকে হবে।
কেরী বিচলিত না হয়ে যখন টাকা বের করতে উদ্যত হল তখন মিসেস কেরী যুগপৎ বিস্ময়ে ক্রোধে বিরক্তিতে তর্জন করে উঠে বলল—তুমি কি সত্যি ওটাকে কিনছ নাকি?
ডরোথি, ছেলেটাকে কিনছি বলা উচিত নয়, মানুষ সম্বন্ধে কেনাবেচা শব্দ প্রয়োগ করা খুষ্টানোচিত নয়, আমি ওর মুক্তির ব্যবস্থা করছি।
বেশ তো, মুক্তি দাও, কিন্তু দয়া করে ঘরে নিয়ে যেও না।
ঘরে না নিলে থাকবে কোথায়?
কিন্তু কোন্ ঘরে নেবে ভেবে দেখেছ? তোমার নিজেরই তো ঘর নেই।
আজ নেই কাল হবে।
সে ঘরে ও ছেলেটা স্থান পেলে আমি সে ঘরে প্রবেশ করব না, এ তুমি নিশ্চয় জেনো।
কেন বল তো?
ও তো একটা আস্ত জানোয়ার। আমার জ্যাভেজকে খেয়ে ফেলতে ওর বাধা কি!
আচ্ছা সেসব পরে বিচার করব—এই বলে কেরী পুলিস অফিসারটির হাতে কুভি টাকা দিল, পুলিস অফিসার একখানি রসিদ লিখে দিয়ে ছেলেটাকে ছেড়ে দেবার হুকুম দিল।
খাঁচার দরজা খোলা পাওয়ামাত্র, এতক্ষণ এত কাণ্ডের মূলস্বরূপ সেই ছেলেটি একলক্ষে বাইরে এসে দাঁড়াল—এবং ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম, মাকু দিয়ে বাঁধলাম, একবার ভ্যা কয় তো বাপু’-বলে তারস্বরে বারকয়েক ভ্যা ভ্যা করে চিৎকার করল।
তার ভাবভঙ্গী ও চীৎকারে জনতা হো হো করে হেসে উঠল।
ছেলেটা বুঝে নিয়েছিল যে এখন সে হাত বদলিয়ে মাতুনি সাহেবের ‘সিলেভ’ থেকে এই নতুন সাহেবের ‘সিলেভ’-এ পরিণত হল। সে কেরীর সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে লম্বা এক সেলাম করে বলল, বান্দা হাজির হ্যায়, হুজুর, কুচ ফরমাইয়ে।
তার পর কোন ফরমাশের অপেক্ষা না করেই আপন মনে গান ধরল–
“কে মা রথ এলি?
সর্বাঙ্গে পেরেক মারা চাকা ঘুর ঘুর ঘুরালি!
তোর সামনে দুটো কেটো ঘোড়া,
চুড়োর উপর মুখপোড়া,
চাঁদ চামরে ঘণ্টা নাড়া, মধ্যে বনমালী।
মা তোর চৌদিকে দেবতা আঁকা,
লোকের টানে চলছে চাকা,
আগে পাছে ছাতা পাখা, বেহদ্দ-ছেনালি।”
হঠাৎ গানের মাঝখানে সে বলে উঠল, না, বসে বসে পা দুটো ধরে গিয়েছে, একটু খেলিয়ে নিই।
এই বলে নাচতে শুরু করল। সুযোগ বুঝে ঢুলিও যোগ দিল, কাজেই নৃত্য গীত ও বাদ্য কিছুরই অভাব হল না। আর রথযাত্রার অভাবিত পরিণামে জনতাও খুশি হয়ে উঠে ‘বাঃ ভাই বেশ’, ‘ঘুরে ফিরে,’ ‘রসে বাজাও ভাই, ঢুলি,’ ‘বাহাদুর ছোকরা’ প্রভৃতি বাক্যে উৎসাহ প্রদান করতে লাগল।
গান থামলে কেরী বলল, ছেলেটি খুব স্মার্ট।
টমাস বলল, একবারে বাচ্চা ফলস্টাফ।
মিসেস কেরী অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রইল, কোনক্রমেই এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবে না এই যেন তার প্রতিজ্ঞা।
রাম বসু জিজ্ঞাসা করল-এই ছোঁড়া, তোর নাম কি?
দাদা, তোমার চেহারা দেখে তোমাকে বুঝলাম বলে মনে হয়েছিল। নাম ধাম সব খুলে বললাম তবু বুঝতে পারলে না?
কেমন?
তোমার সামনে দুটো কেটো ঘোড়া, মানে ঐ সেপাই দুটো। চূড়োর উপর মুখপোড়া–ঐ যে কোম্পানির নিশানটা, আর চাঁদ চামরে ঘণ্টা নাড়া মধ্যে বনমালী-বলে দেখিয়ে দিল নিজেকে।
তা হলে তোর নাম বনমালী, কেমন?
যতক্ষণ রথের উপর ছিলাম তাই ছিল, এখন যা খুশি বলে ডাক। কোম্পানির কাছে নালিশ করব না।
বাড়ি কোথায়?
এতক্ষণ ছিল ঐ রথের মধ্যে, তার আগে মাতুনি সাহেবের বাড়িতে, এখন পথের উপর—এর পরে বুঝি এই সাহেবের বাড়িতে হবে।
তার মানে, তোর বাড়িঘর নেই?
দাদা, এত যার বাড়িঘর, তার বাড়িঘর নেই? কি যে বল!
কেরী তাদের কথোপকথন বুঝতে পারে নি, তাই রাম বসুকে শুধাল, কি বলছে?
বলছে ওর নামও নেই, বাড়িঘরও নেই।
কেরী বলল, ওর নাম দিলাম ফ্রাইডে, আজ তো ফ্রাইডে বটে, আজ ওকে পেলাম। আর বাড়ি? আমার বাড়িতে।
কেরীর স্পষ্টোক্তি শুনে মিসেস কেরী স্পষ্টতর উক্তি প্রয়োগ করল, তাহলে ওকে নিয়েই থাক। আমি ঐ আস্ত জন্তুটার সঙ্গে থাকতে রাজী নই।
কেরী-দম্পতির গৃহবিপ্লব শুরু হয় দেখে রাম বসু বলল—আচ্ছা সেজন্য আপনারা ভাববেন না, আমি ওকে আমার বাড়িতে রাখব।
একটি জটিল সমস্যার এত সহজে সমাধান দেখে কেরী সকৃতজ্ঞ ভাবে বলল, মিঃ মুন্সী, তোমাকে ধন্যবাদ।
রাম বসু বলল, বেলা অনেক হল, তাহলে আমি ওকে নিয়ে বাড়ি যাই। কি বল পার্বতীদা? তুমিও চল।
পার্বতীচরণের বড় অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল, সে বলল, নিশ্চয়।
তখন রাম বসু, পার্বতীচরণ ও ছোকরা—তিনজনে প্রস্থান করল। কেরী-দম্পতি চলল বেরিয়াল গ্রাউণ্ড রোডে স্মিথদের বাড়ির দিকে।
