মুখ থেকে দাড়ির জঙ্গল নির্মূল করলে চেহারা যে এতটা বদলে যেতে পারে ভাবা যায়নি। তাছাড়া সুবর্ণার মস্তিষ্ক গভীর উৎকণ্ঠায় ঠাসা। খুঁটিয়ে লক্ষ করার মতো মনের অবস্থা তার ছিল না। থাকলে ঠিকই চিনে ফেলত। সামান্য যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ না করলে বুঝতে পারত, এ ঘরে রাজীব ছাড়া বাইরের আর কারও থাকা সম্ভব নয়। বুকের ভেতর শ্বাস যেন আটকে গিয়েছিল সুবর্ণার। আবদ্ধ বাতাসটা। ধীরে ধীরে বাইরে বের করে দিয়ে বলল, ও, আপনি!
রাজীব বলল, আজ আপনার শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে আমাকে ফর্মালি ইনট্রোডিউস করিয়ে দেবেন। কাল আমার যে ওয়াইল্ড চেহারাটা দেখেছিলেন সেই অবস্থায় তো যাওয়া যায় না। ভাববেন মোস্ট সার্টেনলি আমি একটা ক্রিমিনাল। তাই সকালে উঠেই দাড়িটাড়ি সাফ করে, কাঁচি দিয়ে মাথার পেছন দিকের চুলের গোছা কেটে, স্নান সেরে, প্যান্ট-জামা চেঞ্জ করে আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।
প্রচণ্ড টেনসনের মধ্যেও সামান্য আরাম বোধ করল সুবর্ণা। কাগজে যে ছবিটা বেরিয়েছে তার সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে রাজীবের চেহারার হয়তো তেমন মিল খুঁজে পাবেন না সংগ্রামনারায়ণ। যেহেতু সুবর্ণা আত্মীয় হিসেবে তার পরিচয় দেবে তাই মিল খোঁজার চেষ্টা করবেন না। দাড়ি থাকা এবং না থাকার মধ্যে তফাত বেঅনেকটাই। কলকাতার বাইরের শহরগুলো থেকে যেসব কাগজ বেরোয়। সেগুলোর ছাপাটাপা বেশ খারাপ। রাজীবের যে ছবিটা দৈনিক দিনকাল’-এ বেরিয়েছে সেটা খুব একটা স্পষ্ট নয়। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি না থাকলে দাড়িওলা আর দাড়ি কামানো, ফিটফাট রাজীব যে একই লোক, ধরা মুশকিল।
রাজীব এবার বলল, আমাকে এখন আপনার আত্মীয় বলে পরিচয় দেওয়া যেতে পারে, তাই না?
তার কণ্ঠস্বরে হয়তো একটু মজা বা শ্লেষ ছিল। সুবর্ণা উত্তর দিল না। ট্রেটা একটা টেবলে নামিয়ে রেখে ক্ষিপ্র হাতে মশারি খুলে শৌর্যেন্দ্রনারায়ণকে বাথরুমে নিয়ে গেল। তার মুখ ধুইয়ে, পোশাক বদলে একটা সোফায় এনে বসাল। রাজীবকে ব্রেকফাস্ট দিয়ে শৌর্যেন্দ্রনারায়ণকে খাওয়াতে খাওয়াতে চাপা গলায় বলল, একটা খারাপ খবর আছে।
খেতে খেতে চমকে সুবর্ণার দিকে তাকায় রাজীব। খুব আস্তে জিজ্ঞেস করে, কী খবর?
সুবর্ণা বলল, লোকাল একটা ডেইলিতে আজ বেরিয়েছে, নর্থ-ইস্টের একজন মারাত্মক টেরোরিস্ট প্রতাপপুর সিটিতে এসে ঢুকেছে। তার ছবিও ছাপা হয়েছে। কাল আপনার যে চেহারা দেখেছিলাম তার সঙ্গে ছবিটার খানিকটা মিল আছে।
চোখের দৃষ্টি অনেকক্ষণ স্থির হয়ে রইল রাজীবের। তারপর সে জিজ্ঞেস করল, পেপারটা কোথায়?
আমার শ্বশুরমশাইয়ের কাছে।
ওটা কি দেখা যায়?
