ভবতোষ উন্মুখ হলেন। স্নেহলতা প্রশ্ন করলেন, ঝোঁকের মাথায় মেয়ে পাঠাতে তো চাইছ, কিন্তু অন্য দিকটা ভেবে
দেখেছ?
কোন দিকটা?
ঝিনুককে যদি ওরা ফেরত না পাঠায়?
এ ব্যাপারটা আগে ভাবেন নি ভবতোষ। ঈষৎ চকিত হয়ে বললেন, সে তো ঠিকই।
স্নেহলতা বললেন, মেয়ে ছাড়া তুমি বাঁচবে?
না, কক্ষণো না।
একটু চুপ। তারপর ভবতোষ মুখ তুলে স্নেহলতাকে দেখলেন। যেই চোখাচোখি হল অমনি চোখ নামিয়ে নিলেন। বারকতক এই রকম চলল।
স্নেহলতা লক্ষ করেছিলেন। বললেন, আমায় কিছু বলবে?
হ্যাঁ। আস্তে করে মাথা নাড়লেন ভবতোষ।
কী?
ভয়ে ভয়ে ভবতোষ বললেন, ঝিনুক তো অনেকদিন আপনার কাছে রইল। সেই পুজোর আগে থেকে আছে–
স্নেহলতার চোখ কুঁচকে গেল, তাতে কী হয়েছে?
কিছু না–
তবে ও কথা বললে যে?
তক্ষুনি উত্তর দিলেন না ভবতোষ। একটুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, অনেকদিন মেয়েটা আমার কাছ ছাড়া, একেবারে ভাল লাগছে না। ভাবছি–
কী?
আজ ওকে নিয়ে যাব। দিনতিনেক পর আমার কলেজ খুলবে। কলেজ খুললে তো নিজের কাছে রাখার অসুবিধে। এই তিনটে দিন ঝিনুক আমার কাছে থেকে আসুক।
স্নেহলতা জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, না।
বিমূঢ়ের মতো ভবতোষ বললেন, কী?
ঝিনুক আজ যাবে না।
কেন।
তোমাকে তো সেই ছেলেবেলা থেকে দেখছি ভব, মানুষটা তুমি ভারি নরম। বাড়ি যেতে যেতে হয়তো মতি বদলে গেল। সেই লোকটা তোমাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঝিনুককে ঢাকায় নিয়েও যেতে পারে। লোকটাকে বিদেয় করে মেয়ে নিয়ে যেও। তার আগে না।
অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভবতোষ বললেন, তা হলে আর কি, এখন আমি যাই–
এখুনি যাবে? রাত্তিরে একেবারে খাওয়াদাওয়া করে যেও।
না খুড়িমা, আজ আর খাব না। বাড়িতে রান্নাবান্না করা আছে। এখানে খেয়ে গেলে সব নষ্ট হবে।
তা হলে বাড়িতেই খেও। স্নেহলতা হাসলেন।
এতক্ষণ স্নেহলতার সঙ্গেই কথা বলছিলেন ভবতোষ। ঘরে যে আরও মানুষ আছে সেদিকে লক্ষ ছিল না। এবার অবনীমোহনদের দিকে ফিরলেন তিনি। মৃদু হেসে বললেন, আমি কিন্তু খুড়িমার সঙ্গেই কথা বলে যাচ্ছি।
অবনীমোহন বললেন, দরকার থাকলে বলতে হবে বৈকি।
খানিক ভেবে ভবতোষ বললেন, আপনার সম্বন্ধে আমার কিছু অভিযোগ আছে–
অবনীমোহন চকিত হলেন, কী?
রাজদিয়ায় এতদিন কাটালেন, অথচ আমার বাড়িতে একবারও এলেন না–
সত্যি ভারি অন্যায় হয়ে গেছে। এবার একদিন যাব।
যাবেন না, বুঝতেই পারছি। গেলে এতদিনে ঠিকই যেতেন। ভবতোষ বলতে লাগলেন, পুজো টুজো গেল। এবার তো কলকাতায় ফিরবেন। আমার ওখানে আর যাবেন কবে?
অবনীমোহন বললেন, কলকাতায় আমরা ফিরছি না।
সত্যি! ভবতোষ অবাক।
সত্যি। অবনীমোহন হাসলেন, এবার থেকে আমরা আপনাদের রাজদিয়ার বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছি।
খুবই আনন্দের কথা। কিন্তু–
কী?
আপনারা শহরের মানুষ, চিরকাল কলকাতায় থেকেছেন। এই ম্যাড়মেড়ে নিঝুম গ্রামদেশ কি বেশিদিন ভাল লাগবে?
ওধার থেকে সুরমা হঠাৎ বলে উঠলেন, বলা মুশকিল। তবে–
তবে কী?
মাথার ভেতর পোকাটা যতদিন কট কট করছে ততদিন এখানেই থাকবে। বলে কৌতুকময় চোখে স্বামীকে বিদ্ধ করলেন সুরমা।
সুরমার কথাগুলো ভাল করে বুঝতে পারেন নি ভবতোষ। কিছুটা বিমূঢ়ের মতো একবার তার দিকে, একবার অবনীমোহনের দিকে তাকাতে লাগলেন।
এই সময় হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল অবনীমোহনের। তাড়াতাড়ি ভবতোষের দিকে ফিরে বলে উঠলেন, আপনাকে পেয়ে ভালই হল। আচ্ছা–
কী?
আপনি তো এখানকার কলেজে অধ্যাপনা করেন?
হ্যাঁ।
একটু ব্যাপারে আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে ভাই—
ভবতোষ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন।
অবনীমোহন বললেন, এই আমার মেয়েদের ভর্তির ব্যাপারে। কাল কি পরশু মামাবাবুকে নিয়ে আপনার বাড়ি যাচ্ছি। তখন বলব।
আচ্ছা।
আরও কিছুক্ষণ গল্প টল্প করে ভবতোষ উঠে পড়লেন।
» ১.৩৮ ভবতোষ চলে গেছেন
বেশ কিছুক্ষণ হল, ভবতোষ চলে গেছেন। তারপরও স্নেহলতারা উঠলেন না, পুবের ঘরেই বসে থাকলেন। তাদের মধ্যে ভবতোষের কথাই হতে লাগল।
ভবতোষের সংসারের কথা ভেবে সবাই দুঃখিত, বিষণ্ণ, ব্যথিত। তিনটে তো মোটে মানুষ ভবতোষ, তার স্ত্রী এবং ঝিনুক। তিনজনে আজ তিন জায়গায়। একজন ঢাকায়, আর দু’জন রাজদিয়ার দুই প্রান্তে। সংসারটা তিন টুকরো হয়ে তিন দিকে ভেসে বেড়াচ্ছে। অর্থাৎ কোনও অভাব ছিল না, সুখের সব উপকরণ ছিল হাতের কাছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সামান্য বনিবনা থাকলে ওরা কত সুখীই না হতে পারত।
দেখতে দেখতে হেমন্তের রাত গাঢ় হয়ে উঠল। ক’দিন আগে ছিল অমাবস্যা। আকাশের প্রান্তে যে এক ফালি ক্ষীণায়ু চাঁদ উঠেছে, জল-বাংলার এই অংশটিকে তা আলোকিত করে তুলতে পারে নি। তার ওপর আছে গুড়ো গুড়ো হিমের রেণু। ফলে গাছপালা, আকাশ, দূরের ধানখেত-সমস্ত কিছুই ঝাঁপসা, অস্পষ্ট, কুহেলিবিহীন। বিচিত্র মায়াবরণের মতো এই রাত রাজদিয়াকে ঢেকে রেখেছে।
ভবতোষ যাবার পর কতক্ষণ কেটেছে, কে জানে। হঠাৎ বাইরের উঠোনে হেমনাথের গলা পাওয়া গেল, কোথায় রে বিনুদাদা, ঝিনুকদিদি–
কমলাঘাটের গঞ্জ থেকে রাতদুপুরে ফেরার কথা ছিল হেমনাথের। দেখা গেল, অনেক আগেই ফিরে এসেছেন। স্নেহলতারা হেরিকেন নিয়ে ব্যস্তভাবে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এলেন।
হেমনাথ একাই আসেন নি, যুগলকেও তার পেছনে দেখা গল। সকালবেলা তাকে সঙ্গে নিয়ে কমলাঘাট গিয়েছিলেন হেমনাথ।