পরে দেখাব। এখন চাইতে গেলে সন্দেহ করতে পারেন।’ বলে একটু থামল সুবর্ণা। তারপর কী ভেবে বলল, কিন্তু–
রাজীব বলল, কিন্তু কী?
ওটা বেঙ্গলি ডেইলি। বাংলা পড়তে অসুবিধে হবে না?
এক সময় আমি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ আর সায়েন্স কলেজের ছাত্র ছিলাম। বাংলাটা আগেই জানতাম। কলকাতায় থাকার সময় আরও ভাল করে শিখে নিয়েছি।
সুবর্ণা চুপ করে থাকে।
রাজীব জিজ্ঞেস করে, রিপোর্টটায় কী লিখেছে?
সুবর্ণা বলল, আমি ডিটেলে পড়িনি। শুধু হেডলাইন আর ছবিটাই দেখেছি। কিছুক্ষণ ভেবে রাজীব বলল, আপনার শ্বশুরমশাই আমাকে দেখলে কি কোনওরকম প্রবলেম হতে পারে?
কোন ধরনের প্রবলেমের কথা রাজীব বলছে, বুঝতে পারছিল সুবর্ণা। সে বলল, আপনি কতটা ট্যাক্টফুল হতে পারেন, তার ওপর সব নির্ভর করছে। আমার রিকোয়েস্ট, অ্যাপিলও বলতে পারেন–এমন কোনও ঘটনা যেন না ঘটে যাতে একজন হার্ট-পেশেন্টের ক্ষতি হয়।
এটা বোধহয় কালও আপনি বলেছিলেন।
হ্যাঁ।
আপনাকে যেটুকু দেখছি, মনে হয় শ্বশুর দাদাশ্বশুর, সবাইকে খুব ভালবাসেন।
ভেতরে ভেতরে কেমন যেন থমকে যায় সুবর্ণা। সে বলে, কতটা ভালবাসি বলতে পারব না। তবে আমি সামনে থাকতে কারও ক্ষতি হোক, কিংবা একটু যত্ন করলে কেউ যদি আরও কিছুদিন ভালভাবে বেঁচে থাকে, সেটা দেখতেই হবে। মানুষ হিসাবে এটুকু করতেই হয়।
এইসব শব্দপুঞ্জ একজন উগ্রপন্থীকে, যার কাছে হত্যাটা নেহাতই জলভাতের মতো ব্যাপার, আদৌ নাড়া দেয় কি না বোঝা যায় না। রাজীব কী বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ টেলিফোন বেজে ওঠে। ধীরে ধীরে সেটা তুলে নিয়ে সুবর্ণা হ্যালো’ বলতেই ওধার থেকে গম্ভীর, ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, কে বলছেন?
সুবর্ণা নিজের পরিচয় দেয়।
নমস্কার ম্যাডাম। আমি রামেশ্বর বসাক।
প্লিজ একটু ওয়েট করুন। মাউথপিসে হাত চাপা দিয়ে সুবর্ণা রাজীবকে খুব নিচু গলায় বলে, ওসি।
কী জন্যে ফোন করেছে?
এখনও বলেননি।
আমার কথা উঠলে আপনাকে কী বলতে হবে, ইউ নো প্রেটি ওয়েল।
ফোনের মুখ থেকে হাত সরিয়ে সুবর্ণা বলে, বলুন মিস্টার বসাক। আমার কাছে কি কিছু দরকার আছে?
রামেশ্বর বললেন, কাল আপনাদের প্যালেসের গ্রাউন্ড ফ্লোরটা শুধু দেখে এসেছিলাম। আজ দিনের আলোয় দোতলা আর ছাদটায় যদি ভাল করে খুঁজে দেখেন–
দ্বিধান্বিতভাবে সুবর্ণা বলে, দেখেছি। কেউ নেই।
আমাদের কাছে খবর আছে, টেরোরিস্টটা প্যালেসের কাছাকাছি কোথাও আছে। কাল সন্ধে থেকেই আপনাদের ওদিকটায় প্লেন ড্রেসে পুলিশ ওয়াচ রাখছে। লোকটা অন্য কোথাও গেলে তাদের চোখে পড়ত।
